অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২৪, ০৩:০০ এএম

বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নকামী কল্যাণ অর্থনীতিতে সব পক্ষকে স্ব স্ব অবস্থানে থেকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে। একই সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সার্বিক উদ্দেশ্য অর্জনের অভিপ্রায়ে অয়োময় প্রত্যয়দীপ্ত হওয়ার লক্ষ্যে সুশাসন ও আত্ম বিশ্লেষণের বিকল্প নেই। বিশেষ করে ২০২৩-এর তিক্ত অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪-এ অচল অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ‘নিজের দিকে নিজে তাকানো’ অনিবার্য এই মুহূর্তে। বিশ্বব্যাপী মহামারী করোনা, রাশিয়া-ইউক্রেন, ফিলিস্তিন-ইসরায়েল, সুদান সমরেরকালে প্রত্যেক দেশ ও অর্থনীতিকে পরনির্ভরশীলতার পরিবর্তে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার অনিবার্যতা দেখা দিচ্ছে। যে কোনো ধরনের ব্যর্থতার বজরা ভারী হতে থাকলেই যে কোনে উৎপাদন ব্যবস্থা কিংবা উন্নয়ন প্রয়াস ঘাটতি বা ভর্তুকির পরাশ্রয়ে যেতে বাধ্য। দারিদ্র্যপীড়িত জনবহুল কোনো দেশে পাবলিক সেক্টর বেকার ও অকর্মণ্যদের জন্য যদি অভয়ারণ্য কিংবা কল্যাণ রাষ্ট্রের প্রতিভু হিসেবে কাজ করে তাহলে সেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে।

করোনা-উত্তরকালে বেকারত্ব বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে যদি বিপুল জনগোষ্ঠীকে জনশক্তি ও সম্পদে পরিণত করা না যায়, তাদের উপযুক্ত শিক্ষা, কর্মক্ষমতা, দক্ষতা অর্জন ও প্রয়োগের পরিবেশ যদি সৃষ্টি না করা যায়, তাহলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে সর্বত্র। উন্নয়ন কর্মসূচিতে বড় বড় বিনিয়োগও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে। ক্ষমতা, পদ-পদবি অর্জনকে সোনার হরিণ বানানোর কারণে তা পাওয়া, থাকা বা রাখার জন্য অস্বাভাবিক দেনদরবার চলাই স্বাভাবিক। দায়িত্বহীন সুযোগের অপেক্ষায় থাকার ফলে নিজ উদ্যোগে স্বনির্ভর হওয়ার আগ্রহতেও অনীহা চলে আসে। মানবসম্পদ অপচয়ের এর চেয়ে বড় নজির আর হতে পারে না। দরিদ্রতম পরিবেশে যেখানে শ্রেণিনির্বিশেষে সবার কঠোর পরিশ্রম, কৃচ্ছ সাধন ও আত্মত্যাগ  আবশ্যক, সেখানে সহজে ও বিনা ক্লেশে কীভাবে অর্থ উপার্জন সম্ভব সেদিকেই ঝোঁক বেশি হওয়াটা কোনোভাবেই সুস্থতার লক্ষণ নয়। এখনো মুমূর্ষু গণতন্ত্রকে  বাঁচানোর নামে নির্বাচনে অঢেল অর্থ ব্যয় চলে। তা যেন এমন এক বিনিয়োগ, যা অবৈধভাবে অধিক উসুলের সুযোগদানের সমতুল্য। শোষক আর পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় বঞ্চিত নিপীড়িত শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থ উদ্ধারে নিবেদিতচিত্ত হওয়ার বদলে ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃত্বই যখন উৎপাদনবিমুখ আর শ্রমিক স্বার্থ উদ্ধারের পরিবর্তে আত্মস্বার্থ উদ্ধারে ব্যতিব্যস্ত হয়ে শোষণের প্রতিভু বনে যায়, তখন দেখা যায়, যাদের তারা প্রতিনিধিত্ব করছে তাদেরই তারা প্রথম ও প্রধান প্রতিপক্ষ।  প্রচণ্ড স্ববিরোধী এই পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে উৎপাদন, উন্নয়ন সবই বালখিল্যের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

একটি ভালো সংগীত সৃষ্টিতে গীতিকার সুরকার গায়ক ও বাদ্যযন্ত্রীর সমন্বিত প্রয়াস যেমন পরিহার্য, তেমনি দেশ বা সংসারের সামষ্টিক অর্থনীতির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা বা পুনরুদ্ধারে সব পক্ষের সহযোগিতা ছাড়া সুচারুরূপে সম্পাদন সম্ভব নয়। আধুনিক শিল্প ও বাণিজ্য ব্যবস্থাপনার বেলাতেও এমনকি যে কোনো উৎপাদন ও  উন্নয়ন উদ্যোগেও ভূমি, শ্রম ও পুঁজি ছাড়াও মালিক-শ্রমিক সব পক্ষের সমন্বিত ও পরিশীলিত প্রয়াস প্রচেষ্টাই সব সাফল্যের চাবিকাঠি বলে বিবেচিত হচ্ছে।  মানব সম্পদ উন্নয়ন কার্যক্রমের দ্বারা দক্ষতা ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি ছাড়াও সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়াসে সুসমন্বয়ের আবশ্যকতা অপরিহার্য। স্থান-কাল-পাত্রের পর্যায় ও অবস্থানভেদে উন্নয়ন ও উৎপাদনে সবাইকে একাত্মবোধের মূল্যবোধে উজ্জীবিত করাও সামষ্টিক ব্যবস্থাপনার একটা অন্যতম উপায় ও উপলক্ষ হওয়া উচিত।

মানুষের দায়িত্ববোধের দ্বারা কর্তব্য কর্ম সুচারুরূপে সম্পাদনের মাধ্যমে সমাজ সমৃদ্ধি লাভ করে। আবার এই মানুষের দায়িত্বহীনতার কারণে সমাজের সমূহক্ষতি সাধিত হয়। মানবসম্পদ না হয়ে সমস্যায় পরিণত হলে সমাজের অগ্রগতি তো দূরের কথা, সমাজ মুখ থুবড়ে পড়তে পারে।  মানুষের উদ্ভাবনী শক্তি সভ্যতার বিবর্তনে সহায়ক। মানুষের সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ, সহিংস সন্ত্রাসী কার্যকলাপ কিংবা যুদ্ধ এবং মারণাস্ত্রের ব্যবহারে মানুষের ধ্বংস অনিবার্য হয়ে ওঠে। মানবতার জয়গান মানুষই রচনা করে আবার মানবভাগ্যে যত দুর্গতি তার স্রষ্টাও সে। মানুষের সৃজনশীলতা, তার সৌন্দর্যজ্ঞান, পরস্পরকে সম্মান ও সমীহ করার আদর্শ অবলম্বন করে সমাজ এগিয়ে চলে। পরমতসহিষ্ণু আর অন্যের অধিকার ও দাবির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার মাধ্যমে সমাজে বসবাস করার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। অন্যের অন্যায় অনিয়মের নজির টেনে নিজেদের অপকর্মের দৃষ্টান্তকে ব্যাখ্যার বাতাবরণে ঢাকার মতো আত্মঘাতী ও প্রবঞ্চনার পথ পরিহার করেই বরং সবার সহযোগিতা ও সমন্বিত উদ্যোগের আবহ সৃষ্টি করতে পারলে সমাজ নিরাপদ বসবাসযোগ্য হয়ে ওঠে। মানুষের আর্থসামাজিক সার্বিক উন্নয়নকে দেশ জাতি রাষ্ট্রে অন্যের অধিকার ও দাবির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার মাধ্যমে সমাজে বসবাস করার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। অন্যায় অনিয়মের নজির টেনে নিজেদের অপকর্মের দৃষ্টান্তকে ব্যাখ্যার বাতাবরণে ঢাকার মতো আত্মঘাতী ও প্রবঞ্চনার পথ পরিহার করেই বরং সবার সহযোগিতা ও সমন্বিত উদ্যোগের আবহ সৃষ্টি করতে পারলে সমাজ নিরাপদ বসবাসযোগ্য হয়ে ওঠে। সব মানুষের আর্থসামাজিক সার্বিক উন্নয়নকে দেশ জাতি রাষ্ট্রের সব উন্নয়নের পূর্বশর্ত না হলে দেশ, সমাজ ও অর্থনীতি পিছিয়ে যাবে। সমাজের উন্নতি, অগ্রগতি ও কল্যাণ সৃষ্টিতে মানুষের সার্বিক উন্নতি অপরিহার্য শর্ত। মানুষ ছাড়া মনুষ্য সমাজের প্রত্যাশা বাতুলতামাত্র। সুতরাং একেকটি মানুষের উন্নতি সবার উন্নতি, সমাজের উন্নতি। একেক মানুষের দায়িত্ববোধ, তার কাণ্ডজ্ঞান তার বৈধ-অবৈধতার উপলব্ধি এবং ভালোমন্দ সীমা মেনে চলার চেষ্টা-প্রচেষ্টার মধ্যে পরিশীলিত পরিবেশ গড়ে ওঠা নির্ভর করে। রাষ্ট্রে সব নাগরিকের সমান অধিকার  এবং দায়িত্ব নির্ধারিত আছে। কিন্তু দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা অধিকার আদায়ের সম্ভাবনা ও সুযোগকে নাকচ করে দেয়। পণ্য ও সেবা সৃষ্টি না হলে চাহিদা অনুযায়ী ভোগের জন্য সম্পদ সরবরাহে ঘাটতি পড়ে। দ্রব্যমূল্য স্ফীতিতে  সম্পদ প্রাপ্তিতে প্রতিযোগিতা বাড়ে। পণ্য ও সেবা সৃষ্টি করে যে মানুষ সেই মানুষই ভোক্তার চাহিদা সৃষ্টি করে। উৎপাদনে আত্মনিয়োগের খবর নেই– চাহিদার ক্ষেত্রে ষোলোআনা- টানাপড়েন তো সৃষ্টি হবেই। অবস্থা ও সাধ্য অনুযায়ী উৎপাদনে একেকজনের দায়িত্ব ও চাহিদার সীমারেখা বেঁধে দেওয়া আছে, কিন্তু এ সীমা অতিক্রম করলে টানাপড়েন সৃষ্টি হবেই। ওভারটেক করার যে পরিণাম দ্রুতগামী বাহনের ক্ষেত্রে, সমাজে সব অর্জন ও ভোগের ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রমণে একই পরিবেশ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে থাকে।  সমাজে নেতিবাচক মনোভাবের বিস্তার, অস্থিরতা ও নাশকতার যত কারণ এ যাবৎ আবিষ্কৃত পদ অর্জন ও ভোগের ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রমণে একই পরিবেশ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে থাকে।  সমাজে নেতিবাচক মনোভাবের বিস্তার, অস্থিরতা ও নাশকতার যতগুলো কারণ এ যাবৎ আবিষ্কৃত  হয়েছে তার মধ্যে সম্পদের অবৈধ অর্জন এবং এতদুপলক্ষে নির্মম প্রতিযোগিতা, নিজের ব্যাপারে  ষোলোআনা জরুরি ভাবলেও অন্যের অধিকার অস্বীকার ও বর্জন এবং আত্মত্যাগ স্বীকারে অস্বীকৃতি মুখ্য।

দেশগত ভাবনা দেশের শিল্পায়নের প্রশ্নেও বিবেচ্য। বিদেশি মত পথ সমর্থন সামগ্রীর প্রতি আগ্রহ ও আসক্তি দেশি শিল্পপণ্যের বাজারকে সংকুচিত করে, দেশে শিল্পপ্রতিষ্ঠার পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে। বিদেশি সামগ্রীর চাহিদায় আমদানি ব্যয় বাড়ে, বৈদেশিক মুদ্রা ভাণ্ডারের ওপর চাপ পড়ে, তার  চেয়ে বড় কথা– এ চাহিদার ফলে বিদেশি শিল্পের প্রবৃদ্ধি ও সেখানকার  কর্মসংস্থানে সহযোগিতা করা হয়। হতদরিদ্র এবং বেকারত্বের ভারে ন্যুজ একটি অর্থনীতির জন্য বিদেশি সহায়তা সমর্থনের ওপর অতি  নির্ভরশীলতা  মানে নিজেদের সার্বিক স্বার্থের সঙ্গে প্রবঞ্চনা। বেনাপোল স্থলবন্দরে কাস্টমস হাউজের কার্যক্রম পরিদর্শনকালে একটি আশ্চর্য বিষয় কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। প্রতিবেশী দেশ থেকে পণ্যবাহী ট্রাকের চালক ও সহকারী পণ্য শুল্কায়ন ও খালাসের জন্য বেনাপোলে অবস্থানকালে সঙ্গে আনা চাল ডাল ডিম তেল নুন নিজেদের স্টোভে পাক করে খায়। তাদের যদি কোনো আইটেম ঘাটতি পড়ে, এমনকি একটা দেয়াশলাই পর্যন্ত, তারা সেটি বাংলাদেশের বাজার থেকে কিনবে না। তারা পায়ে হেঁটে তাদের দেশের অংশে গিয়ে সেখানকার দোকান থেকে ওই জিনিসটি কিনে আনবে। তারা বিদেশি মুদ্রা ব্যয় করবে না। তাদের এ দৃষ্টিভঙ্গি, আচরণ অবশ্যই ইতিবাচক, দেশিক  এবং গঠনমূলক। বেনাপোল স্থলবন্দরে সে সময় প্রতিবেশী দেশ থেকে প্রত্যাগত এক বাংলাদেশি পরিবারের লাগেজ বাংলাদেশের শুল্ক কর্মকর্তারা চেক করছিলেন। তখন দেখা গেল, বিদেশি মুদ্রা ব্যয় করে কিনা তারা এনেছেন বিদেশ থেকে, আমসত্ত্ব, চুলের ক্লিপ, সাবান টুথপেস্ট সবই। অথচ এসব জিনিস তার দেশে সহজলভ্য। এটা মানসিকতার প্রশ্ন। দেশের মানুষ দেশে উৎপাদিত সামগ্রী না কিনলে উৎপাদনে উন্নয়ন উৎকর্ষ আসবে কী করে? দেশ ও দেশের অর্থনীতিকে স্বয়ম্ভর করে তুলতে দেশিক দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশের বিকল্প দেখি না। যে জিনিস দেশে আছে, হয়তো পর্যাপ্ত পরিমাণে নেই, যে সামগ্রী দেশে উৎপাদিত হয় কিন্তু সেসবের কোয়ালিটি হয়তো ততটা উন্নত নয়, এমন কিছু সামগ্রী দেশে উৎপাদন করা সম্ভব কিন্তু হয়তো উপযুক্ত কাঁচামাল কিংবা উৎপাদন কৌশল জানা নেই, নেই প্রয়োজনীয় মেশিনারি কিংবা রয়েছে উৎপাদনে উপযুক্ত  অবকাঠামো অপ্রতুলতা। সেসব সুযোগ, কোয়ালিটি, প্রযুক্তি, পুঁজির সমাহার ঘটিয়ে উৎপাদন বাড়িয়ে দেশি শিল্পে উৎপাদিত পণ্যের প্রসারে  পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।  তাতে বেকার সমস্যার সমাধান হয়, বিদেশি মুদ্রা ব্যয় কমে এবং জাতীয় আয় বাড়ে। করোনা-উত্তর পরিবেশ পরিস্থিতিতে, বৈশি^ক সংকট সন্ধিক্ষণে নিজের দেশ সমাজ ও রাজনৈতিক অর্থনীতির ভালো নিজে বোঝার চেতনা যত স্বচ্ছ ও সাবলীল হবে, সর্বত্র সুশাসন প্রতিষ্ঠায় যত আন্তরিক ও দায়িত্বশীল হওয়া যাবে, তত বিধ্বস্ত অর্থনীতির পুনর্গঠন প্রয়াস বেগবান হবে।

লেখক: উন্নয়ন অর্থনীতির বিশ্লেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত