এ পৃথিবী একবার পায় তারে 

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০২৩, ১২:৪৯ এএম

লুসাইলের জাদুকরী সেই রাতের পর সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে ৫৮৪ মিলিয়ন মাইল ঘুরে এসেছে পৃথিবী। দীর্ঘ এই পরিক্রমাকেও মনে হয় কয়েক মুহূর্ত আগের স্মৃতি, যেন মাত্রই চোখের সামনে ঘটল। স্নায়ুক্ষয়ী ফাইনালের নাটকীয় সমাপ্তি, অবশেষে বিশ্বকাপ শিরোপা লিওনেল মেসির হাতে। যে মাঠে সৌদি আরবের কাছে ২-১ গোলে হেরে শুরু হয়েছিল টানা ৩৬ ম্যাচ অপরাজিত থাকা আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ অভিযান, সেই মাঠেই ১ মাস পর ঘুচল ৩৬ বছরের অপেক্ষা। স্বপ্নপূরণের পরের বছরটা যে মেসির স্বপ্নের মতো কেটেছে সেটা বলা যাবে না, তবে ক্ষুদে জাদুকর এখন খুঁজে পেয়েছেন জীবনের নতুন দিশা।

মারাকানা স্টেডিয়ামে ২০১৪ সালের ফাইনালে জার্মানির কাছে হারের পর আসরের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারটা আর নিতে যাননি মেসি। সেবার গনজালো হিগুয়েইন আর রদ্রিগো প্যালাসিওসের ভুলে বিশ্বকাপটা নিঃশ্বাস দূরত্ব থেকে ফস্কে যায় মেসির। কাতার বিশ্বকাপ ছিল ৩৬ বছর বয়সী মেসির খেলোয়াড় হিসেবে শেষ বিশ্বকাপ, সর্বকালের সেরার বিতর্কে নিজেকে সন্দেহাতীতভাবে সেরা প্রমাণের শেষ সুযোগ। কাতার বিশ্বকাপে যেন গোটা পৃথিবীই চাইছিল মেসির হাতে উঠুক বিশ্বকাপটা। তা না হলে কেন বারবার খাদের কিনার থেকেই ফিরে আসবে আর্জেন্টিনা? বিশ্বকাপটা জিতেছেন মেসি, সিলমোহর মেরে দিয়েছেন সর্বকালের সেরা তর্কে। ডিয়েগো ম্যারাডোনা নন, পেলে নন, কিংবা কখনোই বিশ্বকাপ না খেলা আলফ্রেডো ডি স্টেফানোও নন। মেসিই ফুটবল শ্রেষ্ঠত্বের শীর্ষবিন্দু। বিশ্বকাপ জয়ের আগপর্যন্ত উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ, কোপা আমেরিকা, ক্লাব বিশ্বকাপ, লা লিগা, লিগ ওয়ান, অলিম্পিকের সোনার মেডেল, যুব বিশ্বকাপ, ব্যালন ডি অর, ফিফা দ্য বেস্ট...ফুটবলের এমন কোনো সাফল্যের স্মারক ছিল না, যা ছিল না মেসির। অতৃপ্তি ছিল শুধুই বিশ্বকাপের, এক বছর আগে সেই স্বর্ণগোলকও উঠেছে মেসির হাতে।

বিশ্বকাপটাকে পাশবালিশ বানিয়ে ঘুমিয়েছেন, ছাদ খোলা বাসে চড়ে বুয়েনস এইরেসের উত্তাল জনসমুদ্রকে দেখেছেন, বিশ্বকাপজয়ী সতীর্থ ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে উৎসবও করেছেন প্রিয় গানের দলের বাজনার তালে তালে। মেসির জীবনটা পৃথিবীর অনেক প্রান্তেই ভালবাসায় ভরে উঠলেও ফ্রান্সের মাটিতে তার জীবনটা হয়ে উঠছিল বিষময়। প্যারিস সেন্ত জার্মেইর সঙ্গে তখন চুক্তিবদ্ধ মেসি, আর বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনা হারিয়েছে ফ্রান্সকেই। সবমিলিয়ে প্রেমের শহর প্যারিসের বাসিন্দারা যেন হয়ে উঠল প্রত্যাখ্যাত প্রেমিক। পিএসজির খেলায় মাঠে উপস্থিত সমর্থকরা দুয়োধ্বনি দেওয়া শুরু করলেন মেসিকে। কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গেও মেসির হালকা মনোমালিন্য শুরু হলো। ব্যক্তিগত চুক্তির অংশ হিসেবে প্রচারণার কাজে পরিবার নিয়ে সৌদি আরব গিয়েছিলেন মেসি, তাই অংশ নিতে পারেননি পিএসজির অনুশীলনে, সেজন্য তাকে দুই সপ্তাহের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়। তারকাবহুল দল গড়েও পিএসজি চ্যাম্পিয়নস লিগ জিততে পারেনি, যে স্বপ্ন শুরুতে দেখিয়েছিলেন মেসিও। সব মিলিয়েই পিএসজি কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে সম্পর্কটা খারাপ হতে শুরু করে মেসির।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে মেজর লিগ সকার দলের মালিকানায় থাকা সাবেক ইংলিশ তারকা ডেভিড বেকহ্যাম সুযোগটা নেন মেসিকে মার্কিন মুল্লুকে এনে ফুটবলকে আরও জনপ্রিয় করার। বেকহ্যাম বলছিলেন কীভাবে মেসিকে আসতে রাজি করালেন, ‘চার বছর আগে মেসির বাবার হোটেল রুমে অনেকটা জোর করেই ঢুকে পড়েছিলাম, সে তখন বার্সেলোনায়। তখন অবশ্য মেসিও মায়ামিতে আসার জন্য তৈরি ছিল না, আমরাও প্রস্তুত ছিলাম না। তবে বলে এসেছিলাম যে, তোমার ছেলেকে আমরা চাই। আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ কর, যখন সময়টা ঠিক মনে হবে বলে তোমার মনে হয়। সে পিএসজি থেকে বার্সেলোনাতেই হয়তো ফিরে যেত, তখন হঠাৎ করেই সবকিছু কেমন মিলে যেতে শুরু করল। আমরা জানতাম তাকে আনতে পারলে সবকিছু বদলে যাবে।’

মেসিকে মার্কিন মুল্লুকে আনতে মোটা টাকাই খসেছে ইন্টার মায়ামির। মেসির বেতন বছরে ১২ মিলিয়ন ডলার আর অন্যান্য সব সুযোগ-সুবিধা মিলিয়ে নিশ্চিতভাবেই বছরে ২০ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার ক্লাবের তরফ থেকে পাচ্ছেন মেসি। সঙ্গে থাকবে জার্সি বিক্রির আয়, ওটিটি প্ল্যাটফর্মে এমএলএসের খেলা দেখার ‘সিজন পাস’ বা পুরো মৌসুমের জন্য গ্রাহক মাশুলের আয় থেকে ভাগ এবং সেই সঙ্গে ক্লাবেরও মালিকানার অংশ।

সৌদি আরবে খেলার জন্য আকাশছোঁয়া অঙ্কের প্রস্তাব পেলেও মেসি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকেই বেছে নিয়েছেন জীবনযাত্রার স্বাচ্ছন্দ্যের কারণেই। সৈকত ঘেঁষা প্রাসাদপম বাড়ি কিনেছেন মায়ামিতে।

বিশ্বকাপ জয়ের পর পিএসজির টিভি চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মেসি বলেছিলেন, ‘যাই করছি সবইই ভালো লাগছে। এটা ব্যাখ্যা করা কঠিন, তাই না। কারণ একটা আজীবনের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে, যেটা আমরা আর্জেন্টিনার মানুষদের সঙ্গে ভাগাভাগি করেছি, সবাই সেটা উপভোগ করেছে। সত্যি কথা বলতে, আমরা ভেবেছিলাম বিশ্বকাপ জিতলে সবাই পাগল হয়ে যাব। সেটা হইনি, যখন সত্যিই জিতলাম তখন মনে হলো এই মুহূর্তটা আমাদের সবাইকে বাঁচিয়ে রাখবে। আমরা যারা আর্জেন্টিনার হয়ে খেলে বিশ্বকাপটা জিতলাম, আমরা সত্যিই সৌভাগ্যবান।’

মেসির বিশ্বকাপ জয়ের পরের অনুভূতিসহ অনেক না বলা কথা নিয়েই আসছে তথ্যচিত্র ‘মেসি’স ওয়ার্ল্ড কাপ : রাইজ অব আ লিজেন্ড। মার্কিন ওটিটি প্ল্যাটফর্ম অ্যাপল টিভি প্লাসে (যে প্ল্যাটফর্মে দেখা যায় এমএলএসের খেলাও) আসছে ফেব্রুয়ারিতে মুক্তি পাবে তথ্যচিত্রটি। গ্যারি লিনেকার এ তথ্যচিত্রে কণ্ঠ দিয়েছেন, আছে ড্রেসিংরুমের না দেখা অনেক ফুটেজ আর অনেক অজানা অনুভূতির বয়ান। তথ্যচিত্রটি প্রকাশ পেলে নিশ্চয়ই আরও জানা যাবে বিশ্বকাপ জয়ের পর মেসির কেমন কেটেছে দিনগুলো।

মহাভারতের কর্ণ কিংবা ইলিয়াডের হেক্টরের মতো ট্র্যাজেডির নায়কই হয়ে

থাকতেন মেসি, যদি না লুসাইলের ফাইনালের ১২০ মিনিটের মাথায় কোলো মুয়ানির সেই শটটা বাজপাখির মতো আটকে না দিতেন এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। যে মন্তিয়েলের হ্যান্ডবলে পাওয়া পেনাল্টি থেকে গোল করে ফ্রান্সকে সমতায় ফিরিয়েছিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে, সেই মন্তিয়েলই নিলেন টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার শেষ শটটা। সেটাই গেল গোলে, নিশ্চিত করল মেসি বিশ্বকাপটা জিতেছেন। ২০১৪ বিশ্বকাপে নিজে ভালো খেলেও সতীর্থদের ব্যর্থতায় মেসিকেই নিতে হয়েছিল অপবাদ। সেরা খেলাটা জমিয়ে রাখেন বার্সেলোনার জন্য, এমন অপবাদে আর্জেন্টিনার মানুষও তাকে আপন করে নিতে পারেনি বহুদিন। এখন তো মেসি আর্জেন্টিনার মানচিত্রের গ-ি ছাপিয়ে গোটা পৃথিবীর।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত