শ্রম অধিকারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক উন্নতি করলেও নানা কারণে এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমনীতির আওতায় দেশের বাণিজ্যে কোনো নিষেধাজ্ঞা এলে তা আসবে মূলত রাজনৈতিক কারণে। কারণ শ্রম ইস্যুতে বাংলাদেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার মতো কোনো অবস্থা নেই। আর যদি নিষেধাজ্ঞা দেওয়াও হয়, তাহলে তা ব্যক্তি খাত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে সতর্কতার প্রয়োজন এবং কূটনৈতিক চ্যানেলে তা সরকারকে সমাধান করতে হবে। শ্রম এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিষয়ে এক সেমিনারে গতকাল সোমবার এসব কথা বলেন তারা।
অর্থনীতিবিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন ইকোনমিস্ট রিপোর্টার্স ফোরাম-ইআরএফ এ সেমিনারের আয়োজন করে। রাজধানীর বিজয়নগরে সংগঠনের কার্যালয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠান জুড়ে মার্কিন প্রেসিডেন্সিয়াল স্মারক নিয়েই বেশি আলোচনা হয়।
সেমিনারে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে বিশিষ্ট বাণিজ্য বিশ্লেষক এবং ট্যারিফ কমিশনের সাবেক সদস্য ড. মোস্তফা আবিদ খান বলেন, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা-ডব্লিউটিও বিধির আওতায় বাংলাদেশের ওপর সরাসরি বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে ব্যক্তিপর্যায়ে নিষেধাজ্ঞায় কোনো বাধা নেই। শ্রম ইস্যুতে ব্যক্তিপর্যায়ে নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা রয়েছে। তবে কী ধরনের নিষেধাজ্ঞা কী পর্যায়ে দেওয়া হতে পারে, তা এখনো সুস্পষ্ট নয়।
শ্রমসংক্রান্ত পরিস্থিতি উন্নয়ন প্রসঙ্গে মোস্তফা আবিদ খান বলেন, শ্রম ইস্যু নিয়ে শিল্পের ভয়ের কারণ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়ামূলক না হয়ে আরও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সবকিছু সামাল দিতে হবে। রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলগুলোতে (ইপিজেড) শ্রমিক কল্যাণ সংঘ-ডব্লিউডব্লিউএর মাধ্যমে সমাধানে আসা যাবে না। সেখানেও পূর্ণাঙ্গ ট্রেড ইউনিয়ন চর্চার সুযোগ রাখতে হবে। তিনি বলেন, শ্রমসংক্রান্ত বড় দুর্বলতা হচ্ছে, শ্রম আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন না থাকা। নিজের কাজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি আরও জানান, আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থা-আইএলওসহ সংশ্লিষ্ট অন্য বিদেশিরা এ বিষয়ে তাকে বহুবার বলেছেন।
বিশ্ব জুড়ে শ্রম অধিকার সুরক্ষায় গত ১৬ নভেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্টের স্মারক বা নতুন নীতিতে সই করেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। ওইদিনই পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন এক অনুষ্ঠানে বলেন, বিশ্ব জুড়ে শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা, শ্রমিক অধিকারের পক্ষের কর্মী, শ্রমিক সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে যে বা যারা হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করবে, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনবে যুক্তরাষ্ট্র। দায়ীদের বিরুদ্ধে বাণিজ্য, ভিসা নিষেধাজ্ঞাসহ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যত ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে, তা প্রয়োগ করা হবে। এর চার দিন পর ২০ নভেম্বর ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে বাণিজ্য সচিবকে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়, শ্রম অধিকারবিষয়ক নতুন এ নীতির লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বাংলাদেশ। কারণ শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘিত হলে এই নীতি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা রাষ্ট্রের ওপর আরোপের সুযোগ রয়েছে।
আলোচনায় বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বাংলাদেশের শ্রম পরিস্থিতি এমন খারাপ অবস্থানে নেই, যেজন্য নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়তে হবে। যদি একরম কিছু আসে তাহলে সেটা রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে দেওয়া হবে। শ্রম অধিকারের কারণে নয়। কারণ, কোনো ধরনের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলে শ্রমিকরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাহলে এ ধরনের পদক্ষেপে মার্কিন উদ্দেশ্য কী তা স্পষ্ট। তিনি বলেন, যেকোনো পরিস্থিতিই আসুক তা সরকার, মালিক, শ্রমিক এই তিনপক্ষ মিলে সমাধান করতে হবে। এ নিয়ে তারা ভীত নন। তারা বরং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার চাইতে দেশে কাস্টমস, ব্যাংক ও গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যার কারণে বেশি ভীত। এসব সেবার ক্ষেত্রে হয়রানির শিকার তারা।
বিকেএমইএর সহসভাপতি ফজলে শামিম এহসান বলেন, শ্রম অধিকার বিষয়ে অনেক দেশের চেয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ভালো। আড়াই হাজার কারখানার ১ হাজার ৩০০ কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন হয়েছে। তার অভিযোগ, শ্রমিক নেতাদের একটা অংশ শিল্প বাঁচাতে কাজ করে আর একটা অংশ বিদেশ থেকে ডলার এনে নিজের স্বার্থ দেখে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শ্রমনীতির দুটি দিক আছে। একটা পর্দার সামনে অন্যটি পর্দার বাইরের দিক। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনীতিকভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। সরকারকে এখানে উদ্যোগ নিতে হবে।
বিজিএমইএর শ্রমবিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান আ ন ম সাইফুদ্দিন বলেন, ঐতিহাসিকভাবেই নানান সমস্যা মোকাবিলা করে এগিয়েছে পোশাক খাত। এবারও মার্কিন শ্রমনীতি ইস্যু সরকার, মালিক ও শ্রমিকপক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সফলভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
আলোচনায় শ্রমিক নেতা ও জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আমিরুল হক আমিন যুক্তরাষ্ট্রকে ইঙ্গিত করে বলেন, যারা স্যাংশন দিতে চান তারা আইএলও কনভেশনের কয়টি রেটিফাই করেছে? তারা কোর কনভেনশনের বেশিরভাগই অনুমোদন করেনি। তিনি বলেন, শ্রমমানের অনেক উন্নতি হয়েছে। শ্রম অধিকার বিষয়ে মৌলিক ১০টি কনভেনশনের মধ্যে আটটি অনুসমর্থন করেছে বাংলাদেশ। আর যুক্তরাষ্ট্র অনুমোদন করেছে মাত্র দুটি কনভেনশন। ফলে বাংলাদেশের শ্রমমান নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার যুক্তরাষ্ট্রের নেই। এখন তারা যদি বলে তোমার (বাংলাদেশের) শ্রমমান উন্নত নয়, তাহলে বলতে হবে, শ্রমমান নয়, তাদের অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে।
অবশ্য শ্রমিক নেতা এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিলের সাবেক জেনারেল সেক্রেটারি তৌহিদুর রহমান মনে করেন, ব্যবসা ধরে রাখতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবিষয়ক স্মারকলিপিকে অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। সম্প্রতি শ্রমিক আন্দোলনে বিক্ষোভকারীদের বিষয়টি তাদের নজরে আছে। শ্রমিকের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, সেটাও ভাববার বিষয়। চারজন শ্রমিকের মৃত্যু হলো। মালিকপক্ষ নিহত শ্রমিক পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিয়েছে। তবে শ্রমিক নিহতের ঘটনার কেন তদন্ত হলো না, কেন বিচার হচ্ছে না। আমরা ১২ হাজার ৫০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি মেনে নিলাম। আমাদের বিজয় হয়নি। আমরা সহযোগিতা করলাম। তারপরও ১১৫ জন আঞ্চলিক শ্রমিক ও শ্রমিকনেতা কারাগারে। ৪৩ মামলা ২০ হাজার শ্রমিক আসামি। এ বিষয়গুলো বিজিএমইএ ও বিকেএমইএকে বিবেচনা করতে হবে।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ইআরএফ সভাপতি রেফায়েত উল্লাহ মিরধা। সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম।
