রাজধানীর বনশ্রীতে একটি বাসার সামনে থেকে গৃহকর্মীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনার পর বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী বাড়িটিতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও আগুন ধরিয়ে দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন রামপুরা থানার ওসি মশিউর রহমানসহ পাঁচ পুলিশ সদস্য। গতকাল রবিবার সকালে বনশ্রীর ডি-ব্লকে এ ঘটনা ঘটে।
এলাকাবাসী ও পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সকাল সাড়ে ৭টার দিকে বনশ্রীর ডি-ব্লকের ৪ নম্বর রোডের ৩২ নম্বর বাড়ির সামনে আসমা বেগম (৪২) নামে এক নারীর মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। এরপর মানুষ জড়ো হয়। খবর পেয়ে পুলিশ এসে ওই নারীর মরদেহ উদ্ধারের কাজ শুরু করে। একপর্যায়ে আসমা বেগমকে বাড়ির ছাদ থেকে ফেলে হত্যা করা হয়েছে সন্দেহে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী বাড়ির নিচতলায় ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দেয়। আসমা বেগম ওই বাড়ির মালিক দেলোয়ার হোসেনের মেয়ের বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। পুলিশ বলছে, ষষ্ঠতলার ছাদ থেকে লাফিয়ে পরে আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন তিনি। তবে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। আসমার গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার কোকরাইল গ্রামে। বাবা মৃত মনু মিয়া।
রামপুরা থানার ওসি মশিউর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, পুলিশের লোকজন লাশ উদ্ধারে এলে বাধার সম্মুখীন হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়ে মারে। পরে তারা ওই বাড়ির নিচতলায় থাকা তিনটি গাড়িতে আগুন দেয়। তখন পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ শুরু হয়। এতে তিনিসহ চার-পাঁচজন পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয় ময়নাতদন্তের জন্য।
মর্গে রামপুরা থানার এসআই তওফিকা ইয়াসমিন গৃহকর্ত্রীর বরাত দিয়ে বলেন, ‘গৃহকর্ত্রী কানিজ ফাতেমা মিরপুর মধ্যমণিপুরের বাসায় বসবাস করেন এবং সেখানে আসমা কাজ করতেন। দুই মাস আগে রেশমা নামে এক নারী কানিজ ফাতেমার বাসায় আসমাকে কাজে দেন। বনশ্রীতে কানিজ ফাতেমার বাবা দেলোয়ার হোসেনের নিজের বাড়ি। দুদিন আগে গৃহকর্মী আসমাকে নিয়ে বাবার বাড়ি বেড়াতে আসেন কানিজ ফাতেমা।’
এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আসমা ভোরে উঠে কাপড় ধোয়া শুরু করেন। এতে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় কানিজ ফাতেমা আসমাকে বকাঝকা করেন। এর কিছুক্ষণ পর পথচারীরা বাসায় খবর দেন, ভবনের নিচে পড়ে আছেন আসমা। সঙ্গে সঙ্গে নিচে গিয়ে গৃহকর্মীকে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। তখন তারা থানায় খবর দেন।’
ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ছয়তলা ভবনের নিচে তিনটি গাড়ি ও একটি মোটরসাইকেল আগুন লেগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া ভবনের নিচতলারও কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সদস্যরা সড়কের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থান নিয়েছেন। ঘটনার পর পুলিশের ক্রাইমসিন ইউনিট বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে। পাশাপাশি থানা-পুলিশ ছাড়াও তদন্ত শুরু করে পুলিশের অন্য ইউনিটওগুলো।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উপকমিশনার (ডিসি-মতিঝিল) হায়াতুল ইসলাম খান জানান, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর নম্বর থেকে কল পেয়ে থানা ও ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যরা সকালে ঘটনাস্থলে যান। সেখানে বিশৃঙ্খলার ঘটনায় ওসিসহ কয়েকজন আহত হয়েছেন। ঘটনাটি আত্মহত্যা না হত্যা, তা নিশ্চিত না। দুই ধরনের অনুমান মাথায় রেখেই তদন্ত হচ্ছে।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ঢাকা মহানগর দক্ষিণের পুলিশ সুপার (এসপি) মিজানুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে ঘটনাস্থল ভিজিট করে মনে হয়েছে ওই বাড়ির বারান্দার রেলিং থেকে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। ছাদ থেকে পড়ে গেছে, নাকি তাকে কেউ ফেলে দিয়েছে সেটি তদন্ত সাপেক্ষে বলা যাবে। বাড়ির মালিক দাবি করেছেন, গৃহকর্মী আসমা মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন। তবে বিষয়টি কতটা সত্য সেটি আসমার পরিবারের সঙ্গে কথা হলে বোঝা যাবে।’
ডিএমপির সহকারী কমিশনার (খিলগাঁও জোন) আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, আসমার মৃত্যুর বিষয়ে তারা তদন্ত শুরু করেছেন। আলামত সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ ছাড়া ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহের কাজ চলছে। নিহতের ছেলে কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসছেন। তার সঙ্গে কথা বলে এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের দায়িত্বরত কর্মকর্তা লিমা খানম জানান, সকাল ১০টা ২৫ মিনিটে খবর পেয়ে তাদের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নেভায়। সেখানে তিনটি গাড়ি ও একটি মোটরসাইকেল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে তারা কোনো হতাহতের খবর পাননি।
