নতুন বছর যেভাবে কাটাবেন

আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর ২০২৩, ১১:৩৬ এএম

নতুন বছরকে ঘিরে সবার মধ্যেই কম-বেশি পরিকল্পনা কাজ করে। বিগত বছরের ভুলগুলো শুধরে নিয়ে নতুনভাবে নতুন উদ্যমে কাজ করার প্রেরণা কাজ করে আর সেই প্রেরণা থেকেই সাজানো হয় বছরব্যাপী কাজের পরিকল্পনা। যাকে বলা হয় ‘নিউ ইয়ার রেজুলেশন’। একজন মুসলিমের নিউ ইয়ার রেজুলেশন কেমন হওয়া উচিত?

বিগত বছরের ভুলগুলো চিহ্নিত করা ও শোধরানো : বিগত বছরে হওয়া ভুলভ্রান্তিগুলো চিহ্নিত করা এবং তা সংশোধন একান্ত জরুরি। কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকলে, ঠকালে তার কাছে ক্ষমা চাওয়া, ঝগড়া মিটিয়ে ফেলা, ক্রোধ-হিংসা পরিহার করা ও ঋণ পরিশোধ করা।

হাদিসে আছে, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) একবার সাহাবিদের বললেন, তোমরা কি জানো, নিঃস্ব কে? তারা বললেন, আমরা তো নিঃস্ব বলতে তাকেই বুঝি, যার কোনো ধন-সম্পদ নেই। তখন হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন না, নিঃস্ব সে নয়, প্রকৃতপক্ষে নিঃস্ব হচ্ছে সে, যে কেয়ামতের দিন অনেক নামাজ-রোজা-জাকাতের নেকি নিয়ে আসবে, কিন্তু দুনিয়াতে সে একে গালি দিয়েছে, তাকে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে, এর মাল জোর করে দখল করেছে, ওর রক্ত প্রবাহিত করেছে তাই সব মজলুম সেসব জুলুমের বদলা নিতে আসবে। আল্লাহ তখন জুলুমের বদলা হিসেবে তার নেকিগুলো মজলুমদের দিয়ে দেবেন। একপর্যায়ে তার সব নেকি শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু জুলুমের বদলা নেওয়া তখনো শেষ হবে না। তখন মজলুমের গোনাহগুলো চাপিয়ে দিয়ে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। -সহিহ মুসলিম : ২৫৮১

ইসলাম সম্পর্কে পড়াশোনা করা : হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ইলম অর্জন করা ফরজ। তাবেঈ উমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.) বলেন, যে ব্যক্তি ইলম ছাড়া আমল করবে সে সঠিকভাবে যতটুকু করবে না করবে, বরবাদ করবে তার চেয়ে বেশি। -তারিখে তাবারি : ৬/৫৭২

অর্থাৎ ইসলামের বিষয়ে মৌলিক জ্ঞান অর্জন করা প্রতিটি মুসলিমের জন্য অবশ্য কর্তব্য। তাকে জানতে হবে, ইমান-আকিদা, আমল-আখলাক, হালাল-হারাম ইত্যাদি বিষয়ে। তাছাড়া ব্যক্তিভেদে ইসলামের ইতিহাস, ইসলামি অর্থব্যবস্থা, ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা, ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থা প্রভৃতি বিষয়েও জ্ঞানার্জন করা অতীব জরুরি। এ ছাড়া মাসে তিন দিনের জন্য তাবলিগে বের হয়েও ইসলাম সম্পর্কে ব্যবহারিকভাবে জ্ঞানার্জন করা যায়।

আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের খোঁজখবর নেওয়া : সুযোগের অভাবে অনেক সময় আত্মীয়-স্বজনদের খোঁজখবর নেওয়া সম্ভব হয় না। এতে সম্পর্ক শিথিল হয়ে যায়, অথচ হাদিসে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার জন্য বিশেষভাবে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। নবী কারিম (সা.) বলেন, ‘তিন ব্যক্তি জান্নাতে যাবে না। অভ্যস্ত মদ্যপায়ী, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী ও জাদুতে বিশ্বাসী।’ -আহমদ : ১৯৫৮৭

অর্থাৎ আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা ও তাদের খোঁজখবর নেওয়া খুবই জরুরি। এ যুগে খোঁজখবর নেওয়া আরও সহজ হয়ে গেছে। চাইলেই এখন আমরা মোবাইলে, হোয়াটসঅ্যাপে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর মাধ্যমে খোঁজখবর নিতে পারি।

কোরআন মাজিদ শুদ্ধভাবে শেখা, কিছু অংশ মুখস্থ করা ও বুঝা : প্রতিটি মুসলিমেরই কোরআন মাজিদ শুদ্ধভাবে শেখা উচিত। কেননা, কোরআন তেলাওয়াত শুদ্ধ না হলে নামাজ শুদ্ধ হবে না, আর নামাজ শুদ্ধ না হলে সে আখেরাতে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয় কেয়ামতের দিন বান্দার (হক্বুল্লাহর মধ্যে) যে কাজের হিসাব সর্বপ্রথম নেওয়া হবে, তা হচ্ছে- তার নামাজ। সুতরাং যদি তা সঠিক হয়, তাহলে সে পরিত্রাণ পাবে। আর যদি (নামাজ) খারাপ হয়, তাহলে সে ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। -সুনানে আবু দাউদ : ৮৬৪

সমাজসেবামূলক কাজে অংশ নেওয়া : একজন ভালো মুসলিম মাত্রই একজন ভালো মানুষ। সে সর্বদা কল্যাণমূলক কাজে নিজেকে জড়িয়ে রাখে। অপরের মঙ্গলে, মানবতার স্বার্থে সে অবদান রাখে। এক্ষেত্রে একজন মুসলিম যেকোনো কল্যাণমূলক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত হয়ে কাজ করতে পারে। যেমন- অসহায়দের খাবার দান, বস্ত্রহীনদের বস্ত্রদান, শীতবস্ত্র বিতরণ, বন্যার্তদের ত্রাণ দেওয়া, রক্তদান, পথশিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা, বেশি বেশি গাছ লাগানো, রাস্তা-পুল-সাঁকো মেরামতে সহায়তা করা, এতিম-অভাবগ্রস্ত-মজলুমদের সহায়তা করা ইত্যাদি কাজে স্বতঃস্ফূর্ত ও সাধ্যমতো অংশগ্রহণ করা।

কোরআন-হাদিসে মানবসেবায় ব্যাপকভাবে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ বান্দাকে ততক্ষণ সাহায্য করেন, যতক্ষণ বান্দা তার ভাইকে সাহায্য করতে থাকে।’ -সহিহ মুসলিম

নিজের দক্ষতা বাড়ানো : বর্তমান বিশ্ব অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক। তাই নিজেকে দক্ষ ও যোগ্য করে তোলার বিকল্প নেই। মুমিন হিসেবে এক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা চলবে না। সময়োপযোগী বিষয়গুলো যেমন- নতুন কোনো ভাষা শেখা ও তাতে দক্ষ হওয়া, বর্তমান চাহিদা অনুসারে আইটি স্কিল, কমিউনিকেশন স্কিল, কম্পিউটার স্কিল, ওয়েব ডিজাইনিং, ভিডিও এডিটিং ইত্যাদি বিষয়ে নিজেকে দক্ষ ও যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে আগ্রহ অনুসারে টার্গেট সেট করে অধ্যবসায়ের সঙ্গে কাজ শেখা ও চালিয়ে যেতে হবে।

ক্যারিয়ারের প্রতি মনোযোগী হওয়া : অনেককে মুসলিমদের সম্পদশালী হতে নিরুৎসাহিত করতে দেখা যায়, তারা দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত বুঝাতে গিয়ে বাড়াবাড়ি করে ফেলেন। এটা ঠিক নয়। কেননা, সম্পদ হারাম না- তবে সম্পদের লালসা হারাম। হজরত উসমান (রা), হজরত আবদুর রহমান বিন আউফ (রা.)-সহ অনেক সাহাবি সম্পদশালী ছিলেন। তবে তারা সম্পদপ্রেমী ছিলেন না, দুনিয়া অর্জন করলেও দুনিয়াবিমুখ ছিলেন। সুতরাং ক্যারিয়ার গড়তে গিয়ে হারাম পথে উপার্জন করা চলবে না, আবার দ্বীনের মৌলিক হুকুম (নামাজ, রোজা, জাকাত, আল্লাহর রাস্তায় অংশগ্রহণ ও ব্যয়) বাদও দেওয়া যাবে না। একজন মুসলিম সম্পদ উপার্জন ও ইসলাম পালনে যথাযথ ভারসাম্য পালন করবে।

ইসলামের প্রচার-প্রসারে কাজ করা : মুসলিম হিসেবে ইসলামের প্রচার-প্রসারে কাজ করা আমাদের দায়িত্ব। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘ওই ব্যক্তির কথার চেয়ে কার কথা উত্তম হতে পারে, যে আল্লাহর পথে দাওয়াত দেয়, সৎকর্ম করে এবং বলে যে, নিশ্চয়ই আমি মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত। সৎকর্ম ও অসৎকর্ম সমান নয়। প্রত্যুত্তর নম্রভাবে দাও, দেখবে তোমার শত্রুও অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে পরিণত হয়েছে।’ -সুরা হামিম সিজদা : ৩৩-৩৪

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত