চলতি বছরের ডিসেম্বর শেষ হতে চলল। পুরো বছরই সোনার বাজার ছিল অস্থির। অস্থিরতার মধ্যেই দেশের সোনার দাম গতকাল আবার বাড়ল। এ নিয়ে চলতি বছর সোনার দাম বাড়ল ১৯ বার। দেশের ইতিহাসে স্বাধীনতার সময় সোনার ভরি ছিল ১৫৪ টাকা, আর গতকাল সোনার দাম বাড়ানোর পর সোনার ভরি রেকর্ড দামে ওঠে ১ লাখ ১১ হাজার ৪১ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
সোনার দামের সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা মানে সোনার বাজারে সুদিন। যত বেশি মূল্যস্ফীতি, তত বেশি সোনার মূল্যবৃদ্ধি। ঐতিহাসিকভাবেও দেখা গেছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে সোনার দাম সবচেয়ে বেশি বাড়ে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময় অর্থাৎ ২০২০ সালের আগস্টের প্রথম সপ্তাহে বিশ্ববাজারে প্রতি আউন্স (৩১.১০৩৪৭৬৮ গ্রাম) সোনার দাম ২ হাজার ৭০ ডলার ছাড়িয়ে যায়।
গতকাল শনিবার ভালো মানের প্রতি ভরি সোনার দাম ১ হাজার ৭৫০ টাকা বাড়ানোর পর এখন ২২ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দাম দাঁড়াচ্ছে ১ লাখ ১১ হাজার ৪১ টাকা। দেশের বাজারে এটিই সোনার সর্বোচ্চ দাম। এতদিন যার দাম ছিল ১ লাখ ৯ হাজার ২৯২ টাকা।
শনিবার বাজুসের মূল্য নির্ধারণ ও মূল্য পর্যবেক্ষণ স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান মাসুদুর রহমানের সই করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বাজুস জানায়, স্থানীয় বাজারে তেজাবি সোনার দাম বেড়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সোনার নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। আজ রবিবার থেকে নতুন দাম কার্যকর করা হবে।
এছাড়া ২১ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দাম এখন ১ লাখ ৬ হাজার ২৫ টাকা। আর ১৮ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দাম এখন ৯০ হাজার ৮৬২ টাকা। তবে সোনার দাম বাড়লেও একই রয়েছে রুপার দাম। প্রতি ভরি রুপার দাম ২ হাজার ১০০ টাকা।
গত ১৮ ডিসেম্বর সোনার দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিল বাজুস। যা ১৯ ডিসেম্বর কার্যকর হয়। ওই দামেই শনিবার (২৩ ডিসেম্বর) পর্যন্ত সবচেয়ে ভালো মানের সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) সোনা ১ লাখ ৯ হাজার ২৯২ টাকা, ২১ ক্যারেট ১ লাখ ৪ হাজার ৩৩৪ টাকা, ১৮ ক্যারেটের ৮৯ হাজার ৪০৫ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির সোনার দাম ৭৪ হাজার ৫৩৩ টাকায় বেচাকেনা হয়েছে।
সোনার দামের সঙ্গে চাহিদা ও জোগানের সম্পর্ক আছে। সোনার চাহিদা মূলত দুভাবে তৈরি হয়। যেমন গহনার চাহিদা ও সোনায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি। গহনা হিসেবে সোনা বেশি ব্যবহার করা হয় চীন ও ভারতে। পশ্চিমা দেশগুলোয়ও গহনার ভালো চাহিদা আছে। চাহিদার মতো সরবরাহও নিশ্চিত হয় দুইভাবে খনি থেকে নতুন উত্তোলন এবং পুরনো সোনা বিক্রি। যদিও স্বর্ণখনি থেকে সোনা উত্তোলন একটি চলমান প্রক্রিয়া।
আন্তর্জাতিক গোল্ড কাউন্সিলের হিসাবে, গত ২০২২ সালে খনি থেকে ৩ হাজার ৬২৪ টন সোনা উত্তোলন হয়। আর পুরনো সোনা থেকে পাওয়া যায় ১ হাজার ১৪০ টন। অন্যদিকে গহনা তৈরিতে ব্যবহৃত হয় ২ হাজার ১৯৫ টন সোনা। এ ছাড়া বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ হয়েছে ১ হাজার ১১৩ টন। আর বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১ হাজার ৮২ টন সোনার বার ও মুদ্রায় বিনিয়োগ করেছে।
বাংলাদেশ যে বছর স্বাধীন হয়, তার আগের বছর সোনার ভরি ছিল ১৫৪ টাকা। তার মানে গত ৫২ বছরে দাম বেড়েছে ৭২০ গুণ। দীর্ঘ এ সময়ে পুরনো সোনার অলংকারের দামও আনুপাতিক হারে বেড়েছে।
সাধারণত পুরনো অলংকার জুয়েলার্সে বিক্রি করতে গেলে তারা ওজন করার পর তা কোন ক্যারেটের সোনা, সে বিষয়ে নিশ্চিত হয়। তারপর অলংকারটির বর্তমান ওজন থেকে ২০ শতাংশ বাদ দিয়ে মূল্য নির্ধারণ করে।
ধরা যাক, কারও কাছে ২০০৫ সালে ১৩ হাজার ৮৩৩ টাকা ভরিতে কেনা ২২ ক্যারেটের এক ভরির সোনার অলংকার রয়েছে। সেটি বিক্রি করতে গেলে তিনি বর্তমানে ৮৬ হাজার ৫০০ টাকা পাবেন। তাতে মুনাফা দাঁড়ায় ৭২ হাজার ৬৬৭ টাকা। ২১ ও ১৮ ক্যারেটের অলংকার হলে মুনাফা কিছুটা ভিন্ন হবে।
