দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে প্রচার-প্রচারণা ঘিরে ততই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকা। গত ১৮ ডিসেম্বর প্রতীক বরাদ্দ শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার-প্রচারণা শুরুর পর থেকেই বাধা, হামলা, কুপিয়ে জখম, গুলি ছোড়া, হুমকি, পোস্টার ছিনিয়ে নেওয়া, কর্মীদের মারধর, নির্বাচনী ক্যাম্প ভাঙচুরসহ বিভিন্ন ঘটনা ঘটছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব ঘটনার জন্য নৌকার প্রার্থীর সমর্থকদের দায়ী করেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। আবার কিছু জায়গায় দুপক্ষই সংঘর্ষে জড়িয়েছে। যারই ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সময়ে ৯টি সংসদীয় আসনে সংঘাতের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে মাদারীপুর-৩ আসনের (কালকিনি, ডাসার ও সদরের একাংশ) কালকিনিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থক ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতাকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে নৌকার প্রার্থীর সমর্থকদের বিরুদ্ধে। আর বাকি আটটি আসনে বাধা, হামলা, ভাঙচুর ও গুলির ঘটনায় আহত হয়েছে অন্তত ৩৫ জন।
মাদারীপুরে নিহত আওয়ামী লীগ নেতার নাম এসকেন্দার খাঁ (৭০)। পুলিশ বলছে, গ্রাম্য দলাদলি ও রাজনৈতিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের হামলার শিকার হন তিনি। গতকাল বেলা ১২টার দিকে বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান এসকেন্দার খাঁ। তিনি লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সদস্য এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মোসা. তাহমিনা বেগমের সমর্থক ও কর্মী। এসকেন্দার খাঁ কালকিনির ভাটাবালী গ্রামের আমির হোসেন খাঁর ছেলে।
এলাকাবাসী ও পরিবারের সদস্যরা জানান, গতকাল সকালে বাড়ির সামনের রাস্তায় হাঁটতে বের হন এসকেন্দার খাঁ। এ সময় নৌকা প্রার্থীর সমর্থক ও লক্ষ্মীপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ফজলুল হক বেপারীর লোকজন হঠাৎ হামলা চালায়। তারা এসকেন্দারকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে আহত করে। তার পায়ের রগও কেটে ফেলা হয়। বাধা দিতে এলে আরেকজনকে কুপিয়ে আহত করা হয়। পরে দুজনকে উদ্ধার করে প্রথমে কালকিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে দুজনকেই বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
স্বতন্ত্র প্রার্থী মোসা. তাহমিনা বেগম বলেন, ‘আমার এক কর্মীকে নৌকার পক্ষের লোকজন কুপিয়ে হত্যা করেছে। সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াতে এগুলো করা হচ্ছে।’
সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলা শ্রমিক লীগের সদস্য মোতালেব হোসেন সরকারের বাড়িতে বোমা বিস্ফোরণে আহত ফজলুল হক ফজলু (৪৫) মারা গেছেন। গতকাল ভোরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। ফজলু কুষ্টিয়ার মিনপাড়া গ্রামের তোফাজ্জল হোসেনের ছেলে। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় অস্ত্র মামলাসহ মোট ৬টি মামলা রয়েছে। একই বিস্ফোরণে আহত জিন্নাহ আলী চৌহালী উপজেলার সদিয়া চাঁদপুর গ্রামের তাছের আলীর ছেলে। তাকে কোথায় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে তা জানা যায়নি। গত ১৯ ডিসেম্বর দুপুরে বেলকুচি উপজেলার পৌর সদরের সুবর্ণসাড়া গ্রামে মোতালেব হোসেন সরকারের বাড়িতে বিস্ফোরণের ওই ঘটনা ঘটে। এলাকাবাসী জানান, মঙ্গলবার দুপুরে বিকট শব্দ শোনার পর মোতালেবের বাড়ির সামনে লোকজন ভিড় করেন। কিন্তু কোনো লোকজনকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। পরে কালো রঙের মাইক্রোবাসে করে দুজন আহতকে নিয়ে যাওয়া হয়। বোমা তৈরি করতে গিয়ে ওই বিস্ফোরণ ঘটে বলে ধারণা এলাকাবাসীর।
এ বিষয়ে বেলকুচি পৌরসভার মেয়র সাজ্জাদুল হক রেজা বলেন, ‘বোমা বিস্ফোরণের ঘটনাটি ঘটেছে মোতালেবের বাড়িতে। মোতালের নৌকার প্রার্থী আব্দু মমিন মণ্ডল এমপির সমর্থক। নির্বাচনে নাশকতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে মোতালেবের বাড়িতে বোমা তৈরি করা হচ্ছিল।’
নিহত ফজলুর ভাই মজনু বলেন, ‘গত ২০ ডিসেম্বর জানতে পারি আমার ছোট ভাই ফজলু বোমা হামলায় আহত হয়েছে। খবর পেয়ে আমরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাই। সেখানে গিয়ে জানতে পারি বেলকুচির মোতালেবের বাড়িতে বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণে ফজলু আহত।’
ঢাকার শাহবাগ থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ‘মারা যাওয়া ব্যক্তির শরীরে আঘাতের যে চিহ্ন রয়েছে তাতে বোঝা যাচ্ছে বোমা বিস্ফোরণে তিনি আহত হয়েছিলেন।’
ফরিদপুর-৩ (সদর) আসনে ভোট চাওয়াকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ প্রার্থী শামীম হক ও স্বতন্ত্র প্রার্থী এ কে আজাদের সমর্থকদের মধ্যে মারপিটের ঘটনা ঘটেছে। এতে স্বতন্ত্র প্রার্থীর ৫ সমর্থক আহত হয়েছে। তাদের ফরিদপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গত শুক্রবার রাত ৮টার দিকে সদর উপজেলার ঈশান গোপালপুর ইউনিয়নের চৌধুরী বাড়ি মসজিদের সামনে এ ঘটনা ঘটে।
নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনে একতারা মার্কা লিবারেল ইসলামিক জোটের প্রার্থী সেলিম আহমেদ ও তার নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছে সন্ত্রাসীরা। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় ফতুল্লার কাঠেরপুল এলাকায় সেলিম আহমেদ তার দলীয় নেতাকর্মী নিয়ে লিফলেট বিতরণের সময় হামলার এ ঘটনা ঘটে। এতে সেলিম আহমেদসহ অন্তত ৬ নেতাকর্মী আহত হন।
মুন্সীগঞ্জ জেলা সদরের মোল্লাকান্দিতে মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া মো. ফয়সাল বিপ্লবের এক সমর্থকের বাড়িতে গুলিবর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। আনন্দপুর গ্রামে শুক্রবার রাতে হেবা মোল্লার বাড়িতে গুলি ছোড়ার এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আওয়ামী লীগ প্রার্থী অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাসের সমর্থক শওকত দেওয়ান ও বাবু কাজীকে দায়ী করা হচ্ছে।
অন্যদিকে মুন্সীগঞ্জ সদরে আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে সমর্থন করায় সদর উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আফজাল হাওলাদারের বিরুদ্ধে চাচাতো ভাই ওমর ফারুক হাওলাদারকে (৫২) পেটানোর অভিযোগ উঠেছে। গতকাল সকালে সদর উপজেলার গুহেরকান্দি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। আফজাল হাওলাদার স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. ফয়সাল বিপ্লবের সমর্থক।
নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাড. আবুল কালাম আজাদ সমর্থকদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সমর্থকদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় স্বতন্ত্র প্রার্থীর দুই সমর্থক আহত হয়েছেন। গতকাল দুপুর আড়াইটার দিকে উপজেলার মাঝগ্রাম এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
পটুয়াখালীর বাউফলে ইউনিয়ন যুবলীগের সাবেক সভাপতি মো রেজাউল খাঁনের (৫২) ওপর হামলা হয়েছে। শুক্রবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলার বগা ইউনিয়নের রাজনগর গ্রামে তার নিজ বাড়ির সামনে এ ঘটনা ঘটে। জানা গেছে, নৌকার প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা শেষে রেজাউল বাড়ি ফিরছিলেন। নিজ বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছলে ইউপি চেয়ারম্যান ও জেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হাসান হাওলাদারের নেতৃত্বে ১৫-২০ জনের একটি দল রেজাউলের ওপর হামলা করে।
গাজীপুর-৩ আসনের (শ্রীপুর ও গাজীপুর সদরের আংশিক) গত শুক্রবার বিকেল ও রাতে স্বতন্ত্র প্রার্থীর অন্তত পাঁচটি পথসভায় হামলা ভাঙচুর চালিয়েছে নৌকার কর্মী-সমর্থকরা। এ সময় চেয়ার-টেবিল ভাঙচুর এবং পোস্টার ছিঁড়ে কর্মীদের ধাওয়া করা হয়। এ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য মুহাম্মদ ইকবাল হোসেন সবুজ স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপিকা রুমানা আলী টুসি নৌকা প্রতীকে লড়াই করছেন। মাওনা ইউনিয়নের শিমলাপড়া, আক্তাপাড়া বাজার, কারওয়ান বাজার, আনন্দ বাজার, শিমলা পাড়া ও শিরিশগুড়ি এলাকায় হামলার ওইসব ঘটনা ঘটে। এতে স্বতন্ত্র প্রার্থীর অন্তত ১৫ নেতাকর্মী আহত হন।
চট্টগ্রামের চন্দনাইশের সাতবাড়ীয়া ইউনিয়নের আশরাফ মহুরী হাটে উদ্বোধনের কয়েক ঘণ্টা পর গত শুক্রবার গভীর রাতে ভাঙচুর করা হয়েছে নৌকার নির্বাচনী অফিস। এ সময় অফিসের পাহারাদার আবদুল হাকিমকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। তিনি দোহাজারী হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।
নওগাঁ-৪ (মান্দা) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম ব্রহানী সুলতান মামুদের কর্মীর ওপর হামলা ও প্রার্থীর ব্যাবসায়িক কার্যালয়ে ভাঙচুরের অভিযোগ করা হয়েছে নৌকার প্রার্থী নাহিদ মোর্শেদের অনুসারীদের বিরুদ্ধে। হামলায় স্বতন্ত্র প্রার্থীর ৩ কর্মী আহত হয়েছেন। গতকাল সকাল ১১টার দিকে উপজেলার মৈনম ইউনিয়নের মৈনম বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। আহতদের মধ্যে এ বি এম হাসান রিপুর পা ভেঙে গিয়েছে।
প্রতিবেদনটি সংশ্লিষ্ট জেলা-উপজেলার প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে তৈরি
