দাবিতে অনড় থাকবে বিএনপি

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২৪, ০৭:০১ এএম

বিএনপিসহ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে। এমন পরিস্থিতিতে আজ রবিবার দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এ অবস্থায় সরকারের পদত্যাগ ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামে অনড় থাকার কথা জানিয়েছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। দলগুলোর নেতারা বলছেন, ‘নির্বাচন বর্জন ও অসহযোগ আন্দোলনের পক্ষে আমাদের কর্মসূচি চলছে। ভোটের দিনও আমরা আমাদের কর্মসূচি পালন করব। এদিকে ভোট বর্জনের আহ্বান জানিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো গতকাল শনিবার জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

আন্দোলনে অনড় অবস্থানের কারণ ব্যাখ্যা করে দলগুলোর শীর্ষ নেতারা বলছেন, ‘দেশের জনগণ, বিরোধী রাজনৈতিক দল ও গণতান্ত্রিক বিশ্বের অনুরোধ উপেক্ষা করে সরকার একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে হাঁটছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় আমাদের রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামে অনড় থাকতে হচ্ছে। কারণ বিগত দুটি সংসদ নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারেনি। তাই সরকারের বাইরে বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলকে আমরা ঐক্যবদ্ধ করে জনগণের ভোটাধিকার, মানবাধিকার ফিরিয়ে আনতে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন-সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।

তারা আরও বলেন, ‘দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ শীর্ষ নেতারাসহ সারা দেশে অসংখ্য নেতাকর্মী কারাগারে। ইতিমধ্যে কারাগারে মারা গেছেন কয়েকজন। এরপরও আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সংলাপের আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলাম। কিন্তু সরকার গুরুত্ব দেয়নি।’ 

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিগত দুটি সংসদ নির্বাচনে জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। আমরা জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে  দেওয়ার বিষয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ। জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিতে আমরা সরকারকে পদত্যাগ করে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলাম। কিন্তু সরকার দাবি না মেনে বিগত দুটি নির্বাচনের মতো আরেকটি একতরফা নির্বাচনের পথে হাঁটছে। তাই আমরা বাধ্য হয়ে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের পিছু হটার সুযোগ নেই।’ তিনি বলেন, ‘দাবি আদায়ে আমাদের আন্দোলন চলমান রয়েছে। এখন ডামি নির্বাচন বর্জন ও অসহযোগ আন্দোলনের অংশ হিসেবে আমরা ৪৮ ঘণ্টার হরতাল কর্মসূচি পালন করছি। ভোট বর্জনের দাবি আদায়ে আমরা রাজপথে আছি। ভোটের দিন আমরা রাজপথে থাকব।’ 

উল্লেখ্য, গত ১৩ নভেম্বর শর্তহীন সংলাপের আহ্বান জানিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টিকে চিঠি দেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু। ঢাকার আমেরিকার রাষ্ট্রদূত পিটার হাস এই চিঠি দলগুলোকে পৌঁছে দিয়ে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চায়। এ ছাড়া নির্বাচনসংক্রান্ত অচলাবস্থা নিরসনে সব রাজনৈতিক দলকে নিঃশর্তভাবে সংলাপে বসতে দেখতে চায় মার্কিন সরকার।’

মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সংলাপের আহ্বান জানিয়ে দেওয়া চিঠির বিষয় উল্লেখ করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত ১৩ নভেম্বর রাজনৈতিক সংকট নিরসনে আমরা ডোনাল্ড লুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে সংলাপে বসতে রাজি ছিলাম। কিন্তু সরকারের দিক থেকে কোনো সাড়া পাইনি। শুধু তা-ই নয়, আমরা বরাবরই শান্তিপূর্ণভাবে আমাদের কর্মসূচি পালন করেছি। কিন্তু সরকার নিজেরা নাশকতার ঘটনা ঘটিয়ে তার দায় আমাদের ওপর চাপিয়েছে।’ 

বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল খালেক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা নিজেরা নির্বাচন বর্জন করছি। ভোট বর্জনের জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। ডামি নির্বাচন বর্জন ও অসহযোগ আন্দোলনের পক্ষে আমাদের হরতাল কর্মসূচি চলমান রয়েছে। আমরা রাজপথে আমাদের কর্মসূচি পালন করব। পাশাপাশি নির্বাচনের পরে যে কর্মসূচি আসবে তা পালন করব।’

বিএনপিসহ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অনড় অবস্থানের কারণ ব্যাখ্যা করে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘গত ২৮ জুলাই থেকে অদ্যাবধি বিএনপির কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সারা দেশে ২৭ হাজার ১১৭ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ১ হাজার ১৫৭টির অধিক, আসামি করা হয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার ৫৭৬ জনকে, আহত হয়েছে ৯ হাজার ৫৯৪ জনের অধীক নেতাকর্মী, মৃত্যু হয়েছে ২৮ জনের (সাংবাদিক ১ জন)। ৮৪টি মামলায় ৯ জনের মৃত্যুদন্ডাদেশ ও প্রায় ১ হাজার ২৯৪ জনের অধিক নেতাকর্মীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় মারা যাওয়া, কারাবন্দি ও সাজাপ্রাপ্ত নেতাদের সঙ্গে বেইমানি করে পিছু হটার সুযোগ নেই।’

গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে গণতন্ত্র মঞ্চের উদ্যোগে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে মঞ্চের শরিক রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ুম বলেন, ‘ভোটের দিন ভোট বর্জনের দাবিতে যুগপৎ আন্দোলনের অংশ হিসেবে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করব আমরা।’

রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে শরিক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল হালিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনার আন্দোলন করছি। জনগণ যাতে সুষ্ঠুভাবে ভোট দিতে পারে, সে জন্য সরকারকে পদত্যাগ করে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলাম। কিন্তু সরকার দাবি উপেক্ষা করে একতরফা নির্বাচনের পথে হাঁটছে। আজ যে নির্বাচন হবে তাতে জনমতের প্রতিফলন হবে না। কারণ ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমরা অংশ নিয়েছিলাম। সেই নির্বাচনে আমাদের ১৭ জন প্রার্থীকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। এরপরও জনগণ ভোটাধিকার প্রয়োগ করলে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো ক্ষমতায় আসতে পারে সে আশঙ্কায় রাতেই ভোট কেটে বাক্স ভরেছিল। আর এবার ভোট টানার জন্য ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে না। তাই আমরা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত