৪০ দালাল, রোহিঙ্গা ও এনআইডি

আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২৪, ০৩:০০ এএম

জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন সরাসরি জড়িত। এর ব্যবহার শুধু ভোটাধিকার প্রয়োগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি আসলে এক অপরিহার্য দলিল, যা ছাড়া পাসপোর্ট থেকে শুরু করে মোবাইলের সিমকার্ড কেনা, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, জমি কেনাবেচা পর্যন্ত কোনো কাজই করা এখন আর সম্ভব নয়। কিন্তু রোহিঙ্গাদের এনআইডি পাওয়ার খবর প্রায়শই গণমাধ্যমে আসছিল, যা গভীরভাবে উদ্বেগজনক। খবর প্রকাশের পর নানা আলোচনা-সমালোচনা হলেও কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরে ‘৪০ ভাগ রোহিঙ্গার হাতে এনআইডি’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনটিই এর জ¦লন্ত ও দুঃখজনক উদাহরণ। তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এর মধ্যে জালিয়াতি করে পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশের এনআইডি পেয়েছে। তাদের কেউ কেউ পাসপোর্ট তৈরি করে বিদেশেও পাড়ি দিয়েছে। কেউ আবার রোহিঙ্গা ক্যাম্প ছেড়ে কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসা করছে।

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাইয়ে দেওয়ার পেছনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পুলিশ সদস্য, নির্বাচন কমিশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও মাঠপর্যায়ের দালাল চক্র জড়িত। এর জন্য ৫ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। ১২টি স্তরে এই অর্থ ভাগাভাগি হয়। বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাইয়ে দিয়ে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা পকেটে ভরেছে এই চক্র। সরেজমিনে জানা গেছে, রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট পেতে টাকার বিনিময়ে সহযোগিতা করেন অন্তত ৪০ জন। তাদের নিয়মিত বিচরণক্ষেত্র পাসপোর্ট অফিস, আদালত চত্বর, পৌরসভা গেট ও জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের আশপাশের এলাকা। এমনকি অনেকে রীতিমতো অফিস খুলে বসেছেন প্রশাসনের নাকের ডগায়। দালাল চক্রের সঙ্গে জনপ্রতিনিধি, নির্বাচন কমিশন, পাসপোর্ট অধিদপ্তর এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় সদস্যের জড়িত থাকারও তথ্য মিলেছে। আরব্য রজনীর গল্পে সরল-সহজ আলীবাবার প্রত্যুৎপন্নমতী কর্মচারী মর্জিনার বুদ্ধিতে বধ হয়েছিল ভয়ংকর ৪০ চোর। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এই রোহিঙ্গাদের এনআইডি, পাসপোর্ট পাইয়ে দিতে তৎপর এই ৪০ দালাল বধ করবে এমন করিতকর্মা কর্তৃপক্ষ কোথায়? 

পরিস্থিতি এমন যে, রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট পাওয়া স্থানীয়দের চেয়ে সহজ। প্রশ্ন ওঠে এনআইডি-পাসপোর্ট করতে রোহিঙ্গারা এত টাকাই বা কোথায় পান। মাদক, অস্ত্র পাচারসহ নানা অপরাধে জড়িত অভিযোগের কথা জানিয়ে স্থানীয়রা জানান,  তাদের অর্থের অভাব হয় না। এ ছাড়া অনেক রোহিঙ্গার স্বজন বিদেশে রয়েছেন কিংবা স্থানীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি এনআইডি পাওয়া ঠেকাতে বিশেষ অঞ্চল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। এ অঞ্চলের লোকজনকে ভোটার হতে হলে একটি বিশেষ ফরম পূরণ করতে হয়। এ বিশেষ ফরম যাচাইয়ের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে গঠন করা হয়েছে একটি বিশেষ কমিটি। সেই বিশেষ কমিটির সুপারিশ ছাড়া কাউকে ভোটার করা হয় না। তারপরও রোহিঙ্গাদের হাতে হাতে এনআইডি ও পাসপোর্ট কীভাবে আসে?

এনআইডির বিষয়টি এখনো নির্বাচন কমিশনই দেখছে। কিন্তু পাসপোর্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। অন্যদিকে পাসপোর্ট পেতে পুলিশ ভেরিফিকেশন পেতে হয় বিধায়, এটির দায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এড়াতে পারে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘জন্মসনদ, এনআইডি ও পাসপোর্ট করতে রোহিঙ্গাদের যারা সহায়তা করছে তাদের আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে যারা পেয়েছেন সেগুলো বাতিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রোহিঙ্গাদের প্রতিটি কর্মকা- কঠোর মনিটরিং করা হচ্ছে।’ কেবল রোহিঙ্গাদের মনিটরিং করে এই তৎপরতা কি থামানো যাবে? গোটা সরকারি প্রশাসনকে রোহিঙ্গাদের এনআইডি নেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। বিষয়টিকে শুধু রোহিঙ্গাকেন্দ্রিকভাবে না দেখে জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির নিরিখে দেখা উচিত। একটি বিষয় অন্তত স্পষ্ট যে এনআইডি তৈরি ও বিতরণব্যবস্থা শতভাগ নিিদ্র নয়। যারা এর দায়িত্বে ছিলেন, তারা যে যথেষ্ট সংবেদনশীল ও সতর্ক ছিলেন এমন প্রমাণ মেলে না। ফলে এনআইডি ব্যবস্থাপনার একটি সামগ্রিক মূল্যায়ন জরুরি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত