মানুষ যায়, মানুষ আসে কে তার খবর রাখে? সব মানুষের জীবন নিয়ে এক বাক্যে এমন মন্তব্য করা শুধু কঠিনই নয়, এটা মুশকিলও বটে। তাহলে মহান ব্যক্তিত্বের আলোচনায় আসবে না। যারা তাদের কর্ম ও জীবনাদর্শ দ্বারা সমাজ ও রাষ্ট্র আলোকিত করেছেন। মানুষ পেয়েছে সদুপদেশ ও পরামর্শ। এমনই এক ব্যক্তিত্ব হলেন দেশের প্রবীণ বুজুর্গ আলেম মাওলানা আবুল বাশার পীর সাহেব শাহতলী। গভীর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এবং নির্মল আলোকিত এই মানুষকে নিয়ে লিখেছেন মুহাম্মদ রুহুল আমীন নগরী
মাওলানা আবুল বাশার পীর সাহেব শাহতলী দেশের প্রবীণ বুজুর্গ আলেম। তিনি শাহতলীর পীর নামে সমধিক পরিচিত। বর্তমান সময়ে তার সমবয়সী আলেম নেই বললেই চলে। তিনি চরমোনাইয়ের মরহুম (প্রথম) পীর মাওলানা শাহ সৈয়দ ইসহাক (রহ.)-এর খলিফা। এ ছাড়া দেওবন্দি সিলসিলার প্রখ্যাত বুজুর্গ শায়খুল হাদিস মাওলানা যাকারিয়া (রহ.)-এর খলিফা মাওলানা আব্দুল হাফিজ মাক্কী (রহ.)-এর কাছ থেকেও খেলাফতপ্রাপ্ত হন। তার ইন্তেকালের পরে আমিরুল হিন্দ সাইয়্যিদ আরশাদ মাদানির সঙ্গে ইসলাহি সম্পর্ক কায়েম করেন। অপরদিকে পাকিস্তানের বিখ্যাত আলেম মাওলানা শেখ ইদ্রিস জিলানী (রহ.)-এর কাছ থেকে ইজাজত তথা খেলাফতপ্রাপ্ত হন।
পীরে তরিকত মাওলানা আবুল বাশার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় থেকে আধ্যাত্মিক ময়দানে কাজ করে যাচ্ছেন। এ যাবৎ তিনি অর্ধশত জনকে খেলাফত দিয়েছেন। দেশ-বিদেশে তার কয়েক লাখ মুরিদ রয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, গাজীপুর, সিলেট, জামালপুর, শেরপুর ও নেত্রকোনায় মসজিদ-মাদ্রাসা এবং খানকা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দ্বীনি কার্যক্রমের সঙ্গে অন্তত লক্ষাধিক মুরিদ ও ভক্ত রয়েছে।
ফরিদপুর জেলার নড়িয়া উপজেলার ভুমখাড়া গ্রামে তার পৈতৃক নিবাস। পরবর্তী সময়ে তিনি চাঁদপুর জেলার ঐতিহ্যবাহী শাহতলী গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। পিতা আব্দুল কাদের (রহ.), মাতা সৈয়দা হালিমা খাতুন। বর্তমানে তিনি (ঢাকার-১২১৫) তেজগাঁও শিল্প এলাকার ২২৮/সি পূর্ব নাখালপড়ায় নিজস্ব বাসায় ‘খানকায়ে শায়খ জাকারিয়া’তে বসবাস করেন। এ ছাড়া গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুরে খানকায়ে বাশারিয়া, খানকায়ে ইমদাদিয়া কাওলার (দক্ষিণখান, ঢাকা), চাঁদপুর, চট্টগ্রামেও তিনি মসজিদ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন।
প্রচারবিমুখ এই আধ্যাত্মিক সাধকের জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী ১৯৩৭ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি জন্ম। সার্টিফিকেট অনুযায়ী বর্তমানে তার বয়স প্রায় ৮০ হলেও প্রকৃতপক্ষে বয়স আরও বেশি। নিজের জীবন সম্পর্কে শাহতলীর হজরত বলেন, ‘শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার অন্তর্গত ভূমখাড়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। উজানীর হজরত (কারি ইবরাহিম রহ.) সফরে গেলে তার পিতা ও বড় চাচা কারি মো. হানিফকে উজানী মাদ্রাসায় ভর্তি করান। লেখাপড়া শেষে কচুয়া বাজারে ২ জনকে ২টি দোকান করে দিলে প্রতি শনি ও মঙ্গলবার কারি (ইবরাহিম) সাহেব (রহ.) বসতেন। কারি সাহেব (রহ.) আমাকে কোলে করে পাঁচ পুকুড়িয়া (উজানী) নিয়ে যেতেন। চরমোনাইর (হজরত ইসহাক রহ.) হুজুরের নির্দেশে তরিকার খেদমতের জন্য শাহতলীতে বাড়ি, মাদ্রাসা ও খানকা নির্মাণ করি। শরীয়তপুর জেলার খাটহুগলী গ্রাম আমার নানা বাড়ি।’
পীর সাহেব শাহতলীর নানার নাম সৈয়দ রজব আলী, দাদার নাম তমিজ উদ্দিন ঢালী। দুই ভাই এক বোনের মধ্যে তিনি বড়। তাতিবাজার মাদ্রাসার মুহাদ্দিস মাওলানা খন্দকার মুশতাক আহমদ শরীয়তপুরী, বাইতুস সালাম ঢাকার মুহাদ্দিস খন্দকার মনসুর আহম্মদ তার ভাগিনা। শাহতলী থেকে ৩ মাইল দূরে শ্রীপুর মজুমদার বাড়ি নিবাসী আব্দুস সামাদ মজুমদারের সর্ব কনিষ্ঠ কন্যা সৈয়দা মুহসিনা খাতুনের সঙ্গে তিনি পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। তিনি ৬ ছেলে ৫ মেয়ের জনক।
পীর সাহেব শাহতলী শৈশবেই পিতা-মাতাকে হারান। পরে চাচার মাধ্যমে তিনি শাহতলী আলিয়ায় ভর্তি হন। তখন ছোট্ট বালক আবুল বাশারে লজিং হয় শাহতলী আলিয়ার শিক্ষক কারি মাওলানা ইমাম উদ্দিনের ঘরে। তিনি নিঃসন্তান ছিলেন। পিতা-মাতাহীন শিশু আবুল বাশারকে লালন-পালন করে মানুষ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অবদান হলো কারি ইমাম উদ্দিন ও তদীয় স্ত্রী আছিয়া খাতুনের। তারা তাকে নিজ সন্তানের মতো লালন-পালন করেন। পরবর্তী সময়ে তাদের সমুদয় সম্পত্তি পালকপুত্র আবুল বাশার (পীর সাহেব শাহতলী)-এর নামে লিখে দিয়ে যান। এমনকি পীর সাহেবের ১১ সন্তানকেও লালন-পালন করেন আছিয়া খাতুন।
কচুয়া থানার উজানী মাদ্রাসায় শিক্ষাজীবনের হাতেখড়ি, পরে মনপুরা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে প্রাথমিক শিক্ষালাভের পর শাহতলী ও ঢাকা আলিয়া থেকে ফাজেল ও কামেল পাস করেন। শাহতলী আলিয়ার পরে চাঁদপুর চিশতিয়া কলেজে ১ বছর অধ্যয়ন করেন। এরপর ঢাকা আলিয়ায় ভর্তি হয়ে ফিকাহ শাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা শেষ করেন।
ঢাকা আলিয়ায় পড়াশোনা শেষে স্বীয় মুর্শিদ শাহ সৈয়দ ইসহাক (রহ.)-এর পরামর্শে ভারতের বিখ্যাত মাদ্রাসা দারুল উলুম দেওবন্দ গমন করেন। সেখানে আরেক বছর দাওরায়ে হাদিসে পড়াশোনা করেন। হজরতের ভাষ্যমতে, দেওবন্দে তিনি আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.)-এর কাছে হাদিস পড়েছেন। তখনকার মুহতামিম ছিলেন কারি তৈয়ব (রহ.)। পীর সাহেব শাহতলী ছাত্র হিসেবে অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। জীবনে কোনো পরীক্ষায় অকৃতকার্য হননি।
পীর সাহেব শাহতলী দীর্ঘ কর্মময় জীবনের অধিকারী। অনেক ঘটনার সাক্ষী। ১৯৮০ সালের মার্চ মাসে দারুল উলুম দেওবন্দের শতবার্ষিকী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। পীর সাহেব শাহতলী মাওলানা আব্দুল করিম, শায়খে কৌড়িয়ার লিখিত নিয়ে মাওলানা শামছুদ্দীন কাসেমি (রহ.)-এর সঙ্গে তখন ভারত সফর করেন। কর্মজীবনে তিনি চরমোনাইয়ের মরহুম পীর মাওলানা সৈয়দ ইসহাক (রহ.)-এর পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশিত মাসিক জেহাদে ইসলামের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পত্রিকাটি ৪-৫ বছর নিয়মিত প্রকাশিত হয়।
জীবনের লম্বা একটা সময় তিনি রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। উপমহাদেশের শীর্ষ উলামা-মাশায়েখদের নেতৃত্বে পরিচালিত সংগঠন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন। জমিয়তের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়ে সম্প্রতি দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘মাসিক মদীনা সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.) আমার অত্যন্ত প্রিয় বন্ধু ছিলেন। তিনি আমাকে খুব মহব্বত করতেন। তিনিই আমাকে জমিয়তের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করেন।’
১৯৮৮ সালের ২৮ মার্চ মিরপুরের আরজাবাদ মাদ্রাসায় অনুষ্ঠিত জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কাউন্সিলে মাওলানা আব্দুল করিম শায়খে কৌড়িয়া (রহ.) সভাপতি এবং মাওলানা শামছুদ্দীন কাসেমি (রহ.) মহাসচিব নির্বাচিত হন। ওই কমিটিতে সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন পীর সাহেব শাহতলী। এরপর আরও কয়েকবার তিনি একই দায়িত্ব পালন করেন। ২০০০ সালের কাউন্সিলে শাহতলীর পীর সাহেবকে জমিয়তের পৃষ্ঠপোষক বানানো হয়।
নব্বইয়ের দশকে তিনি দ্বীনি সফরে লন্ডনে যান। সেখানেও ইউরোপ জমিয়তের বিভিন্ন প্রোগ্রামে দাওয়াতি মেহমান হয়ে অংশগ্রহণ করেন। এসব প্রোগ্রামে ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়্যিদ আসআদ মাদানি (রহ.) ও শাগরিদে মাদানি মাওলানা নূর উদ্দীন গহরপুরী (রহ.) উপস্থিত ছিলেন। তাওবার রাজনীতি জনক মাওলানা মোহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর (রহ.)-এর সঙ্গে ১৯৮২ সালে ইরান-ইরাক সফর করেন এবং ইমাম খোমেনি ও সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ইরান-ইরাক যুদ্ধ বন্ধের চেষ্টা করেন। এই সফরে শায়খুল হাদিস মাওলানা আজিজুল হক (রহ.), মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিসবাহ (রহ.), মুফতি ফজলুল হক আমিনী (রহ.) প্রমুখ আলেম সফরসঙ্গী ছিলেন।
শাহতলীর পীর মাওলানা আবুল বাশার সাধারণ মানুষের মধ্যে দ্বীনের প্রচার করতে আজ থেকে প্রায় ৩০ বছর আগে শাহতলী আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে প্রথমে ইসলাহি মাহফিলের সূচনা করেন। ২/৩ বছর আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে মাহফিল হওয়ার পর থেকে বর্তমান স্থানে (হামান কুর্দি) প্রতি বছর ১৩, ১৪ ও ১৫ ফেব্রুয়ারিতে ওই মাহফিল হয়ে আসছে। একাধারে নিয়ম করে কোনো মাহফিলের এমন ধারাবাহিকতা বেশ বিরল। ২০১৭ সালে ইন্তেকালের আগে বাংলাদেশ সফর করেন হজরত আব্দুল হাফিজ মক্কী (রহ.)। তখন হেলিকপ্টারযোগে তাকে শাহতলীর মাহফিলে নেওয়া হয়। এর আগে ঢাকায় ৭ দিনব্যাপী মাহফিল করতেন তিনি। তিনি বেশি কিছু দ্বীনি ও সামাজিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করেছেন। তন্মধ্যে নিবন্ধিত সংগঠন ইছলাহুল মুসলিমীন বাংলাদেশ অন্যতম। তিনি এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
দীর্ঘ জীবনের নানা বাঁকে, বহু চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে একজন ঋদ্ধ মানুষে পরিণত হয়েছেন তিনি। তার মতো একজন আলোকিত মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আল্লাহতায়ালা এই মহান ব্যক্তিত্বের হায়াতে বরকত দান করুন। সুস্থতার সঙ্গে তাকে দ্বীনি খেদমত বেশি বেশি করার তওফিক দান করুন। আমিন।
