নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে দোষী সাব্যস্ত করা বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির অবরুদ্ধ দশার প্রতীক বলে মন্তব্য করেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক এই মানবাধিকার সংগঠনটির ভাষায়, বাংলাদেশে কর্তৃপক্ষ স্বাধীনতাকে খর্ব করেছে। সমালোচকদের দমন করেছে।
তবে সমালোচনার প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, রায় দিয়েছে আদালত, আওয়ামী লীগ নয়। এজন্য সরকার কেন সমালোচনার মুখে পড়বে?
অন্যদিকে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছেন, বাংলাদেশের আইন নিয়ে বিদেশিদের ধারণা না থাকায় তারা সমালোচনা করছেন।
গত সোমবার অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক কার্যালয়ের এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের করা মামলায় গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ ইউনূসসহ চারজনকে সোমবার ছয় মাস করে কারাদণ্ড দিয়েছে ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালত। একই সঙ্গে প্রত্যেককে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
অ্যামনেস্টি বলেছে, ইউনূসের বিরুদ্ধে যে অস্বাভাবিক গতিতে বিচারকাজ সম্পন্ন হয়েছে, তা বাংলাদেশের অন্যান্য শ্রম অধিকার-সম্পর্কিত আদালতের মামলায় শম্বুকগতির সম্পূর্ণ বিপরীত।
সংগঠনটি আরও বলেছে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে শ্রম আইন ও বিচারব্যবস্থার অপব্যবহার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন।
অ্যামনেস্টি মনে করে, দেওয়ানি ও প্রশাসনিক ক্ষেত্র-সংশ্লিষ্ট বিষয়ের জন্য মুহাম্মদ ইউনূসসহ তার সহকর্মীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার কার্যক্রম শুরু করা শ্রম আইন ও বিচারব্যবস্থার একটি স্পষ্ট অপব্যবহার। এটি ইউনূসের কাজ ও ভিন্নমতের জন্য তার প্রতি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার একটি ধরন।
ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য : গতকাল মঙ্গলবার আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আদালতের রায়েই ইউনূস দ-িত হয়েছেন। এখানে আওয়ামী লীগের কোনো দায় নেই। যে শ্রমিকদের পাওনা থেকে বঞ্চিত করেছেন তারাই মামলা করেছেন। এখানে আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা কেন?
ধানম-িতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে সমসাময়িক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য : ড. ইউনূসের সাজা নিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যক্তি ও সংস্থার সমালোচনা প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বলেছেন, ‘বিদেশিরা তো আমাদের দেশের আইনিব্যবস্থা সম্বন্ধে কোনো কিছুই জানেন না। আমাদের আইনগত পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া সম্বন্ধে তাদের তো ওইভাবে পরিষ্কার ধারণা নেই। যার কারণে আমাদের এখান থেকে যেটা বলা হয়, তারা সেটাই অনুসরণ করে বক্তব্য রাখেন। সেই ক্ষেত্রে আমি মনে করি, আমাদের যারা (সরকারবিরোধী পক্ষ ও রাজনৈতিক দল) এখানে ছিলেন তারা হয়তো তাদের সেভাবেই বলেছেন। তারাই হয়তো এটাকে রঙচঙ দিয়ে সঠিক তথ্য প্রদান না করে বিভিন্ন দেশের কাছে পাঠাচ্ছেন।’
গতকাল সুপ্রিম কোর্টে তার নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপাকালে এ কথা বলেন তিনি। এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘ওনার (ড. ইউনূস) ক্ষেত্রে নোটিস দেওয়া হয়েছে। প্রতিপালন না করায় শ্রম আদালতে মামলা হয়েছে। সেই মামলাটা তিনি সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু সর্বোচ্চ আদালত বলেছেন, মামলা চলবে। পরে সাক্ষ্য-প্রমাণ নিয়ে এটা শেষ হয়েছে।’
বিনাদোষে কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে ড. ইউনূসের এমন বক্তব্যে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমি কখনো দেখি নাই কোনো মামলায় যার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় তিনি বলেন যে, তিনি অভিযুক্ত। উনি যদি স্বীকার করতেন তাহলে তো বিচারই হতো না। তখন ওনাকে আদালত শাস্তি দিতে পারত। ওনাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল দোষী না নির্দোষ। যেকোনো মামলাতেই কেউ যদি বলে নির্দোষ, তখনই কিন্তু বিচার হয়। উনি যদি বলতেন যে দোষী তাহলে তো ব্যতিক্রম হতো।’
