গ্রেপ্তার এড়াতে ওমরাহ করতে যাচ্ছেন বিএনপি নেতাকর্মীরা

আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৭:০৭ এএম

গ্রেপ্তার এড়াতে ওমরাহ করতে যাচ্ছেন বিএনপি নেতাকর্মীরাকামাল হোসেন। কুমিল্লা মুরাদনগর থানা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। তার বিরুদ্ধে মামলা আছে প্রায় একশর মতো। জামিনে ছিলেন অর্ধশত মামলার। গত তিন মাসেই নতুন করে ১৮টি নাশকতার মামলার জালে পড়ে যান তিনি। তাকে ধরতে প্রতিদিনই বাসায় অভিযান চালান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে ১০ দিন আগে ওমরাহ ভিসায় চলে আসেন সৌদি আরবে। ঝক্কি-ঝামেলা এড়াতে তিনি ওমরাহ গ্রুপের সঙ্গে দেশ ত্যাগ করেন।

চট্টগ্রামের হালিশহর থানা বিএনপির কর্মী রাজন মিয়াও একই কায়দায় সৌদি আরব চলে আসেন। তার বিরুদ্ধে মামলা আছে ১১টি। এর মধ্যে নাশকতার মামলাই ৯টি। এ দুজনের মতোই অন্তত শতাধিক বিএনপি নেতাকর্মী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে ‘বিশেষ কায়দায়’ দেশ ছেড়ে গেছেন। এ ক্ষেত্রে বিমানবন্দরগুলোতে দায়িত্বরত পুলিশের সদস্যদের অসতর্কতার সুযোগ নিচ্ছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। আবার কেউ কেউ অসাধু পুলিশ সদস্যদের ‘বিশেষ উপহার’ দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগও এসেছে।

সম্প্রতি সৌদি আরবে সরেজমিনে দেখা গেছে, মক্কা, মদিনা ও রিয়াদে বিএনপির নেতাকর্মীরা অবস্থান করছেন। তারা ওমরাহ ভিসায় যাচ্ছেন। মূলত ভিসার মেয়াদ তিন মাসের। বিএনপির নেতাকর্মীরা বলেছেন, পুলিশের হাত থেকে রক্ষা পেতে তারা কৌশলে দেশ ছাড়ছেন। আগামী সংসদ নির্বাচনের পর দেশের পরিস্থিতি বুঝে দেশে ফিরবেন। সৌদি আরব আসার পর পরিচিত লোকজনের বাসায় বসবাস করা হচ্ছে। আবার কেউ কেউ হোটেলে অবস্থান করছেন। আর তাদের দেখভাল করছেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পর কায়কোবাদ দেশ ছেড়ে চলে আসেন। গ্রেনেড হামলায় তিনি সাজাপ্রাপ্ত আসামি।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন চালানো হচ্ছে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। কারাবন্দি অবস্থায় নির্বাহী আদেশে মুক্তি পেয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তিনি। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রায় দেড় দশক যুক্তরাজ্যে আছেন। তিনিও একাধিক মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি। বিশেষ করে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার আসামি হিসেবে সাজা পেয়েছেন বেশি।

সারা দেশে জেলা ও মহানগরে বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি, আহ্বায়ক ও সাধারণ সম্পাদক এবং সদস্য সচিবের সংখ্যা ৬০০-এর বেশি। ২৮ অক্টোবর বিএনপি ঢাকায় মহাসমাবেশ কর্মসূচি পালন করে। কিন্তু সমাবেশের দিন হঠাৎ পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ জড়িয়ে পড়েন বিএনপির নেতাকর্মীরা। সংঘর্ষে পুলিশের এক কনস্টেবল মারা যান। এ নিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মামলা হয় বিএনপির শীর্ষপর্যায়ের নেতা থেকে শুরু করে ইউনিয়নের কর্মীদের বিরুদ্ধে। বেশিরভাগ মামলায় অভিযোগ আনা হয়েছে নাশকতার বিষয়টি। গত ২৯ অক্টোবর গ্রেপ্তার করা হয় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে। এরপর পর্যায়ক্রমে দলটির স্থায়ী কমিটির দুই সদস্য মির্জা আব্বাস ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন চৌধুরী ও শামসুজ্জামান দুদু, দুই যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ও খায়রুল কবির খোকন, সাংগঠনিক সম্পাদক এমরান সালেহ প্রিন্স, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু ও কেন্দ্রীয় নেতা জহির উদ্দিন স্বপনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে ফখরুল ইসলাম ছাড়া সবাইকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। তাছাড়া জেলা-উপজেলা নেতাদের মধ্যে অনেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন। আবার কেউ পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

বিএনপির দাবি, ২৪ হাজার ৯০৬ জনকে এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আর ৭২ মামলায় আদালত সাজা পেয়েছেন ১ হাজার ১১১ জন বিএনপি নেতাকর্মী। সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে কেউ কারাগারে আবার কেউ আত্মগোপনে আছেন। প্রায় প্রতিদিনই পুলিশ বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের বাসাবাড়িতে অভিযান চালাচ্ছে। পুলিশের হাত থেকে রক্ষা পেতে নেতাকর্মীরা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তাদের মধ্যে কেউ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছেন।

বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশের বাইরে আসতে বেশি সহজ হচ্ছে ওমরাহ ভিসায়। ওমরাহ গ্রুপের মাধ্যমে ওমরাহ ভিসায় সৌদি আরব যাচ্ছেন বেশি। একা গেলে সমস্যায় পড়তে হয়। মূলত ইমিগ্রেশনেই বেশি সমস্যা পড়ার আশঙ্কা থাকে। আর গ্রুপের মাধ্যমে গেলে ইমিগ্রেশনসহ অন্য কোথাও সমস্যা হচ্ছে না। সৌদি আরবের পাশাপাশি কিছু নেতাকর্মী মালয়েশিয়াও যাচ্ছেন। তবে সৌদি আরবের যাওয়ার সংখ্যাই বেশি। কিছুদিন আগে মক্কার কবুতর চত্বরে কথা হয় মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপির এক নেতার সঙ্গে। তিনি একটি ইউনিয়নের বিএনপির সভাপতি। নিজের নাম গোপন করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত ১০ বছরে আমার নামে দেড়শর বেশি মামলা হয়েছে। এ সময়ে নিজের বাসায় থাকতে পারিনি। বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তানের চেহারা পর্যন্ত ভালোভাবে দেখতে পারি না। মাঝে দুবার গ্রেপ্তার হয়েছি। জামিন নিয়ে বের হওয়ার পর রাজনীতি থেকে একটু দূরে ছিলাম। তারপরও পুলিশ আমাকে ধরতে প্রায়ই বাসায় অভিযান চালায়। ২৮ অক্টোবর সহিসংতার পর আমার নামে ১২টি মামলা দিয়েছে পুলিশ। সবকটি মামলাই হয়েছে নাশকতার অভিযোগে। তিনি আরও বলেন, এসব কারণে আর কুলিয়ে উঠতে পারছিলাম না। পরে বাধ্য হয়ে দেশত্যাগের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসি। ওমরাহ ভিসায় নভেম্বর মাসে সৌদি আরব চলে আসি। গ্রুপের মাধ্যমে ওমরায় আসায় ইমিগ্রেশন পুলিশ আমার বিষয়টি বুঝতে পারিনি।

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার জানামতে মক্কা, মদিনা ও রিয়াদের অন্তত শতাধিক নেতাকর্মী চলে এসেছেন। সাবেক এমপি কায়কোবাদ অর্থের বিষয়টি দেখভাল করছেন। তাছাড়া দেশ থেকে যারা আসছেন কেউ কেউ পুলিশকে বিশেষ উপহারও দিচ্ছেন। আমার সঙ্গেই সাতজন নেতাকর্মী আছেন। সবাই ওমরাহ ভিসায় এসেছেন।

প্রায় একই কথা বলেছেন কুমিল্লা মুরাদনগরের বিএনপি নেতা কামাল হোসেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চলতি মাসের ৭ তারিখে ওমরাহ ভিসায় মক্কায় চলে আসি। ওমরাহ কার্যক্রম শেষ করে মদিনায় আসা হয়। আগামী ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত মদিনায় থাকব। নির্বাচনের পর দেশে ফিরব।’ তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে একশর মতো মামলা হয়েছে। সর্বশেষ তিন মাসে ১৮টি মামলা হয়েছে। এসব কারণে একবার ব্রেনস্টোক হয়। গোপনে চিকিৎসা পর্যন্ত নিতে হয়েছে। প্রতিদিনই বাড়িতে পুলিশ আসত। সুস্থ হওয়ার পর সিদ্ধান্ত নিই সৌদি আরব চলে আসব। নেতার (কায়কোবাদ) সঙ্গে কথা বলি এ নিয়ে। তার নির্দেশে ওমরাহ ভিসা নিয়ে চলে আসি। আসার সময় বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন পুলিশ একটু ঝামেলা করায় ভয়ও পেয়েছিলাম। তবে কোনো সমস্যা হয়নি। আমার সঙ্গে মুরাদনগর থেকে পাঁচজন নেতা ও কর্মী এসেছেন সৌদি আরবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে কামাল হোসেন বলেন, ‘নেতা অর্থের বিষয়টি দেখছেন। তিনি বেশিরভাগ সময় সৌদি আরব থাকেন। বর্তমানে কিছুদিনের জন্য বাহরাইন গেছেন। পুলিশি ঝামেলা এড়াতে বিএনপির অনেকেই আত্মগোপনে আছেন। সৌদি আরবের পাশাপাশি মালয়েশিয়াও যাচ্ছেন কেউ কেউ। নির্বাচনের পর দেশে আসব। তবে পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে দেশে আসা বা সৌদি আরব থেকে যাওয়া।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত