রাষ্ট্রবিজ্ঞানে রাজনীতিবিদের জীবনে ‘ফাইনেস্ট আওয়ার’ বা সোনালি সময় বলতে একটা কথা আছে। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর জীবনে ১৯৭১ সাল ছিল সেই সোনালি সময়। এক সাফল্যময়, হিরণ¥য় অধ্যায়। ওই বছরের মার্চে লোকসভা নির্বাচনে জয়ী হয়ে ভারতের তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর কন্যা। এদিকে পূর্ব পাকিস্তানে বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ওই মার্চ মাসেই শুরু হয়েছিল দুর্বার অসহযোগ আন্দোলন, যা দমনে ২৫ মার্চ কালরাতে ইয়াহিয়া খান গণহত্যা শুরু করলে সীমান্ত খুলে দিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। যুদ্ধদিনে আশ্রয় দিয়েছিলেন এক কোটি শরণার্থীকে। এ ছাড়া দ্রুততম সময়ে মুজিবনগর সরকার গঠন থেকে পরিচালনা, মুক্তি ও মুজিব বাহিনী গঠন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিদেশি জনমত তৈরি, রাশিয়ার সঙ্গে মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষর, ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশকে স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে স্বীকৃতি সব মিলিয়ে একজন লৌহমানবীর মতো যুদ্ধ পরিচালনা করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। যার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধে এ মহীয়সী নারীর অবদানের কথা আলোচনা ছাড়া বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লেখা অসম্ভব।
২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউনের পর ২৭ মার্চেই বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের রাজ্যসভায় বিশেষ আলোচনা হয়। এতে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোর কথা বলেন। উল্লেখ করেন, শেখ মুজিবুর রহমান ও তার জনগণ যে রাজনৈতিক মূল্যবোধের পেছনে দাঁড়িয়েছে সেটা দেখে ভারত অভিভূত। এরপর ৩১ মার্চ ভারতের পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে বাংলাদেশসংক্রান্ত একটি প্রস্তাব পাস হয়। তাতে আশা প্রকাশ করা হয়, পূর্ব পাকিস্তানে সাড়ে সাত কোটি মানুষের অভ্যুত্থান সফল হবে। এ প্রস্তাবে বাংলাদেশ ভারতীয় জনগণের সর্বাত্মক সহানুভূতি ও সমর্থন পাবে বলেও উল্লেখ করা হয়। এরপর এপ্রিলের শুরুতে দিল্লিতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে বৈঠক করেন ইন্দিরা গান্ধী। এতে মুজিবনগর সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
এদিকে পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী জেলা দিয়ে বানের জলের মতো শরণার্থী প্রবেশ শুরু করে ভারতে। সবচেয়ে বেশি শরণার্থী চাপ ছিল পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য। মোট এক কোটি শরণার্থীর অন্তত ৭০ শতাংশ এ রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় আশ্রয় নেয়। এ ছাড়া আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যেও শরণার্থীরা আশ্রয় নেয়। যাদের আশ্রয় ও খাদ্য নিশ্চিত করতে ভারত সরকারকে প্রবল চাপে পড়তে হয়। ছিল নিরাপত্তা শঙ্কাও। কারণ ১৯৭১ সালে পশ্চিমবঙ্গে চলছিল নকশালবাড়ি আন্দোলন। তাছাড়া বিভিন্ন রাজ্য ও সীমান্তে ছিল নানা ধরনের সমস্যা আর সংকট। তাই এ বিষয়ে ভারত সরকারকে অনেক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে জনমত তৈরিতে সেপ্টেম্বরে বিশ^ সফরে বেরিয়ে পড়েন ইন্দিরা গান্ধী। সোভিয়েত রাশিয়া, বেলজিয়াম, অস্ট্রিয়া, পশ্চিম জার্মানি, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্র সফরে তিনি বাঙালি জাতির ন্যায়সংগত আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও পাকিস্তানি গণহত্যা সম্পর্কে বিশ^নেতাদের অবহিত করেন। সংকট সমাধানে কামনা করেন সাহায্য। শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির বিষয়টিও তুলে ধরেন বিশ^বাসীর সামনে। তবে এ প্রচেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বৈরী প্রতিক্রিয়া পেয়েছিলেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী। ১৯৭১ সালের নভেম্বরে মার্কিন মুল্লুকে পৌঁছান ইন্দিরা গান্ধী। বৈঠক করেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী রিচার্ড নিক্সন ও তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের সঙ্গে। তবে এ বৈঠক ফলপ্রসূ হয়নি। ইন্দিরা ও মুজিব সম্পর্কে নিক্সন-কিসিঞ্জার যে কঠোর মনোভাব পোষণ করতেন, তারও কোনো পরিবর্তন হয়নি।
বিশ্ব সফরে ২১ দিন কার্যকর দূতিয়ালি শেষে দেশে ফিরে চূড়ান্ত অভিযানের জন্য প্রক্রিয়া শুরু করেন ইন্দিরা গান্ধী। কারণ সামরিক কৌশল বিবেচনায় ডিসেম্বর ছিল সবচেয়ে অনুকূল সময়। শীতে বাংলাদেশের নদীগুলো তখন শুকিয়ে গেছে। সেনা ও সরঞ্জাম স্থানান্তর করার সেটাই ছিল উপযুক্ত সময়। এদিকে বেশ পরিণত অবস্থায় পৌঁছেছিলেন মুক্তি বাহিনীর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যোদ্ধারা। নভেম্বরের শেষদিকে বয়রা সীমান্তে ভারতীয় অবস্থানে আক্রমণ চালায় পাকিস্তানি সেনারা। এই আক্রমণের পরই ভারতীয় কর্তৃপক্ষ যুদ্ধের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। যদিও ভারত যুদ্ধ শুরু করে আক্রমণকারী হিসেবে, চিহ্নিত হতে চায়নি। ভারতের ভাবনা দূর করে ইয়াহিয়া খান। পাকিস্তানি সেনারা আকস্মিকভাবে ৩ ডিসেম্বর ভারতীয় বিভিন্ন অবস্থানে বিমান হামলা শুরু করে। পাকিস্তানি বাহিনীর এ আক্রমণে বেশ উৎফুল্ল ছিল ভারতীয় সেনা কমান্ড। কারণ এ হামলা এক মোক্ষম সুযোগ এনে দিয়েছে ভারতের সামনে। যার মাধ্যমে দ্রুত পাকিস্তানিদের পরাজিত করা সম্ভব। বাস্তবে হয়েছিলও তাই। মাত্র ১৩ দিনের সর্বাত্মক যুদ্ধে পরাজিত হয় পাকিস্তান। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে রচিত হয় অমর বিজয়গাথা। তবে এ সাফল্য এমনি এমনি আসেনি। এর জন্য ভারতীয় সেনাদেরও বিপুল আত্মত্যাগ করতে হয়। বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের চূড়ান্ত যুদ্ধে ১ হাজার ৬৬১ জন ভারতীয় সেনা বাংলাদেশের মাটিতে শহীদ হন। যদিও অনেকেই ধারণা করেন এ সংখ্যা আরও বেশি।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে সুইডেনের একটি টিভি চ্যানেলের কর্মীদের সঙ্গে ব্যস্ত ছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। এ সময় ভারতীয় সেনাপ্রধান স্যাম মানেক শ টেলিফোনে ইন্দিরা গান্ধীকে ঢাকা পতনের খবর দেন। এরপর দ্রুত লোকসভা ভবনে চলে যান ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী। পরে মুহুর্মুহু করতালির মধ্যে এক ভাষণে তিনি বলেন, পাকিস্তানি সেনারা নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করেছে। ঢাকা এখন স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্ত রাজধানী।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
