ঘরে-বাইরে চ্যালেঞ্জের মুখে মিয়ানমারের জান্তা

আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৩, ১২:১৪ এএম

১৯৪৮ সালে মিয়ানমারের স্বাধীনতার পর থেকে সংঘাত আর দারিদ্র্যে নিষ্পেষিত এই রাজ্যটি যুদ্ধবাজ নেতা, মাদক ব্যবসায়ী বা জাতিগত বিদ্রোহীদের মধ্যে নানা সময় নানা ভাগে বিভক্ত হয়ে আসছে। এসব পক্ষ কখনো পরস্পরের বিরুদ্ধে আবার কখনো সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করছে। পরস্পরবিরোধী বড় দুটি জাতিগত বিদ্রোহী গোষ্ঠী শান এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে বলে প্রচলিত থাকলেও সম্প্রতি কয়েক বছরে চারটি ছোট জাতিগত গোষ্ঠী শক্তিশালী সামরিক বাহিনী গড়ে তুলেছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী হচ্ছে ওয়া। চীন সমর্থিত এই গোষ্ঠীটির কাছে প্রায় ২০ হাজার সেনা এবং আধুনিক জটিল অস্ত্রশস্ত্র রয়েছে। এর পরেই আছে কোকাং, জাতিগতভাবে এরা চীনা গোষ্ঠী যাদের দীর্ঘ বিদ্রোহের ইতিহাস আছে। এরপর রয়েছে পালাউং বা টা’য়াং। এরা পাহাড়ের ওপরে অবস্থিত দুর্গম গ্রামে বাস করে। আরও আছে রাখাইন রাজ্যের রাখাইনরা। দেশটির পূর্বাঞ্চলে তাদের বড় সংখ্যক অভিবাসী জনসংখ্যা রয়েছে যারা আরাকান আর্মি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেছে। বর্তমানে মিয়ানমারের সবচেয়ে শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী রয়েছে এদের। অন্য বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো এদের কাছ থেকেই অস্ত্র পায় বলে মনে করা হয়।

অন্য তিনটি জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী হচ্ছে কোকাং এমএনডিএএ, টা’য়াং টিএনএলএ এবং আরাকান আর্মি এরা মিলে একটি যৌথ বাহিনী গঠন করেছে যার নাম দেওয়া হয়েছে ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স। মিয়ানমারে চলমান জান্তাবিরোধী লড়াইয়ে অংশ নেওয়া তিনটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে বৈঠক করেছে দেশটির ক্ষমতাসীন সামরিক সরকারের প্রতিনিধিদল। সোমবার জান্তা সরকারের মুখপাত্র জ মিন তুন এ তথ্য জানান বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়। মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এমআরটিভির টেলিগ্রাম চ্যানেলের তথ্যমতে, জ মিন তুন বলেছেন, চীনের সহায়তায় এ বৈঠক হয়েছে। এ মাসের শেষের দিকে আরও একটি বৈঠক হতে পারে।

প্রায় তিন বছর আগে মিয়ানমারের ওপর যে স্থবির হতাশা নেমে আসে; সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ তার সম্পূর্ণ বিপরীত। সেখানে সামরিক জান্তাবিরোধী প্রতিরোধ আন্দোলন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব বাহিনী ও পদচ্যুত নির্বাচিত নেতাদের নিয়ে দ্য পিপলস ডিফেন্স ফোর্সেস (পিডিএফ) বা নাগরিক প্রতিরক্ষা বাহিনী গঠিত হয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় পিডিএফ ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে। এমনকি তারা এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠছে যে, মিয়ানমারের সামরিক শাসন পতনের দ্বারপ্রান্তে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করা হচ্ছে। সেখানে সরকারবিরোধী শক্তিগুলো গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত ক্রসিং দখল করেছে। এর ফলে চীন, ভারত ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে যোগাযোগের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে মিয়ানমার সামরিক জান্তা। উত্তরাঞ্চলীয় শান রাজ্যে থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স ১৩০টিরও বেশি সামরিক ঘাঁটি, কৌশলগত ফাঁড়িসহ উল্লেখযোগ্য অঞ্চল দখল করে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে।

এভাবে মিয়ানমারে দীর্ঘমেয়াদি শাসনে সামরিক বাহিনী দুর্বল হয়ে পড়ছে। বস্তুত, তিন বছর আগে সামরিক বাহিনীর অভ্যুত্থানের পর থেকেই তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে মানুষ রাস্তায় নেমেছে। সামরিক শাসনবিরোধী অবস্থান, দুর্নীতি ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের পকেট ভরার ধান্দায় যে অভ্যন্তরীণ সংকট তৈরি হয়েছে; সব মিলিয়ে জান্তা এখন বিপদে। বিভিন্ন ফ্রন্টে যুদ্ধ তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মিয়ানমারের অর্থনৈতিক অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। এর পাশাপাশি দেশটির জান্তা সরকার কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। রাশিয়া, চীন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ ছাড়া আন্তর্জাতিকভাবে কেউই জান্তা সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত আর্থিক নিষেধাজ্ঞা এবং বিশ্বব্যাপী তাদের অগ্রহণযোগ্যতার কারণে তাদের রসদ কমে যাচ্ছে এবং প্রশাসনিক অবস্থান আরও দুর্বল হচ্ছে। ঘনীভূত সংকটে তাদের পতন আসন্ন হয়ে পড়েছে। এই মাত্রায় প্রতিরোধ চলতে থাকলে প্রশ্নটি কেবল দাঁড়াবে কখন পতন ঘটছে। স্বাভাবিকভাবেই মিয়ানমারের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আলোচনাকে জান্তার পতনের পর সেখানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা কী হবে সেদিকে নিয়ে গেছে। এখানে সমন্বয় করতে হবে এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হবে। আন্তর্জাতিক দিক থেকে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এখানে বিরল এক সহযোগিতা হয়তো আমরা দেখব।

মিয়ানমারের স্থিতিশীলতায় চীন তার স্বার্থ সুরক্ষার জন্য শান্তিরক্ষার চেষ্টা করবে। চীন আগে থেকেই শরণার্থীদের আশ্রয়, শান্তি আলোচনার জন্য বিশেষ দূত নিয়োগ এবং রাখাইন রাজ্যের সংকটে মিয়ানমারকে রক্ষার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু জান্তা সরকারের সঙ্গে তার সাম্প্রতিক তিক্ত সম্পর্ক দেখা যাচ্ছে। সে জন্য চীন বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সমন্বিত বাহিনীর কর্মকাণ্ডকে প্রভাবিত করে সরকারবিরোধী শক্তির মধ্যে তার প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করবে। তবে চীন সেখানেই বসে থাকবে বলে মনে হয় না। দেশটি সম্ভবত সামরিক বাহিনী ও প্রতিরোধ শক্তি উভয়ের মধ্যে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখবে, যার ফলে দুপক্ষের ওপর চীনের প্রভাব বৃদ্ধি পাবে। অন্যদিকে চীনের বিরোধিতার কারণে মিয়ানমারে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা আগে থেকেই কম। তবে আমেরিকানরা চীনের প্রভাব কমাতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় মিয়ানমারকে রাখতে পারে। সেখানে সামরিক জান্তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অভাব এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক নিষেধাজ্ঞার কারণে পশ্চিমা বিশ্বের মিয়ানমারের প্রতিরোধ শক্তির সঙ্গে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে; কিংবা বিকল্প হতে পারে, পশ্চিমারা চীনের সঙ্গে মিলে উভয়ের স্বার্থরক্ষার বিষয়টি অগ্রাধিকার দিতে পারে। সেটি হলো, অগণতান্ত্রিক সামরিক জান্তাকে পদচ্যুত করা এবং বেইজিংয়ের ইচ্ছা অনুসারে সেখানে স্থিতিশীল সরকার গঠন করা।

অন্যথায় বিশৃঙ্খল বিশ্বের পরবর্তী ক্ষেত্র হয়ে উঠবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইতিমধ্যে যা ছুরির ফলার ওপর বসে আছে। ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স তাদের হামলার সময় খুব সূক্ষ্মভাবে নির্ধারণ করেছে। লাউকাইং শহরে একটি ঘটনায় জান্তা সরকারের ওপর থেকে চীন ধৈর্যহারা হওয়ার পর পরই তারা এই হামলা চালিয়েছে। গত বছর চীন সরকার স্ক্যাম সেন্টারগুলো বন্ধ করতে সামরিক সরকারের ওপর চাপ দেয়। এই সেন্টারগুলো মূলত চীনের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এসব সেন্টারে আটক পাচার হওয়া ভুক্তভোগীদের ওপর নিষ্ঠুর আচরণের চিত্র সম্প্রতি ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হওয়ার পর বিব্রতকর অবস্থার মুখে পড়ে বেইজিং। চীনের চাপের কারণে ওয়াসহ কয়েকটি শান গোষ্ঠী স্ক্যামে জড়িত থাকায় সন্দেহভাজনদের চীনা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। গত আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চার হাজারের বেশি মানুষকে সীমান্তের ওপারে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু লাউকাইং শহরে থাকা পরিবারগুলো এই ব্যবসা বন্ধ করতে চায় না। কারণ এগুলো থেকে বছরে কয়েক মিলিয়ন ডলার আয় করে থাকে তারা। বিভিন্ন সূত্র বিবিসিকে জানিয়েছে, পরে গত ২০ অক্টোবর লাউকাইং শহরে আটকেপড়া হাজার হাজার মানুষকে উদ্ধারের চেষ্টা করা হয়, যা আসলে ব্যর্থ হয়। স্ক্যাম সেন্টারের হয়ে কাজ করা প্রহরীরা পালানোর চেষ্টা করা অনেক মানুষকে হত্যা করেছে বলে ধারণা করা হয়। এ ঘটনার পর পার্শ্ববর্তী চিন প্রদেশের পৌর সরকার কঠোর ভাষায় প্রতিবাদ জানিয়ে এক চিঠি পাঠায়। যেখানে এ ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়। ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স সুযোগ বুঝে হামলা চালায়। চীনকে শান্ত রাখতে তারা এসব স্ক্যাম সেন্টার বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেয়। চীন প্রকাশ্যে একটি অস্ত্রবিরতির আহ্বান জানিয়েছে কিন্তু অ্যালায়েন্সের মুখপাত্র বলেছে, যুদ্ধ বন্ধ করার বিষয়ে তারা চীন সরকারের সরাসরি কোনো অনুরোধ পায়নি।

কিন্তু তাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হচ্ছে, সামরিক সরকারের পতন নিশ্চিত করতে যত বেশি সম্ভব ভূখণ্ড দখলে নেওয়া। এনইউজি’র ওয়াদা মোতাবেক জান্তা সরকারকে উৎখাতের পর মিয়ানমারের নতুন ফেডারেল কাঠামোর আওতায় সমঝোতার দর কষাকষিতে এটিই তাদের একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সাহায্য করবে। টিএনএলএ দীর্ঘদিন ধরেই তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা টা’য়াং স্বশাসিত অঞ্চলের প্রসার বাড়াতে চাচ্ছিল। সংবিধান অনুযায়ী এই অঞ্চলটি তাদের নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। এমএনডিএএ লাউকাইং শহর এবং পার্শ্ববর্তী সীমান্ত এলাকার নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে চায়। আর সবাই তাকিয়ে আছে আরাকান আর্মির দিকে। এতদিন পর্যন্ত তারা শান রাজ্যের সংঘাতের পক্ষে সমর্থন দিয়ে এসেছে। তারা যদি রাখাইন রাজ্যে সামরিক বাহিনীর ওপর হামলা চালায় তাহলে জান্তারা সেখানে বেশ বিপজ্জনক অবস্থার মধ্যেই পড়বে। টিএনএলএ’র মুখপাত্র বিবিসিকে বলেছে, তার গোষ্ঠী এখন আর সামরিক সরকারের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় যেতে চায় না কারণ ওই সরকার বৈধ নয়। তাদের করা যেকোনো চুক্তি ভবিষ্যতে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসে বাতিল করে দেবে। টা’য়াং, কোকাং এবং ওয়া গোষ্ঠীগুলো নতুন ফেডারেল ব্যবস্থায় তাদের নিজেদের জনগণের জন্য রাষ্ট্রীয় সাংবিধানিক স্বীকৃতি চায়। যুদ্ধের মাধ্যমে এই গোষ্ঠীগুলো হয়তো মিয়ানমারে সামরিক শাসনের অবসানে সহায়তা করবে। কিন্তু তাদের প্রত্যাশা শান রাজ্যের অন্য গোষ্ঠীদের স্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। কাজেই যারা মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করছেন তাদের জন্য এটি অন্য অনেক ইস্যুর মধ্যে একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত