ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করার কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। গতকাল সোমবার প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়ের নেতৃত্বে পাঁচ বিচারপতির ওই সাংবিধানিক বেঞ্চ ওই সিদ্ধান্ত ‘অসাংবিধানিক’ নয় বলে রায় দিয়েছে। সেই সঙ্গে জম্মু ও কাশ্মীরে দ্রুত রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া এবং সামনের বছরের সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের জন্য আদালত আদেশ দিয়েছে।
বিবিসি বলছে, ভারতের সুপ্রিম কোর্টে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ ৩৭০ বাতিল সংক্রান্ত মামলার রায়ের দিন ছিল সোমবার। রায়ে পাঁচ বিচারপতির ওই সাংবিধানিক বেঞ্চ বলেছে, সংবিধানের ৩৭০ ধারা মেনে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা ‘অস্থায়ী’ ছিল। রাষ্ট্রপতি শাসনকালে ৩৭০ ধারা প্রত্যাহারের বিষয়টিও নিয়মবহির্ভূত নয়।
এ ছাড়া দ্রুত জম্মু-কাশ্মীরের রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নির্বাচন করার সময়সীমাও বেঁধে দিয়েছে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত। ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট ভারতের মুসলিমপ্রধান জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের সাংবিধানিক বিশেষ মর্যাদাসংক্রান্ত সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করে কেন্দ্রীয় শাসন জারি করে নরেন্দ্র মোদি সরকার। ওই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জম্মু ও কাশ্মীরের নিজেদের সংবিধান ও আলাদা পতাকার অধিকার দেওয়া হয়েছিল। পূর্বতন জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য পুরোপুরি মুছে ফেলে একে লাদাখ এবং জম্মু-কাশ্মীর নামে দুটি পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে রূপান্তরিত করা হয়েছিল। এরপর সেখানে ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে দীর্ঘদিন লকডাউন করে রাখা হয়েছিল।
গতকাল ভারতের সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছে, সেখানে সাতটি বিষয়ে আদেশ দিয়েছে আদালত। যার মধ্যে প্রধান ছিল, ‘৩৭০ অনুচ্ছেদটি অস্থায়ী বা সংবিধানে স্থায়ী মর্যাদা অর্জন করেছে কি না?’
সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ বলেছে, অনুচ্ছেদ ৩৭০ একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা। ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর জম্মু ও কাশ্মীরের অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব নেই। ‘রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত বৈধ’ এ কথাও জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ।
প্রধান বিচারপতি বলেন, যেহেতু বিধানের ৩৭০ ধারায় কাশ্মীরকে যে বিশেষ মর্যাদা প্রদান করা হয়েছিল, তা অস্থায়ী, তাই রাষ্ট্রপতি তা বাতিল করার অধিকার রাখেন। জম্মু ও কাশ্মীরের গণপরিষদ বাতিল করার পরও রাষ্ট্রপতি এটি করতে পারেন।
সুপ্রিম কোর্টের এ রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তবে জম্মু ও কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা হতাশা প্রকাশ করেছেন। মোদি এক্স-এ (সাবেক টুইটারে) একটি পোস্টে লিখেছেন, আজকের রায় শুধু একটি আইনি রায় নয়; এটি আশার আলো, উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি এবং একটি শক্তিশালী আরও ঐক্যবদ্ধ ভারত গড়ে তোলার জন্য আমাদের সম্মিলিত সংকল্পের সাক্ষ্য।
অন্যদিকে জম্মু ও কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা সামাজিকমাধ্যম এক্সে রায় দানের বিষয়ে লিখেছেন হতাশ হয়েছি, কিন্তু হার মানিনি। লড়াই জারি থাকবে। এখানে পৌঁছতে বিজেপির কয়েক দশক লেগেছে। আমরাও দীর্ঘ লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত।
জম্মু-কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এবং ‘ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ আজাদ পার্টির’ গুলাম নবি আজাদও তার ‘হতাশা’ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা জম্মু-কাশ্মীরের মানুষদের কিছু বিশেষ সুবিধা দিত, যা তাদের জীবনধারণের এবং অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল।
৩৭০ ধারা নিয়ে আদালতের সিদ্ধান্তের পর জম্মু ও কাশ্মীরের মহারাজা হরি সিংয়ের ছেলে এবং কংগ্রেস নেতা করণ সিং এএনআইকে বলেন, আমি এ রায়কে স্বাগত জানাই। এখন এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, যা কিছু ঘটেছে তা সাংবিধানিকভাবে বৈধ... আমি প্রধানমন্ত্রী মোদিকে অনুরোধ করছি যেন শিগগিরই রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।
সুপ্রিম কোর্টের রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন বিজেপির জেপি নাড্ডা। এদিন রায় প্রকাশের পর তিনি সামাজিকমাধ্যম এক্স-এ লেখেন, মাননীয় শীর্ষ আদালতে ৩৭০ ধারার বিষয়ে যে রায় দেওয়া হয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি তার স্বাগত জানায়। দেশের উচ্চতম আদালত ৩৭০ ধারা এবং ৩৫-এ একে প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত, তার প্রতিক্রিয়া এবং উদ্দেশ্যকে সঠিক বলে জানিয়েছে।
অন্যদিকে রায়ের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কড়া নিরাপত্তা বলয়ে ঘিরে রাখা হয়েছিল জম্মু-কাশ্মীরকে। সুপ্রিম কোর্টের রায় ঘোষণার আগেই পিডিপি সভাপতি মেহবুবা মুফতি ও ওমর আবদুল্লার বাড়ির দরজা সিল করে পুলিশ এবং তাকে বেআইনিভাবে গৃহবন্দি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। যদিও সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন লেফটেন্যান্ট গভর্নর মনোজ সিনহা। তিনি দাবি করেছেন, জম্মু ও কাশ্মীরে রাজনৈতিক কারণে কাউকে গৃহবন্দি বা গ্রেপ্তার করা হয়নি।
