সুন্নতে খতনা করাতে এসে মারা যাওয়া শিশু আয়ানের মৃত্যুর ঘটনায় সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে রাজধানীর গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। কমিটিকে আগামী ১০ কর্মদিবসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। কমিটির প্রধান করা হয়েছে সাঁতারকুলের ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আশরাফ সাঈদকে।
এ ব্যাপারে ইউনাইটেড হাসপাতালের জনসংযোগ কর্মকর্তা আরিফুল হক গতকাল সোমবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, আয়ানের ঘটনা ঘটে গত ৩১ ডিসেম্বর ও সেদিনই আমরা অভিযোগ পাই। পরদিন ১ জানুয়ারি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটি তাদের কাজ শুরু করেছে। ৪ জানুয়ারি কমিটি প্রথম সভা ও সোমবার (গতকাল) দ্বিতীয় সভা করেছে। কমিটি ১০ কর্মদিবসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেবে। সাঁতারকুলের ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালের চিকিৎসকদের নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইউনাইটেড হাসপাতালের এক কর্মকর্তা জানান, ৩০ ডিসেম্বর আয়ানকে খতনা করানোর জন্য সাঁতারকুল হাসপাতালে আনা হয় এবং শিশুর অভিভাবকরা সেদিনই খতনা করাতে চেয়েছিলেন। চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচারের আগে শিশুর কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরামর্শ দেয়। পরের দিন এসব পরীক্ষার রিপোর্ট আনা হলে তার অস্ত্রোপচার শুরু হয়। অস্ত্রোপচার অবস্থায় শিশুর শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি হলে তাকে গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে আনা হয় ও সেখানে পিআইসিইউতে (শিশু নিবিড় পরিচযা কেন্দ্র) রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। অ্যানেসথেসিয়ার প্রভাবে টানা আট দিন অচেতন থাকা অবস্থায় গত রবিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে আয়ানকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
আয়ানের বাবা শামীম আহমেদ জানান, গতকাল সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে আয়ানের মরদেহের ময়নাতদন্ত হয়েছে। পরে তার মরদেহ নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের বরুনা এলাকার বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বাদ আসর আয়ানকে দাফন করা হয়েছে।
বাবা শামীম আহমেদ বলেন, হাসপাতালে চিকিৎসকের ভুলের কারণে তাদের ছেলের মৃত্যু হয়েছে। তারা মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এ ব্যাপারে বাড্ডা থানার ওসি ইয়াসিন গাজী গতকাল দেশ রূপান্তরকে জানান, মৌখিক অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তারা আয়ানের মরদেহটি ময়নাতদন্ত করেছেন। পরিবার বলেছে তারা মামলা করবেন। তবে রাত ৮টা পর্যন্ত কেউ মামলা করতে আসেনি। পরিবার যদি মামলা নাও করেন, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পেলে সে অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মৃত্যুর ব্যাপারে আয়ানের পরিবার ও স্বজনরা চিকিৎসকদের গাফিলতিকে দায়ী করে সাংবাদিকদের বলেছেন, এতদিন তারা মৃত্যুর বিষয়টি নিয়ে টালবাহানা করছিল। শেষে নির্বাচনের দিনকে টার্গেট করা হয়, যাতে গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে কম প্রচার পায়। তারা এই হত্যাকান্ডের সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন। গত ৩১ ডিসেম্বর খতনা করানোর পর থেকেই বাচ্চার আর জ্ঞান ফেরেনি। তারা ঠিকমতো কোনো তথ্যও দেয়নি। এখন মৃত ঘোষণা করল।
আয়ানের বাবা শামীম আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুই সন্তানের মধ্যে আয়ান বড়। আরেক মেয়ের বয়স ছয় মাস। সুস্থ ছেলেকে নিয়ে এসে এখন লাশ নিয়ে যেতে হলো।
আয়ানের বাবার বন্ধু হাবিবুর রহমান গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, শামীম একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। বাড়ি বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জে। পরিবার নিয়ে ঢাকায় থাকেন পাঁচ থেকে সাত বছর ধরে। ছেলের পড়ালেখার সুবিধার জন্য গত ২৫ ডিসেম্বর বরুনায় আসেন তারা। বরুনা এলাকায় ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের নার্সারিতে পড়ত আয়ান। নতুন বাসায় ছেলেটা পাঁচ দিনের মতো ছিল।
আয়ানের পরিবার অভিযোগ করেছে, যেদিন আয়ানকে খতনার জন্য অচেতন করে অস্ত্রোপচারের টেবিলে রাখা হয়, তখন ওই মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা ওই শিশুর অস্ত্রোপচারের ওপর ক্লাস করতে সেখানে আসে। এভাবে টানা দুই ঘণ্টা শিশুটিকে অচেতন অবস্থায় রাখা হয়। এ সময় আয়ানের পরিবারের কাউকে সেখানে ঢুকতে ও কোনো তথ্যও দেওয়া হচ্ছিল না। একপর্যায়ে আয়ানের শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি হলে ও জ্ঞান না ফিরলে তাকে গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে পাঠানো হয়।
আয়ানের পরিবার এই মৃত্যুর জন্য চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের অবহেলা ও গাফিলতিকে দায়ী করেছেন। তারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
সেদিন আসলে কী ঘটেছিল জানতে চাইলে ইউনাইটেড হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মকর্তারা জানান, তদন্ত কমিটির রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে না। পূর্ণাঙ্গ চিত্র না পেলে কোনো ব্যবস্থা বা পদক্ষেপ নেওয়াটা আসলে সমীচীন হবে না। পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট পেলে কর্র্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবেন।
আয়ানের মৃত্যুর ঘটনায় গতকাল রাত পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি বলেও জানান তারা।
আয়ানের চিকিৎসার বিলের ব্যাপারে হাসপাতালের এক কর্মকর্তা বলেন, গত রবিবার যখন সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে, তখনও পরিবারকে বলেছি, বিলের বিষয়টি নিয়ে পরে দেখা যাবে। এখন এটা নিয়ে কোনো চিন্তা করতে হবে না।
এই কর্মকর্তা আরও বলেন, পুরো বিষয়টি অত্যন্ত মানবিকতার সঙ্গে দেখেছেন তারা। কারণ পাঁচ বছরের একটা শিশু, তার এ রকম একটা ঘটনা হবে, এটা তো কারোরই কাম্য নয়। শীর্ষ ম্যানেজমেন্ট, চিকিৎসক ও মেডিকেল বোর্ড সবাই মিলে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করা হয়েছে শিশুটিকে বাঁচানোর জন্য।
