তাদের সমর্থন দূর করেছে বিপিএলের ‘আকাল’

আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২৪, ০৬:৩৭ পিএম

‘বিপিএল তো ভাই আমাদের সম্পত্তি হয়ে গেছে।’ কথাটা বলে হাসিতে ফেটে পড়লেন একজন। মুখ তার ঢাকা ছিল সার্জিক্যাল মাস্কে। কথা বলছিলেন এক গণমাধ্যমের সঙ্গে। কাছে গিয়ে জানতে চাইলে সেই ক্রিকেট ভক্ত বললেন, ‘নয়তো কি! আমরা এখন পর্যন্ত চার বার টুর্নামেন্টের শিরোপা জিতেছি। এবারও ভালো একটা শুরু করতে যাচ্ছি। কারণ প্রতিপক্ষ ঢাকা খুব একটা শক্তিশালি না। আর হলেই বা কি! আমাদেরকে হারানো এত সহজ না। সেটা তো আগের আসরগুলোতে দেখিয়েইছি।’

বোঝা গেল মুখ ঢাকা সেই দর্শক কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স ভক্ত। নাম মোহাম্মদ আবু ইউসুফ। সকালে কুমিল্লা থেকে রওনা হয়ে ‍দুপুরে ঢাকায় পৌঁছেছেন। প্রিয় দল কুমিল্লাকে সমর্থন দিবেন বলে। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে কিনেছেন উদ্বোধনী ম্যাচের টিকিট। যা পেয়ে আনন্দে আত্মহারা তিনি।

ইউসুফ আর দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপ চলছিল, তখন নতুন ক্রীড়ামন্ত্রী ও বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন উদ্বোধন করেন দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট টুর্নামেন্টের দশম আসরের। আঁতশবাজির শব্দে পুরো মিরপুর স্টেডিয়াম পাড়া কেঁপে উঠেছিল। বুঝতে বাকি ছিল না, এটাই বিপিএলের ঢাক। তাই প্রবেশের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শকরাও গলা ফাটিয়ে উল্লাস প্রকাশ করেন।

গ্যালারিতে যাওয়ার জন্য অপেক্ষায় প্রথম ফটকের সামনের দর্শকরা। ছবি: দেশ রূপান্তর

খেলা শুরুর আগ মুহূর্তে স্টেডিয়ামের ফটকের সামনে দর্শকদের ভীড় লক্ষ্য করা যায়। মাত্রাটা অতি না হলেও গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল অবধি সব টিকিট কাউন্টারের ফাঁকা দৃশ্যের পর এটা আশাতীতই। বৃহস্পতিবারের দৃশ্য দেখে উত্তরবঙ্গে সদ্য শেষ হওয়া ‘আকালের’ কথা মনে পড়ে যায়। কার্তিকের সময়ে কৃষকদের হাতে কোনো কাজ থাকে না। তারা তখন ফসলী জমির দিকে তাকিয়ে থাকেন, আর অপেক্ষায় থাকেন নবান্ন উৎসবের। কাজ না থাকলে সংসার চালানোই যে দায়। আর সেটাই হয় কৃষকদের। স্থানীয়রা ঐ সময়টাকে ‘আকাল’ বলে সম্বোধন করে।

মিরপুর স্টেডিয়ামের টিকিট কাউন্টারগুলির ফাঁকা দৃশ্য দেখে কাল এসবই মনে হয়েছিল। তবে আজ সেই জায়গাগুলিতে ভিড় দেখে মনে হয়েছে যেন ‘আকাল’ কেটেছে। ইউসুফদের আগমনে বিপিএলের আঙ্গিনায় ‘নবান্নের’ দেখা মিলেছে।

ইউসুফের পেছনেই দাঁড়িয়েছিলেন আরও একজন। তার নাম মোহাম্মদ ইউনুস আলি। নাম শুনে মনে হতে পারে দুই ভাই। তবে তারা দুজন এসেছেন দুই জায়গা থেকে। ইউনুস রাজধানীর পুরান ঢাকার ইসলামিয়া এলাকার বাসিন্দা। অনাত্মীয় হলেও নামের মতোই সমর্থনেও তাদের একটা মিল আছে। ঢাকার বাসিন্দা হলেও ইউনুস আজ সমর্থন দিচ্ছেন কুমিল্লাকে।

নিজ এলাকাকে কেন নয়? জানতে চাইলে ইউনুস বলেন, ‘আমার প্রিয় খেলোয়াড় লিটন দাস। সে কুমিল্লায় খেলে। তাই আমিও এই দলের সমর্থক।’

তাদের সঙ্গে কথা বলা শেষে এই প্রতিবেদক প্রবেশ করতে যাচ্ছিলেন ফটকের ভেতরে। তখনই চোখ যায় ষাটোর্ধ্ব সফেদ চুল-দাঁড়ির এক দর্শকের দিকে। কাছে গিয়ে জানা গেল নাম তার মুজিবুর রহমান। এসেছেন রাজধানীর ‍গুলশান এলাকা থেকে। বয়স জানালেন ৬৯ বছর। কোন দলকে আজ সমর্থন দেবেন জানতে চাইলে বলেন, ‘কোনো দলকেই সমর্থন করি না। যে ভালো খেলবে, তাকেই সমর্থন দেব।’

৬৯ বছর বয়সী এক ভক্ত এসেছেন খেলা দেখতে।

কথা হয় আরও অনেক সমর্থকের সঙ্গে। তবে সবাই কুমিল্লার সমর্থক। ঢাকাহীন সমর্থকের সঙ্গে আলোচনা শেষে প্রতিবেদক যখন প্রবেশ করছিলেন ১ নম্বর ফটকের তার সঙ্গে কথা বলা শেষে যখন ভেতরে প্রবেশ করেন প্রতিবেদক। তখনই চোখ যায় এক ক্ষুদে ভক্তের দিকে। যার হাতে ছিল দুর্দান্ত ঢাকার পতাকা। নাম তার নিতুন বিশ্বাস। রাজধানীর একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। বাবা আর বড় ভাইয়ের সঙ্গে সে এসেছে খেলা দেখতে।

টুর্নামেন্ট শুরুর আগে খালি চোখে কাগজে-কলমে দুর্বল দল ঢাকা। তবুও কেন এই দল প্রিয় সেটা জানতে চাইলে নিতুনের সোজা-সাপ্টা উত্তর, ‘কারণ আমি ঢাকায় জন্ম গ্রহণ করেছি। আর আমার প্রিয় খেলোয়াড় তাসকিন এই দলে খেলছে। তাই আমি ঢাকাকে সমর্থন দিচ্ছি।’

ঢাকার বাসিন্দা নিতুন ঢাকাকে দিচ্ছে সমর্থন। বিপিএলে যেমন আকাল ছিল। তেমনি টুর্নামেন্ট শুরুর আগে এই ফ্র্যাঞ্চাইজিটির সমর্থন পাওয়া নিয়েও ছিলও তা। তবে নিতুন কিংবা তার ভাই নিপুন বিশ্বাসদের সমর্থনেই যেন দূর হয় সব ‘আকাল’।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত