৩৪ দিনের স্বপ্ন সফর শেষে দোহা ছাড়ার আগের দিন লিখেছিলাম- আসিতেছে শুভদিন, দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা শুধিতে হইবে ঋণ!
শুভ দিন এসে গেছে। ঋণ শোধও হয়ে গেছে। দেখতে দেখতে ঋণ শোধের একটি বছরও কেটে গেছে! ১৮ ডিসেম্বর ২০২২। ইতিহাসের পাতায় তারিখটা উঠে গেছে পাকাপাকিভাবে। বলতে পারেন, আরও তো ২১টি বিশ্বকাপের ফাইনাল হয়েছে। তো, ওই তারিখটা কেন পাবে বিশেষ সমাদর? কেনই বা এই তারিখের রেশটা রয়েছে গেছে গোটা বিশ্বে?
আগেই বলেছি, এ দিনটা কেবল বিশ্বকাপ ফাইনাল বলে নয়। ৩৬ বছর পর আর্জেন্টিনার শিরোপা জয়ের জন্যও নয়। দিনটা যে ঋণ শোধের। নইলে ভীষণ অন্যায় হতো। ঈশ্বর সেই অন্যায়টা হতে দেননি। লুসাইল আইকনিক স্টেডিয়ামে সেই রাতে ন্যায়বিচার করেছেন সৃষ্টিকর্তা। তাই তো মেসির জীবনটা বদলে গেছে। যে জীবনে আক্ষেপ নামক কোনোকিছুর অস্তিত্ব নেই।
সেই রাতটা হাজির হয়েছিল মেসির দীর্ঘ দিনের অপেক্ষা ঘোচানোর উপলক্ষ নিয়ে। এই পাওয়ার অপেক্ষাতে কেটেছে কত নির্ঘুম রাত। না পাওয়ার বেদনায় বারবার নীল হতে হয়েছে, হৃদয়ে ঘটেছে রক্তক্ষরণ। বালিশ ভিজেছে নোনা জলে। সে রাতেও কেঁদেছিলেন তিনি। তবে সে জল অনেক অপেক্ষা শেষে আনন্দাশ্রু হয়ে ঝরেছে। বাঁ পায়ের জাদুকর হেসেছেন, জগৎ হেসেছে। তিনি কেঁদেছেন, কেঁদে উঠেছে গোটা বিশ্ব। মুকুটে মহামূল্য সোনালি পালকটা যুক্ত হওয়ার পর আবেগে ভেসেছেন, ভাসিয়েছেনও। সে রাতে লুসাইলের গ্যালারিতে বসে ভেসেছিলাম আমিও। অমন একটা মহা ফাইনালের সাক্ষী হয়েছি বলেই মরু থেকে ফিরেছিলাম স্মৃতির অ্যালবাম সমৃদ্ধ করে। যা রোমন্থনে ধরা দেয় অমূল্য মণি-মাণিক্য।
সেটি ছিল এক পাগলাটে ফাইনাল। বিশ্বকাপে এমন ফাইনাল আর আসবে কিনা সন্দেহ। আর্জেন্টিনার ৩৬ বছরের শিরোপা খরা ঘোচাতে মেসি খেলেছেন ঈশ্বরের পায়ে। তার মায়াজালে আর্জেন্টিনাও খেলেছে বদলে যাওয়া রূপে। তবে রাতটা হতে পারত এক ফরাসির। ভীষণ তেজি, ভীষণ একগুঁয়ে এক তরুণের বিস্ফোরণে মুহূর্তের লুসাইল যেন রূপ নিতে বসেছিল ২০১৪-র মারাকানায়। এলিয়েন নয়, কিলিয়ান এমবাপ্পের জাদু ভোজবাজির মতো পাল্টে দিয়েছিল দৃশ্যপট। তবে ওই যে রাতটা ছিল দায়শোধের। তাই ঈশ্বর দুহাত ভরে দিয়েছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকাকে। কথায় আছে, ঈশ্বর বহুরূপী। সে রাতে মেসির পায়ে যেমন ভর করেছিলেন ঈশ্বর, ঠিক তেমনি এমিলিয়ানো মার্তিনেজ অধিষ্ঠিত হন বিধাতা রূপে। অতিরিক্ত সময়ে বদলি ফরাসি ফরোয়ার্ড কলো মানির শট অবিশ্বাস্যভাবে ঠেকিয়ে দেওয়ার পর টাইব্রেকারে দুই শট ঠেকিয়ে মার্তিনেজ আর্জেন্টাইন মহানায়কের হাতে তুলে দেন বিশ্বকাপ।
অথচ এমবাপ্পে সে রাতে লুসাইলকে মারাকানায় বদলে ফেলতে যা কিছু সম্ভব সবই করেছিলেন। প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা এগিয়ে যায় ২-০ তে। আর্জেন্টাইন সমর্থকদের সেকি উল্লাস? অনন্তলোক থেকে ছিয়াশির বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক দিয়াগো ম্যারাডোনাও যেন শূন্যে হাত ছুড়ে শামিল সেই উদযাপনে। খুব মনে হচ্ছিল এই লুসাইলে আট বছর আগের মারাকানার মায়াকান্নার শঙ্কা নেই। কিন্তু ঈশ্বরের স্বহস্তে লেখা চিত্রনাট্যের শেষটা ছিল রোমাঞ্চে ভরপুর। দ্বিতীয়ার্ধের প্রথম আধঘণ্টাও ছিল আর্জেন্টাইনদের। এরপরই এলিয়েন রূপ ধারণ করেন এমবাপ্পে। দুই মিনিটের ব্যবধানে গোল করে ফ্রান্সকে ম্যাচে ফেরান ফরাসি যুবরাজ। নির্ধারিত ৯০ মিনিট ২-২-এর পর ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। তাতে আবারও আর্জেন্টিনার ছন্দে ফেরা। আর ১০৭ মিনিটে উপস্থিত সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। মেসির পায়ে ফের ভর করে ঈশ্বর। তাতেই ৩-২ হয়। তারপরও এই গল্পটা শেষ হতে দেননি এমবাপ্পে। ১১৬ মিনিটে তার জোরালো শট বক্সের ভেতর মন্তিয়েলের হাতে লাগলে বাজে পেনাল্টির বাঁশি। তা থেকে হ্যাটট্রিক করে জমিয়ে তোলেন ম্যাচ। ১৯৬৬ বিশ্বকাপে জিওফ হার্স্টের পর প্রথম ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপের ফাইনালে হ্যাটট্রিক করলেও ২০১৮’র মতো বিশ্বকাপ ছোঁয়া হয়নি তার। মেসির জন্য জীবন বাজি রেখে হৃদয় জিতে নেন এমিলিয়ানো মার্তিনেজ।
এ রাতটা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল ফরাসি বীরের কাছ থেকে। ঠিক ২০১৪’র মারাকানায় যেটা হয়েছিল মেসির সঙ্গে। জার্মানির কাছে হেরে জেতা হয়নি বিশ্বকাপ। অধরা কাপের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মেসির সেই বিষণœ রূপ অনেকেই আর্কাইভে রেখে দিয়েছেন। হৃদয় ভাঙার সেই ছবি আট বছর পর বদলে গেছে। সেই তিনিই লুসাইলের সেরা মঞ্চে কাক্সিক্ষত শিরোপার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন পরম স্বস্তি নিয়ে। হাত বুলিয়ে চুমুও খেয়েছেন, প্রেয়শীর ঠোঁট স্পর্শ করার মতো করে। আহা, কী অপার্থিব শান্তি! দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর স্বপ্নের ট্রফি ছোঁয়ার সময় তার ঠোঁটে ছিল স্মিত হাসি। সেই হাসিটাই ছড়িয়ে গেছে গোটা দুনিয়ায়। হাসিটা যে মেসি কেবল একা হাসতে চাননি। চেয়েছিলেন গোটা দল, গোটা জাতিকে নিয়ে। আর তার হাতে বিশ্বকাপ দেখতে চেয়েছিলেন বিশ্বের শতকোটি ফুটবলপ্রেমী। আহা, সব অঙ্গ মিলে যাওয়ার সে রাত!
পাঁচবারের চেষ্টায় মেসির স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। তাতেই সার্থক হয়েছে দোহার যত আয়োজন। ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা ফিফার শীর্ষ কর্তাদের ভজিয়ে হোক, কিংবা পেট্রো ডলারের জোরে, ২০১০ সালে কাতার ঠিকই আয়োজক স্বত্ব জিতে নিয়েছিল বিশ্বকাপের। এক যুগে বিশ্বকাপকে সফল করতে কী না করেছে আয়োজক কাতার! সমালোচকদের মুখ বন্ধ করতে ধু ধু মরুভূমিতে ডলারের বন্যা বইয়ে দিয়েছিল। তো তাদের সব প্রচেষ্টাই ভেস্তে যেত, ফুটবলের দায় শোধ না হলে।
সেটা হয়েছে বলেই এই বিশ্বকাপ আলাদা হয়ে থাকবে বহুকাল। মেসি তো ছিলেনই। ফাইনালের নায়ক মার্তিনেজও ছিলেন। তবে মরুর বুকে প্রথম বিশ্বকাপ সার্থক করতে ঘটেছে নানা অবিশ্বাস্য ঘটনা। পুরো গ্রুপপর্বে অবিশ্বাস্য সব অঘটনের ঘটনা ঘটেছে। মেসির আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে সৌদি আরবের রূপকথা, স্পেন-পর্তুগালকে হটিয়ে মরক্কোর সেমিফাইনালে পা রাখা, পর্তুগিজ রাজা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর করুণ প্রস্থান; নতুন রাজা হয়ে গনসালো রামোসের আবির্ভাব, পাঁচবারের সেরা ব্রাজিলের বিষাদের সাগরে ডুব দেওয়া, নেইমারের চোট-ঝলক, রিচার্লিসনের অসামান্য গোল, আলভারেজের মাকড়সার পা, সুয়ারেজের কান্না কোনো কিছুতেই কমতি ছিল না। এমন সফল আয়োজনের পর কাতার বুক ফুলিয়ে বলতে পারছে, আমরা পারি।
শেষ করছি, অতি প্রিয় একজন ক্রীড়ালেখকের একটা লেখা দিয়ে, ‘ঈশ্বর নেমে এলে ফুটবল মাঠ আর ফুটবলের মাঠ থাকে না। স্বর্গরূপ নেয়।’ লুসাইল যেন সেই রূপটাই সে রাতে ধারণ করেছিল। যার রেশ রয়ে গেছে আজও; এক বছর পরও। রেশটা রয়ে যাবে অনন্তকাল!