লেখা আর দেখা দুই জিনিস। আসলেই কি তাই? এই দুই এক হলে কেমন হয়? লেখাতে যা বলা হয় তার দৃশ্য দেখতে কেমন হয়? লেখা অবলম্বনে কোনো সিনেমার কথা বলছি না। লেখা পাঠে মনোজগতে যে কল্পদৃশ্য তৈরি হয়, তাও নয়। বলছি সংবাদপত্রে মুদ্রিত প্রতিবেদন কীভাবে আক্ষরিক অর্থেই তথ্যের ক্যানভাস হয়ে ওঠে। পাঠকমাত্রই জানেন বিশেষ দিনের দেশ রূপান্তর হাতে নিলে তাকে পাঠক-দর্শক দুটোই হতে হয়।
আজ ষষ্ঠ বছরে পা রাখল দেশ রূপান্তর। প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক অমিত হাবিবের নেতৃত্বে শুরু থেকেই নতুনত্ব আর চমক নিয়ে পাঠকের কাছে সমাদৃত হয়ে আসছে। তারই অনুপ্রেরণা ও আদর্শকে ধারণ করে গত এক বছরে দেশ রূপান্তর সংবাদপত্রের ভাষাটাই বদলে দিয়েছে। এই বলা কি বাহুল্য হবে? ব্যতিক্রমী প্রতিবেদন অভিনব উপস্থাপন, গতানুগতিক ধারা থেকে বেরিয়ে সংবাদপত্র সজ্জার সিগনেচার ধারাটি যে দেশ রূপান্তরেই সূচিত, তা পাঠকমাত্রই স্বীকার করবেন।
‘বিশেষ’ আসলে কেমন? আবেগের সঙ্গে ঘটনার মুখোমুখি। একঘেয়েমি আর ছকে বাঁধা মানুষটি যখন পাহাড় কিংবা সমুদ্রের সামনে দাঁড়ায় তখন দুই হাত যতদূর যায় ততদূর প্রসারিত করে। কারণ দিনটি তার। তার ‘বিশেষ’। জনআকাক্সক্ষাকে আপন করে দেশ রূপান্তরের বিশেষও তেমনি। সমুদ্রের সামনে দাঁড়ানো ওই মানুষটার মতো। সংবাদপত্রের ছকবাঁধা কলাম, গ্রিড, গ্রামার ভেঙে দুই হাত যতদূর যায় ততদূর প্রসারিত করে দেয়। কারণ বিশেষ। রোজ নয়। ওই দিনটি দেশ রূপান্তরের।
সর্বশেষ ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনালের কথা বলা যাক। স্নায়ুকাঁপা রোমাঞ্চকর। বলা হয়, বিশ্বকাপের সর্বকালের অন্যরকম ফাইনাল। মহাকাব্যকে যেমন আট সর্গে আটকাতে হয়, তেমনি সংবাদপত্রের আট কলামের সীমানা। কিন্তু দিনটি তো বিশেষ। এত বড় ঘটনায় নিয়ে দুই হাত প্রসারিত করা যায় কীভাবে?
ওইদিনের একটা ছোট গল্প বলি। সারা দুনিয়া উত্তেজনায় কাঁপছে। জনআকাক্সক্ষা যেমন, বার্তাকক্ষ তো তেমন হওয়া চাই। আমরাও ব্যতিক্রম নই। আমরা ভেবেছিলাম আট কলামের বাইরে তো কিছুই করার নেই। কিন্তু সারা দুনিয়ার আকাক্সক্ষা তো ১৬ কলামের। আফসোস হচ্ছিল পত্রিকা ১৬ কলাম হলে কতই না ভালো হতো। এ ভাবনা নিয়ে আমরা আমাদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোস্তফা মামুনের কাছে গেলাম। উনি বললেন, ‘কী করতে চান?’ আমরা বললাম, ‘দুই হাত প্রসারিত করতে চাই।’ উনি বললেন, ‘আমার সামনে দুই হাত প্রসারিত করেন তো?’ দুই হাত প্রসারিত করলাম। উনি পত্রিকার জোড়া লাগা প্রথম ও শেষ পৃষ্ঠা মেলে ধরলেন। বললেন ‘১৬ কলামই হবে, চলেন...’
দেশ রূপান্তরের বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলার কাভারেজ ছিল ১৬ কলাম জুড়ে। বুক উঁচিয়ে দুই হাত প্রসারিত করা। প্রথম পাতায় ৮ কলামে স্বতন্ত্র শিরোনাম। শেষ পাতায় ৮ কলামে আরেকটি স্বতন্ত্র শিরোনাম। কিন্তু দুই শিরোনাম একসঙ্গে পড়লে ১৬ কলামের শিরোনাম। শেষ পৃষ্ঠায় থাকা শিরোনাম ‘শতাব্দীসেরা ফাইনাল আর্জেন্টিনার’ প্রথম পৃষ্ঠায় থাকা শিরোনাম ‘মেসিকে ঋণ শোধ পৃথিবীর’ দুই এক করলে ‘শতাব্দীসেরা ফাইনাল আর্জেন্টিনার মেসিকে ঋণ শোধ পৃথিবীর’। জোড়া লাগা প্রথম ও শেষ পৃষ্ঠার মাঝ জমিনে একটা ছবি। ২০২২ সালের ১৯ ডিসেম্বর সকালে পাঠকের দুয়ারে আকাক্সক্ষার দৃষ্টান্ত হয়েছে দেশ রূপান্তর।
আরেক দিনের একটি মাঝারি গল্প বলি। দ্বিতীয় সংস্করণ প্রেসে গেছে। হাঁফ ছেড়েছে বার্তা কক্ষ। আমরা যে যার বাসার পথে। রাত ২টায় ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মামুন ভাইয়ের ফোন। জানালেন ফুটবলের রাজা ছেড়েছেন জীবনের সিংহাসন। আপনারা কোথায়? আমরা যে যার পথ থেকে ফিরে আসি নিউজ রুমে। মামুন ভাইও এলেন। এখন কী করা? ৮২ বছরের জীবনে দুনিয়াকে রোমাঞ্চিত করা রাজা ছেড়েছেন দুনিয়া। এ খবরের ট্রিটমেন্ট কী হবে? নিশ্চয়ই মূল কাগজের ডান দিকের কোনা ফাঁকা করে খবর ধরানোর খবর এটা নয়। তাহলে? মামুন ভাই বললেন, ফুল পেজ। উনি পেলে। এত বড় তার জীবনের স্টেডিয়াম। ফুল পেজ করব। আমরা ভাবলাম এক পেজের জন্য লেখা কই? এত লেখা এখন কীভাবে সম্ভব? মুহূর্তেই আমাদের চিন্তার মুশকিল আসান হলো। জাস্ট ফুল পেজ একটা পোর্ট্রেট ছবি বসানো হলো। ছবির মাথায় শিরোনাম ‘অনন্ত নক্ষত্রে’। ছবির নিচে দুই পাশে স্ক্রিন বক্সে দুই প্রতিবেদন। মাঝখানে লেখা ‘পেলে ১৯৪০ থেকে (ইনফিনিটি আইকন)’। সাধারণত জন্ম থেকে মৃত্যু সাল লেখা হয়। কিন্তু পেলেকে মরতে দেয়নি দেশ রূপান্তর।
দিনের খবরের ক্ষেত্রে সাধারণত যা হয়। প্রতিবেদনের মাত্রা অনুযায়ী কলাম ইঞ্চি ভাগ। সে অনুযায়ী প্রতিবেদন ট্রিটমেন্ট পায়। কিন্তু দেশ রূপান্তর এখানে প্রথা ভাঙতে চেয়েছে। শুধু প্রতিবেদন ছাপা নয়, ঘটনা উপস্থাপন। ঘটনাকে বিশেষত্ব দিয়ে তার গভীরতা ও প্রভাব বিবেচনা করা। সে ক্ষেত্রে কলামে আটকে না থেকে ঘটনা উপস্থাপনের জমিন তৈরি করা। ফলে ঘটনা অনুযায়ী প্রথম পাতার ওপরের হাফ পেজ। নিচের হাফ পেজ। ওপরের কোয়ার্টার পেজ। পেছনের পাতার হাফ কিংবা ফুল পেজ। স্ক্রিনের ওপর ছবি তার ওপর ইনসার্ট বক্স করে এক ঘটনার বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলের প্রতিবেদন। টোটাল ব্যাপারটা একটা ঘটনা। একটা কম্পোজিশন। তাতে পড়া যায়, দেখা যায়, অনুভব করা যায়। দেশ রূপান্তর মূলত মনে করে, শুধু প্রতিবেদন পড়ে নয়, ছবি দেখে নয়, এসবের ভিন্নমাত্রায় উপস্থাপনে কাগজই হবে ঘটনাস্থল। যেখানে পাঠক স্বয়ং প্রত্যক্ষদর্শী।
দিনের ঘটনার ফুল পেজ কাভারেজের দুটি উদাহরণ টানা যাক। বাংলাদেশের অহংকার পদ্মা সেতুর উদ্বোধন। ওইদিন দেশ রূপান্তরের প্রথম পৃষ্ঠাটা হয়ে গিয়েছিল পদ্মার বুক। জমিন জুড়ে পদ্মা সেতু। শিরোনাম ‘খুলে যাচ্ছে দখিনা দুয়ার’। প্রথম পৃষ্ঠায় লেখা মানে প্রতিবেদন ছিল না। শুধু শিরোনাম আর ছবি। দেখার ভাষাই এখানে লেখার অধিক।
বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় আরেকটি মাইলফলক মেট্রোরেল। অনেক বড় জনআকাক্সক্ষা। অনেক বড় স্বপ্নের বাস্তবায়নের দিনে দেশ রূপান্তর উপস্থাপন করে অনন্য এক ‘প্রথম পাতা’। এখানেও দেশ রূপান্তরের বুক যেন আকাশ থেকে দেখা পুরো ঢাকা শহর। তার বুক চিরে চলছে মেট্রোরেল। এখানে একটা ছবি। বই খোলা আদলে একটা প্রতিবেদন। শিরোনাম ‘জটের শহরে জাদুর মেট্রো’।
দিনে ঘটনায় হাফ পেজ কাভারেজের আরও দুটি উদাহরণ দেখে নেওয়া যাক। গত ২৮ অক্টোবর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সমাবেশ ঘিরে ছিল উত্তেজনা। ওইদিন দেশ রূপান্তর হাফ পেজে সেই উত্তেজনা উপস্থাপন করে। একপাশে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের হুংকারমুখর ছবি। অন্যপাশে একই আদলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের ছবি। ছবির ওপর স্ক্রিন বক্সে পাঁচটি প্রতিবেদন। কলাম গুনে নয়, পুরো সিচুয়েশন উপস্থাপন ‘মহা সমাবেশ লড়াই।’
একইদিন চট্টগ্রামে বঙ্গবন্ধু টানেলের উদ্বোধন হয়। ওইদিনের কাগজের প্রথম পাতার নিচের হাফ পেজে টানেলের ছবি। দেশ রূপান্তরের সিগনেচার অনুযায়ী যথারীতি ছবির ওপর স্ক্রিন বক্সে তিনটি প্রতিবেদন। শিরোনাম ‘জলদেশে সূর্যোদয়’। এরকম বড় ঘটনার আরও আরও বড় উপস্থাপন করে চলেছে দেশ রূপান্তর।
দেশ রূপান্তর দিনের ঘটনার বাইরে নিজস্ব বিশেষ উপস্থাপন করে থাকে জনআকাক্সক্ষাকে প্রাধান্য দিয়েই। তার মধ্যে অন্যতম ‘তারারা থাকে আকাশে বিদেশে’। দেশের বিভিন্ন সেক্টরের কীর্তিমানরা কেন দেশের বাইরে চলে যান। এই নিয়ে বিদেশে থাকা তারকাদের ছবিসহ তিনটি প্রতিবেদন হাফ পেজ উপস্থাপন করা হয়, যা পাঠক মহল থেকে ব্যাপক সাড়া মেলে।
করোনার পর সম্প্রতি ভয়াবহ ডেঙ্গুর সঙ্গে লড়াই করছে দেশের মানুষ। এই নিয়ে ‘হাজার সর্বনাশের ডেঙ্গু’ নিয়ে হাফ পেজ আয়োজন করা হয়। আক্রান্ত শিশু, নারী, প্রবীণদের নিয়ে তিনটি ভিন্নমাত্রার প্রতিবেদনে দুই ভাগের চিত্র উঠে আসে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে সেবা নিতে গিয়ে যেমন জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট, থানা, ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে গিয়ে জনসাধারণের যে ক্রমাগত ভোগান্তি, তা নিয়ে ফুল পেজ উপস্থাপন ‘দুর্ভোগের ধারাপাত’। নিত্যদিনের সাতটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে এই উপস্থাপনে।
‘জাতিগত মননের উৎকর্ষ, ‘সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি’ ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ, জনযন্ত্রণার আকাক্সক্ষা, ‘জনদুর্ভোগ’ ‘উন্নয়নের অগ্রযাত্রা’ ‘স্মরণে মূল্যায়নে কিংবদন্তি’ ইত্যাদি নিয়ে দেশ রূপান্তর গত এক বছরে পাঠকের চাওয়া চিন্তার সহযোগী হয়েছে।
কিংবদন্তি চিত্রশিল্পী এসএম সুলতান। এই বছর গেল তার জন্মশতবর্ষ। এই নিয়ে দেশ রূপান্তর বিশেষ করার চিন্তা করে। প্রশ্ন ওঠে ফের কয় কলাম? প্রশ্নটা এখানেই থাক। এবার ভাবা যাক সুলতানের ক্যানভাস কত বড়। তার ক্যানভাসের মানুষগুলো কেমন। এত বড় শিল্পী জাতিকে কত বড় করেছেন। সুলতানের ‘ধানকাটা’ ছবির ফ্রেমটা চিন্তা করা যায়? ৩২ ফুট পাশে। ১৮ ফুট ওপর থেকে নিচে। একটি পত্রিকার পৃষ্ঠা মাস্ট হেডসহ লম্বায় ২০ ইঞ্চি, প্রস্থে ১৩ ইঞ্চি। তো সুলতানকে ফুল পৃষ্ঠা কাভারেজ দিয়ে কি আর তার প্রতি শ্রদ্ধার শেষ হয়? হয় না। দেশ রূপান্তর মহান এই শিল্পীকে ফুল পেজে ধারণ করে কৃতজ্ঞ থাকে। শিরোনাম দেওয়া হয় ‘সুলতানি শতবর্ষ’। সুলতানকে নিয়ে তিনটি মূল্যবান লেখা যুক্ত করা হয়। জাতীয় দৈনিকের এক পৃষ্ঠা এত বড় শিল্পীর জন্য যথেষ্ট নয়। তবুও দেশ রূপান্তর ছাড়া এমন দৃষ্টান্ত আছে কি?
একইভাবে পঁচিশে বৈশাখে দেশ রূপান্তর হাজির হয়েছে পৃষ্ঠা জুড়ে রবিঠাকুরের ছবি নিয়ে। ছবির ওপর যথারীতি অমোঘ বাক্য এক। শিরোনাম করেছে ‘রবি অস্ত যায় না’। নজরুলের ক্ষেত্রেও তাই। সেই সিগনেচার কাভারেজ। শিরোনাম ‘কালের ধূমকেতু মহাকালের ধ্রুবতারা’।
পাঠক না চাইলে আমরা কেউ না। পাঠককে কাগজের দর্শক বানানোর শক্তিটা পাঠকের কাছ থেকেই। প্রিয় পাঠক, আমরা চেষ্টা করেছি। আমাদের এগিয়ে নেবেন। দেশ রূপান্তর আপনার সুখে-দুখে উৎসবের সহযোগী।
