শতাব্দী প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রিয় শিক্ষক

আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০২৩, ০২:০৭ এএম

দারুল উলুম দেওবন্দের অনুসরণে সিলেট জেলার দক্ষিণ সুরমা উপজেলার মোগলাবাজার থানাধীন রেঙ্গায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, জামেয়া তাওয়াক্কুলিয়া রেঙ্গা। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৯ সালে শতবর্ষ পূরণ করেছে। এখান থেকে হাজারো আলেম, মুফতি, লেখক, হাফেজ ও কারি শিক্ষালাভ করেছেন। এই মাদ্রাসায় অর্ধশতাব্দীকালের বেশি সময় ধরে শিক্ষকতাসহ শিক্ষা সচিবের দায়িত্ব পালন করছেন মুফতি গোলাম মোস্তফা। আদর্শ এই শিক্ষককে নিয়ে লিখেছেন ইলিয়াস মশহুদ

সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পবিত্র কোরআন-হাদিসের আলো বিলিয়ে সত্যিকারের মানুষ গড়ার ক্ষেত্রে যেসব মনীষীর অবিস্মরণীয় ভূমিকা রয়েছে, আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে রয়েছে অনন্য ত্যাগ-তিতিক্ষা তাদের প্রতিচ্ছবি হলেন শায়খুল হাদিস মুফতি গোলাম মোস্তফা। শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত নিয়মানুবর্তী, জীবনের এই পড়ন্তবেলায়ও অসুস্থ শরীর নিয়ে হাদিসের দরসে বসেন চিরায়ত সেই নিয়ম মেনেই। ওয়াবিহি কালা হাদ্দাসানার সুরব্যঞ্জনায় নববি ভালোবাসায় হয়ে যান তেজোদ্দীপ্ত এবং আবেগী। উম্মাহর দরদে অঝোরে কাঁদেন। তাকে দেখলে মনের ভেতরে জাগ্রত হয় শ্রদ্ধা, ভক্তি ও অন্যরকম ভালোবাসা। অদ্ভুত সহজ-সরল মানুষ! চমৎকার নুরানি চেহারা।

মাওলানা মুফতি গোলাম মোস্তফা। শিক্ষা, শিক্ষা ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষার্থীদের জন্য যার জীবন উৎসর্গ। সহজ-সরল কথাবার্তা, সাধারণ চালচলন, উত্তম আচার-ব্যবহার, আমল-আখলাক, সততা ও নিষ্ঠায় নববি চরিত্রের উজ্জ্বল নমুনা। চেষ্টা-পরিশ্রম, মেহনত-মোজাহাদায় আকাবির-আসলাফের (পূর্ববর্তী বুজুর্গদের) বাস্তব প্রতিচ্ছবি। একজন আদর্শ শিক্ষক।

তিনি সিলেটের শীর্ষ ইসলামি বিদ্যাপীঠ জামেয়া তাওয়াক্কুলিয়া রেঙ্গার দাওরায়ে হাদিসের প্রথম ব্যাচের ছাত্র। খলিফায়ে মাদানি হজরত মাওলানা বদরুল আলম শায়খে রেঙ্গা (রহ.)-এর বিশেষ সান্নিধ্য তার জীবনে অনেক অবদান রেখেছে। নিরবচ্ছিন্ন সাধনা, সবর, নিবিড় অধ্যাবসায়, মহোত্তম আচার-ব্যবহার তাকে করে তুলেছে অনন্য। পাঠদানেও তার বিশেষত্ব রয়েছে, সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় ধীরস্থিরভাবে দরসে নেজামির জটিল ও কঠিন সব কিতাব তিনি পড়িয়েছেন। বিশেষত সহিহ বোখারি, সহিহ মুসলিম, মিশকাতুল মাসাবিহ ও ইসলামি ফিকহের স্তম্ভখ্যাত হেদায়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কিতাব দীর্ঘসময় ধরে পাঠদান করছেন। ইলমে ফারায়েজের (উত্তরাধিকার সম্পত্তি বণ্টন বিষয়ক মাসয়ালা) ওপর দরসে নেজামির একমাত্র কিতাব সিরাজির পাঠদানে তার বিশেষ খ্যাতি রয়েছে, এ বিষয়ে তিনি আলেম সমাজে ব্যাপকভাবে সমাদৃত।

তিনি শুধু একজন শিক্ষকই নন, বরং আদর্শ মানুষ গড়ার সফল কারিগরও। তাই তো তার হাতেগড়া হাজার হাজার ছাত্র আজ মসজিদ-মাদ্রাসাসহ জ্ঞানের বিভিন্ন ময়দানে সরব বিচরণ করছেন। বিশ্বময় ছড়িয়ে দিচ্ছেন দ্বীনের আলো। প্রাতিষ্ঠানিক কর্মজীবনে তিনি নানা দায়িত্ব পালন করেছেন, তবে কখনো তাকে ‘শাসকরূপে’ দেখা যায়নি; বরং দরদী এক মালী হিসেবেই নিজেকে তিনি উপস্থাপন করেছেন। শাস্তি, প্রহার, ধমক বা তিরস্কার নয়; আদর-সোহাগ আর উত্তম তরবিয়ত প্রদানই ছিল তার শাসনের সৌন্দর্য।  ফলে কর্মজীবনে তিনি লাভ করেছেন অনন্য সফলতা।

মহান এই শিক্ষাগুরু সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলার ৩ নম্বর ফুলবাড়ি ইউনিয়নের দক্ষিণ মদনগৌরী গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ১৩৫৩ বাংলার জ্যৈষ্ঠ মাসের কোনো এক শুক্রবার বিকেলে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মৌলভি আব্দুল আহাদ (রহ.) একজন পরহেজগার, ধর্মভীরু ও মান্যবর ব্যক্তি হিসেবে এলাকায় সমাদৃত ও সুপরিচিত ছিলেন। মা কুতুবুন্নেছাও ছিলেন মহীয়সী নারী। ৩ ভাই ও ১ বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়।

তার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় নিজ পরিবারে। পিতার কাছে কায়েদা, আমপারা ও কোরআন শরিফসহ দ্বীনের বুনিয়াদি বিষয়ে শিক্ষা অর্জন করেন। ৬ বছর বয়সে এলাহীগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির মাধ্যমে তার প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার সূচনা হয়। এখানে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে পড়াশোনা করে রাখালগঞ্জ দারুল   কোরআন আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। তখন এটি একটি প্রসিদ্ধ কওমি মাদ্রাসা ছিল। শায়খ মুফাজ্জল আলী সিকন্দরপুরী (রহ.) ছিলেন তখনকার মুহতামিম। সেখানে তিন বছর অধ্যয়ন করেন। এরপর ১৩৮০ হিজরিতে জামেয়া তাওয়াক্কুলিয়া রেঙ্গায় অষ্টম জামাতে ভর্তি হন। ১৩৮৮ হিজরিতে রেঙ্গা মাদ্রাসা থেকে তাকমিল ফিল হাদিস সম্পন্ন করে মাওলানা সনদ লাভ করেন। এখানে যেসব শিক্ষকের কাছে অধ্যয়ন করেন, তাদের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হলেন- খলিফায়ে মাদানি আল্লামা বদরুল আলম শায়খে রেঙ্গা (রহ.), আল্লামা সিকন্দর আলী বুরুন্ডা (রহ.), শায়খুল হাদিস আল্লামা কমরুদ্দীন (রহ.), মাওলানা কুতুবুদ্দীন জাহানপুরী (রহ.)। তার সহপাঠীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন জামেয়া তাওয়াক্কুলিয়া রেঙ্গার সাবেক মুহতামিম ও বর্তমান সরপরস্ত মাওলানা শামছুল ইসলাম খলীল।

দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করার পর তার উস্তাদ ও পীর হজরত শায়খে রেঙ্গা (রহ.)-এর নির্দেশে ১৩৮৮ হিজরির শাওয়ালে জামেয়া রেঙ্গায় শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। এক বছর শিক্ষকতার পর মনে হলো, ইলম অর্জনের পিপাসা তখনো মেটেনি, তাই শিক্ষকদের সঙ্গে পরামর্শ করে ১৩৮৯ হিজরিতে উচ্চশিক্ষা লাভের লক্ষ্যে পাকিস্তানের করাচি চলে যান। সেখানে উপমহাদেশের অন্যতম দ্বীনি প্রতিষ্ঠান জামেয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া আল্লামা বিন্নুরি টাউন করাচিতে পুনরায় দাওয়ায়ে হাদিসের জামাতে ভর্তি হন। এরপর তাখাসসুস ফিল ফিকহ ও ইফতা বিভাগে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে আরও চার বছর অধ্যয়ন করেন। করাচিতে তিনি আল্লামা ইউসুফ বিন্নুরি (রহ.), আল্লামা ইদরিস মিরাঠি (রহ.), মাওলানা ওলি হাসান টুংকি (রহ.), মাওলানা ফযল মুহাম্মদ (রহ.) প্রমুখ যুগশ্রেষ্ঠ উস্তাদের কাছ থেকে হাদিস, ফিকহ ও ইফতার সনদ অর্জন করেন।

করাচিতে পাঁচ বছর অধয়ন শেষে ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ১৩৯৩ হিজরিতে দেশে ফিরে পুনরায় জামেয়া তাওয়াক্কুলিয়া রেঙ্গায় শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত দীর্ঘ ৫৪ বছর ধরে নিরলসভাবে দ্বীনি খেদমত চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি দারসে নেজামির গুরুত্বপূর্ণ কিতাবাদি পাঠ দিয়ে যাচ্ছেন। তার শিক্ষাদান পদ্ধতি ও রীতি ছাত্র-উস্তাদ সর্বমহলে প্রশংসিত।

শিক্ষকতার পাশাপাশি বিভিন্ন সময় নানা দায়িত্ব পালন করেছেন। এক সময় তিনি জামেয়া রেঙ্গার গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপকেরও (নাজেমে কুতুবখানা) দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে নাজিমে দারুল একামা (হোস্টেল সুপার) এবং ক্রমান্বয়ে নাজিমে তালিমাতের (শিক্ষা সচিব) দায়িত্ব পালন করেন। ১৩৯৯ হিজরি মোতাবেক ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে অদ্যাবধি ৪৬ বছর ধরে শিক্ষা সচিবের দায়িত্ব অত্যন্ত সুন্দরভাবে পালন করে যাচ্ছেন। মাদ্রাসায় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চলে আয়োজিত ওয়াজ মাহফিলেও তিনি ওয়াজ-নসিহত করেন। দক্ষিণ সুরমা উপজেলার মোগলাবাজার কোনারচর জামে মসজিদে দীর্ঘদিন ধরে খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

জামেয়া রেঙ্গায় শিক্ষকতার পাশাপশি দৈনন্দিন জীবনে দেখা দেওয়া নানাবিধ সমস্যার সমাধানে মাসয়ালা ও ফতোয়া প্রদানের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে ইসলামের বাণী ও বিধান পৌঁছে দেওয়ার কাজ করেন। প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে মুসলিম জনসাধারণ ছুটে আসেন তার কাছে। শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি তাদের আবেদনকৃত বিষয়ের শরয়ি সমাধান অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে দিয়ে থাকেন।

এই বয়সেও সর্বদা কিতাব অধ্যয়ন আর গবেষণার কাজে মশগুল থাকেন। সহজ-সরল জীবনযাপনে অভ্যস্ত, দুনিয়ার যশখ্যাতি বিমুখ ও অমায়িক ব্যবহারের অধিকারী এই মহান শিক্ষাগুরু বৃহত্তর সিলেটে ‘ইলাইগঞ্জী হুজুর’ বা ‘নাজিম সাহেব’ নামে সবার কাছে পরিচিত।

মাওলানা মুফতি গোলাম মোস্তফা ইলাইগঞ্জী (নাজিম সাহেব) হুজুরের নুরানি চেহারার দিকে তাকালে বিনয় ও শ্রদ্ধা এমনিতেই চলে আসে। মনে হয় যেন নুর ঝরে পড়ছে তার চেহারা থেকে। সিলেটের শীর্ষ একটি দ্বীনি প্রতিষ্ঠানে শায়খে সানি ও দীর্ঘদিনের শিক্ষা সচিব হওয়া সত্ত্বেও নিজ প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক মাহফিলে মনোযোগী শ্রোতার মতো মাঠে বসে ওয়াজ-নসিহত শুনেন। অথচ তিনি স্টেজে সভাপতির আসনে বসার যোগ্য। তার কথা শুনার জন্য যেখানে মুখিয়ে থাকেন হাজারো আলেম, মুহাদ্দিস ও সাধারণ জনতা। সেখানে তিনি একজন আদর্শ শ্রোতা।

ইলম-আমল ও তাকওয়ার অনন্য নজির ইলাইগঞ্জী হুজুর এই বৃদ্ধ বয়সেও বিভিন্ন সময় দেশ ও ইসলামবিরোধী নানাবিধ কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে আহূত সভা-সমাবেশে গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থিত হন। তাছাড়া বিভিন্ন বাতিল মতবাদ, যেমন- কাদিয়ানি ও আহলে হাদিসের ভ্রান্তির বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার। অথচ তাকে কখনো মাইকের সামনে যেতে দেখা যায়নি বা চেষ্টাও করেননি তিনি; বরং সবার অগোচরে থেকে মাঠে সাধারণ দর্শকসারিতে বসে থাকেন। জোর করেও কেউ তাকে স্টেজে নিতে পারে না।

মাওলানা মুফতি গোলাম মোস্তফা ৫ ছেলে ও ২ মেয়ের জনক। দুই ছেলে বাল্যকালেই মৃত্যুবরণ করেছেন। বড় ছেলে হাফেজ মাওলানা আহমদ শরীফ নোমান জামেয়ার রেঙ্গার সাবেক উস্তাদ, বর্তমানে যুক্তরাজ্য প্রবাসী। অন্য ছেলেরা হলেন- হাফেজ মাওলানা রফি আহমদ, কফিল আহমদ, হাফেজ মাওলানা যকী আহমদ, হাফেজ রুম্মান আহমদ। তারা সবাই দ্বীনের খেদমতে নিয়োজিত।

সত্তরোর্ধ্ব এই মনীষী আজ বয়সের ভারে ন্যুব্জ। বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। মহান আল্লাহ তাকে সুস্থতার সঙ্গে নেক হায়াত দান করুন। আমিন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত