‘যে নাওটা ধাক্কা মারিল, সেডা কই?’

আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২৪, ০৯:২৬ এএম

মানিকগঞ্জের পাটুরিয়ায় পদ্মা নদীতে ৯টি পণ্যবাহী ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান নিয়ে ডুবে যায় রজনীগন্ধা নামে একটি ফেরি। গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ডুবে যাওয়া ফেরি থেকে ২০ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও একজন নিখোঁজ রয়েছেন। এই ফেরিডুবির কারণ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। তাদের সঙ্গে প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। 

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) কর্মকর্তারা বলেন, বালুবাহী বাল্কহেডের ধাক্কায় ফেরিটি ডুবে যায়। অন্যদিকে নদীতে ডুবোচরে ধাক্কা খেয়ে তলা ফেটে ফেরিটি ডুবেছে বলে ভাষ্য নৌ-পুলিশের। আর ফেরিতে থাকা প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, পানি উঠে কাত হয়ে ধীরে ধীরে ফেরিটি তলিয়ে যায়।

তুলা ভর্তি ট্রাক নিয়ে রাত ৯টার দিকে ফেরিটিতে উঠেছিলেন ট্রাকচালক আশিক শেখ। তিনি বলেন, কিছুক্ষণ চলার পরই ফেরিটি ঝাঁকি দেয়। তখন তিনি সহকারীকে খোঁজ নিতে পাঠান। সহকারী ফেরির কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে এসে জানান, ‘ফেরি রাতে আর যাবে না।’ কর্মীরা ঘুমিয়ে থাকতে বলার পর আশিক শেখ ট্রাকে উঠে দরজা জানলা আটকে ঘুমিয়ে পড়েন। সকালে ফেরির কর্মীদের চিৎকারেই তাদের ঘুম ভাঙে।

তারা চিৎকার করছিলেন, ‘ফেরি ডুইবে যাচ্ছে, যে যেমনে পারেন সেইভ হন।’ এরপর ফেরির কিছু কর্মীকে ফোলানো টায়ার বা বয়া নিয়ে পানিতে ভাসতে দেখেন আশিক শেখ। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমরা ফেরিতে গাড়িটা তুলছি তাদের ভরসায়। তারা আমাদের রাইখে পানিতে নেমে গেল। আমি আধঘণ্টা পানিতে যুদ্ধ করছি। পরে একটা ট্রলার আইসে আমারে তুলছে। এখন ঘাটে আইসে শুনছি, ফেরিতে নাকি বাল্কহেড ধাক্কা মারিছে। আমার কথা হচ্ছে, যেই নাওটা ধাক্কা মারিল, সেডা কই। আমার তো মনে হয় ফেরি নিজে থেকেই পানি উঠে ডুইবে গেছে।’

একই ধরণের তথ্য দিলেন আরেক ট্রাক চালক মো. সাজ্জাদ। তিনি বলেন, ধাক্কা মারার কোনো ঘটনা দেখেননি। তার গাড়ির ডান পাশের পাঠাতনে একটি গোল ঢাকনা ছিল। সেটি দিয়ে পানি উঠছিল।

বোয়ালমারির চামড়া বেপারী শহিদুল ইসলামও জানালেন তথ্য। তিনিসহ পাঁচজন ছিলেন একটি ট্রাকের উপরে। প্রায় ১১ লাখ টাকার চামড়া নিয়ে তারা সাভারের হেমায়েতপুরের দিকে আসছিলেন।

তিনি জানান, সকালে ঘুম ভেঙে দেখি ৬টা ৬ মিনিট। আমরা এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করতে গিয়ে দেখি ফেরির পেছনে ম্যানহোলের মত ঢাকনা থেকে পানি উঠছে। এটি দেখতে পেয়ে কয়েকজন ফেরির স্টাফদের ডাকাডাকি শুরু করি। কিন্তু কেউ আসেননি। কিছুক্ষণ পর বয়স্ক একজন লোক আসেন। সেই লোক তখন আরেকটা ছেলেরে পাঠাইল। এরপর উপর থেকে মুরুব্বি গোছের লোকটা বলল, ‘নোঙর তোল, ফেরি স্টার্ট দে’।

শহিদুল জানান, ততক্ষণে ফেরিতে পানি উঠতে শুরু করে এবং সেটি ধীরে ধীরে কাত হয়ে যাচ্ছিল। এক পর্যায়ে তিনি ও তার সহযোগীরা রেলিং ধরে ঝুলতে থাকেন। ফেরিটি ডুবতে শুরু করলে তারা একটি বয়া ধরে পানিতে লাফ দেন। পরে ফেরির লোকজন কইতেছে, অন্য জাহাজ নাকি আইসে ঘাই মারছে। আমরা ছিলাম, আমরা দেখছি এ রকম কিছুই হয় নাই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত