দুর্নীতিকে প্রধান সমস্যা মনে করেন ৬৮% ব্যবসায়ী

আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২৪, ০২:০৪ এএম

দেশের সিংহভাগ ব্যবসায়ী দুর্নীতিকে ব্যবসা-বাণিজ্যে এক নম্বর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সমস্যার দ্বিতীয় স্থানে আছে অদক্ষ আমলাতন্ত্র। আর ব্যবসা-বাণিজ্যে তৃতীয় বড় সমস্যা হিসেবে বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতার বিষয়টি চিহ্নিত করেছেন তাদের একটি অংশ। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) এর একটি জরিপে উঠে এসেছে এই তথ্য।

বাংলাদেশ ব্যবসায় পরিবেশ ২০২৩-এর উদ্যোক্তা জরিপের ফলাফল গতকাল বুধবার প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। সিপিডির এ জরিপে সহায়তা করেছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ)। সিপিডির ধানম-ির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে জরিপের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন এ গবেষণা সহযোগী নিশাত তাসনিম আনিকা ও জেবুন্নেসা।

গোলাম মোয়াজ্জেম জানান, তাদের জরিপে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ীদের প্রায় ৬৮ শতাংশ দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশের ক্ষেত্রে উচ্চমাত্রার দুর্নীতিকে এক নম্বর হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। প্রায় ৫৫ শতাংশ ব্যবসায়ী দায়ী করেছেন অদক্ষ আমলাতন্ত্রকে। আর ব্যবসা-বাণিজ্যে তৃতীয় বড় সমস্যা হিসেবে বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতার বিষয়টিকে মনে করেন ৪৬ শতাংশ ব্যবসায়ী। এছাড়া ৬৬ শতাংশ ব্যবসায়ী মনে করছেন, আগামী দুই বছর জ্বালানি সংকটে ভুগবেন ব্যবসায়ীরা। তারা এটা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

জরিপে ব্যবসার ক্ষেত্রে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। দুর্নীতি, অদক্ষ আমলাতন্ত্র, মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি সংকট ছাড়াও অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতাকে ব্যবসায়ীরা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন। এছাড়া জটিল করনীতি, ব্যবসার ক্ষেত্রে বারবার নীতি পরিবর্তন, দক্ষ শ্রমশক্তির অভাব, উদ্ভাবনের সক্ষমতায় ঘাটতি, শ্রমশক্তিতে দুর্বল নৈতিকতা, উচ্চ করহার, জলবায়ু পরিবর্তন, সরকারের অস্থিতিশীলতা, অপরাধ ও চুরি, বিধিনিষেধমূলক শ্রম আইন ও দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থাকেও ব্যবসায় চ্যালেঞ্জ বা বাধা হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা।

এশিয়ায় ব্যবসা পরিবেশে অন্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে জানিয়ে মোয়াজ্জেম বলেন, জরিপে উঠে আসে এশিয়ায় ব্যবসায় প্রতিযোগিতায় সব থেকে পিছিয়ে বাংলাদেশ। তবে বাংলাদেশ টেকসই সূচকে একটু ওপরে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার বিবেচনাতেও বাংলাদেশ এগিয়ে নেই। তবে টেকসই অর্থনীতি বা উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভারতের পরই বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশের দক্ষতা ভালো বলা যাবে না। বাংলাদেশে ডেল্টা প্ল্যান থাকলেও বাস্তবায়নটা অনেক বেশি আমাদের চোখে পড়ছে না। তাই আমরা অন্য দেশের চেয়ে পিছিয়ে আছি।

তিনি বলেন, পাবলিক ইউটিলিটি, রেজিস্ট্রেশন, আমদানি-রপ্তানি, লাইসেন্স নেওয়ার ক্ষেত্রে, পাবলিক কন্ট্রাক্ট নেওয়ার ক্ষেত্রে দুর্নীতিতে ব্যবসায়ীদের নিয়মিত ভোগাচ্ছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর সবাইকে নিয়ে কার্যক্রমের অন্যতম বাধা ঘুষ। একজন ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, তিনি একটি পরিষেবা সংযোগ নিতে আবেদন করলে তার কাছে যে পরিমাণ ঘুষ চাওয়া হয়েছিল, তা তার পরিকল্পিত বিনিয়োগের সমপরিমাণ। বড় ব্যবসায়ীরা কোনো না কোনোভাবে ঘুষ-দুর্নীতি সামলে নিতে পারলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের কাছে এটি বড় সমস্যা। সুতরাং এই জায়গাগুলোতে সমস্যা দূর করার দায়িত্ব সরকারের।

সিপিডির এই পরিচালক বলেন, তারা নবায়নযোগ্য জ্বালানির কথা বারবার বললেও সেটা যথাযথভাবে আমলে নেয়নি সরকার। বৈশ্বিকভাবেই জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। সেখানে এলএনজি আমদানি বড় সংকট তৈরি করেছে। আমরা মনে করি সরকারের উচিত জ্বালানি সংকট নিরসনে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে বিবেচনায় প্রাধান্য দেওয়া।

তিনি বলেন, ৩০ শতাংশ ব্যবসায়ী বলেছেন, ২০২৩ সালে উৎপাদন বা সেলসের পতন হয়েছে। ৪২ শতাংশ ব্যবসায়ী ব্যবসায় কোনো পরিবর্তন দেখছেন না, স্থিতাবস্থায় আছেন। তবে মাত্র ৬ শতাংশ ব্যবসায়ী পরিবর্তন দেখছেন। সুতরাং প্রবৃদ্ধি বা লাভের মুখ সবাই দেখছেন না, এটা স্পষ্ট।

ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশের উন্নতি করতে সিপিডি ১০টি সুপারিশ করেছে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ব্যবসায়-বাণিজ্যের পরিবেশের উন্নতিতে বিভিন্ন সরকারি কার্যালয়ের ১০০ দিন, ১ বছর, ৩ বছর ও ৫ বছরের পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও মনিটরিং করা; ব্যাপকভাবে দুর্নীতির কারণে স্বাধীন ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠা ও তাদের সব ধরনের ফ্যাসিলিটি দিতে হবে; সীমিত সময়ের জন্য খাতভিত্তিক কিছু কমিশন গঠন, যেমন ব্যাংক, শেয়ারবাজার, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সংস্কার; টাকা পাচার বা দুর্নীতি ধরতে হলে একটি সমন্বিত আর্থিক লেনদেন কাঠামোতে তৈরি করতে হবে; সরকারি কেনাকাটা ব্যবস্থা আমূল সংস্কার ও আধুনিক করা প্রয়োজন; প্রতিযোগিতা করার জন্য যে সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেগুলোকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন ও আইনকানুন, বিধিবিধানে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা, যার মাধ্যমে সাধারণ মানুষ, ব্যবসায় আরও এগিয়ে যাবেন।

মোয়াজ্জেম বলেন, এ জরিপে কভিড ও যুদ্ধপরবর্তী সময়ে বিশ্ব কীভাবে চলবে, অর্থ বৈষম্য সহায়তা ও সাহায্য কীভাবে অব্যাহত থাকবে, তাও জানার চেষ্টা করা হয়। এই জরিপে বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ কীভাবে চলবে সেটার ওপর অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জরিপে উদ্ভাবনী, অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই উন্নয়ন ও সহনশীলতার সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে প্রবৃদ্ধি। পাশাপাশি মানবসম্পদ, শারীরিক ও টেকনিক্যাল স্কিল, অর্থ, গবেষণা ও প্রযুক্তিগত কৌশল, প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়কে দেখা হয়েছে।

তিনি বলেন, গবেষণায় গত বছরের মে থেকে জুলাই ঢাকা, গাজীপুর ও সাভার এলাকার ৭১ জন বড় ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। এরমধ্যে ছোট ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ২৯ দশমিক ৫৮ শতাংশ, মধ্যম মানের ব্যবসায়ী ৩৫ দশমিক ২১ শতাংশ ও বড় ব্যবসায়ী ৩৫ দশমিক ২১ শতাংশ। ব্যবসা খাতের মধ্যে কৃষি সংক্রান্ত ২ দশমিক ৮২ শতাংশ, শিল্প ও তৈরিকারক ২২ দশমিক ৫৪ শতাংশ। অ-উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ৯ দশমিক ৮৬ ও সেবা খাতের ৬৪ দশমিক ৭৯ শতাংশকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত