প্রখ্যাত সাংবাদিক, ছোটগল্পকার ও ঔপন্যাসিক ছিলেন তিনি। কিছুদিন অধ্যাপনাও করেছেন। ১৯৬৯ সালে দৈনিক সংবাদের মাধ্যমে শুরু করেন সাংবাদিকতা। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার সাবেক চেয়ারম্যান এই বরেণ্য সাংবাদিক ভূষিত হয়েছিলেন বাংলা একাডেমি পুরস্কারে। দৈনিক ইত্তেফাকে চতুরঙ্গ কলাম লিখতেন ‘সুহৃদ’ ছদ্মনামে। একুশে পদকে ভূষিত এই সাংবাদিক ও সাহিত্যিক ২০২০ সালের ২৮ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন। অতীতের সঙ্গে অধুনার সংযোগ ঘটাতে ছাপা হচ্ছে তার লেখা উপসম্পাদকীয়
ফসলি জমির ওপর দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করা কেন? ঘটনাটি সম্প্রতি ঘটেছে নারায়ণগঞ্জ জেলার গোপালদি বাজারের কড়ইতলায়। কড়ইতলার পূর্ব মাথা থেকে পশ্চিম মাথা পর্যন্ত বাইশ হাত প্রশস্ত হালট আছে। তারপরও সোজা-সিধা রাস্তা ডাইভার্ট করে কয়েকশ একর ফসলি জমির ওপর দিয়ে রাস্তা নিয়ে যাওয়া হয়েছে। রাস্তা এমন আঁকাবাঁকা করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে যাতে ফসলি জমি নষ্ট হয়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় উদ্দেশ্য একটাই। সেটা হলো যাদের জমি তাদের একটু টিট করা।
এলাকার ক’জন দরিদ্র কৃষক আমাদের ইত্তেফাক অফিসে এসেছিলেন ক’দিন আগে। দেখেই বোঝা যায় জমি হারিয়ে একেবারে ছিন্নমূলের দশা। জিজ্ঞেস করেছিলাম তারা আইনের আশ্রয় নেননি কেন? তারা জানালেন, যারা সমাজে প্রতাপশালী তাদের বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নেওয়া সহজ কথা নয়। তবু তারা আইনের দ্বারস্থ হতেই চেয়েছিলেন। কিন্তু এমনই তাদের দুর্ভাগ্য, সে সময় আইনজীবীদের ধর্মঘটের দরুন কোর্টের কাজকর্ম বন্ধ ছিল। আর এই সময়টায় মওকা পেয়ে ফসলি জমির ওপর দিয়ে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে।
বিষয়টি দুর্ভাগ্যজনক বললেও কম বলা হয়। দরিদ্র কৃষকের ওপর এমনিতেই হাজার বিপর্যয়। তার ওপর রাস্তা তৈরির নামে আঁকাবাঁকা করে রাস্তার ডাইভারশন নিয়ে গিয়ে যদি ফসলের জমি নষ্ট করা হয় তাহলে দুঃখ-দুর্দশার আর সীমা থাকে না। ঘটনাট সংশ্লিষ্ট এলাকায় অত্যন্ত বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে বলে খবর পাওয়া যায়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমরা শুধু এটুকুই নিবেদন করব, যেন তারা এই জবরদস্তি আর অন্যায়ের একটা প্রতিকার করেন। আইনের লক্ষ্য সর্বপ্রযত্নে নির্যাতন ও অন্যায় রোধ করা। নির্যাতন, জবরদস্তি ও অন্যায়ের প্রতিষ্ঠা নয়। ফসলি জমির ওপর এভাবে রাস্তা নির্মাণের দৃষ্টান্ত যদি পাকাপোক্ত হয় তাহলে দেশের অন্যান্য জায়গায়ও এই দৃষ্টান্ত ধরে কৃষকের ফসলি জমি নষ্টের পাঁয়তারা চলতে পারে। কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবেন এই আবেদন রেখে প্রসঙ্গান্তরে যাচ্ছি।
সেদিন রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় বলধা গার্ডেনের দু’জন মালীর সঙ্গে দেখা। বলধা গার্ডেনের আচার্যি বাবু বেঁচে থাকতে বাগানে মাঝে-মধ্যে গাছ-পালা ও নির্জনতার খোঁজে গিয়েছি। সেই সূত্রে ওরা দু’জনই পরিচিত। হাল তবিয়ৎ জিজ্ঞেস করলে ওরা যা জানাল, তাতে দুঃখিত না হয়ে পারলাম না। জানা গেল, কিছু দিন থেকে অল্প বয়সী কিছু ছেলে যখন-তখন বাগানে ঢুকে গাছপালা নষ্ট করছে। মালীরা বাধা দিলে পকেট থেকে কেউ কেউ চাকু বার করে শাসায়। বলে বেশি গোলমাল করলে একদম খতম করে দেওয়া হবে। দু’একদিন ছেলেদের সঙ্গে এ নিয়ে মালীদের বচসা হয়েছে, হাতাহাতিও হয়েছে। মালীদের ভয়, ছেলেরা সবসময় এদিক-ওদিক ঘুরঘুর করছে, যদি তাদের কারুর ওপর চড়াও হয়ে কিছু একটা করে বসে?
মালীরা যা-ই আশঙ্কা করুক, আমার ধারণা অল্প বয়সী এসব ছেলে তারুণ্যের অসংযত উচ্ছ্বাসে একটু বাড়াবাড়ি করলেও বিপজ্জনক কিছু করবে না। এসব ছেলে স্কুল-কলেজের ছাত্র, আমাদেরই মধ্যবিত্ত-নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে। কারু কারু পকেট থেকে চাকু-ছোরা বেরুলেও ওরা আর যা-ই হোক দ্ষ্কুৃতকারীর পর্যায়ে পড়ে না। ওই বয়সের ছেলেদের একটা বাড়তি ভ্যানিটি বা গোঁ থাকে। সেই গোঁর বশবর্তী হয়েই হয়তো কখনো কখনো তাদের আচরণ অসংযত হয়ে পড়েছে। এটা বিপজ্জনক লক্ষণ তো নিশ্চয়ই, তবে বলধা গার্ডেনের ঘটনার মধ্যেই আলাদাভাবে সমস্যাটি দেখলে ঠিক হবে না। এই সমস্যা আমাদের সমাজ জুড়েই ছড়িয়ে আছে। সমস্যাটি সামগ্রিকভাবেই দেখতে হবে। সত্য বটে, এক শ্রেণির কিশোর ও তরুণের মধ্যে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ বেড়ে গেছে। তারা রেলগাড়িতে চড়ে, বাসে চড়ে, কিন্তু টিকিট চাইতে গেলে দলবেঁধে হাঙ্গামা করে। কোথাও কোথাও এই শ্রেণির কিশোর ও তরুণেরা চাঁদার খাতা নিয়ে অফিসে বা দোকানে চড়াও হয়। চাঁদা না দিলে বিপত্তির একশেষ। হালে রাজধানী শহরের গাউছিয়া মার্কেট এবং মালিটোলায় এ নিয়ে বেশ কয়েকবার দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটে গেছে। পুরনো ঢাকার এই ক’দিন যে হাঙ্গামা ও বিশৃঙ্খল অবস্থা, সেখানেও নাকি চাঁদার খাতাই কোন কোন ঘটনার উৎস। এক শ্রেণির কিশোর ও তরুণ আবাসিক এলাকায়ও হৈ-হাঙ্গামা করে উত্তেজনা সৃষ্টি করছে। অভিভাবক মহল শঙ্কিত ও চিন্তিত।
সন্দেহ নেই এই শ্রেণীয় কিশোর ও তরুণের উচ্ছৃঙ্খল আচরণ দিন দিন বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। কোনো কোনো শিক্ষাঙ্গনে কর্তৃপক্ষীয় অফিস তালা মেরে বন্ধ করা, পরীক্ষার হলে ফ্রি নকলবাজির জন্য স্লোগান দেওয়া, প্রতিরোধকারীদের ওপর চড়াও হওয়া এবং ক্ষেত্রবিশেষে বোমাবাজি করা এই উচ্ছৃঙ্খল আচরণেরই অংশ। বহু শিক্ষাঙ্গনেই কর্তৃপক্ষ এ ধরনের উচ্ছৃঙ্খলতার কাছে ভীত-সন্ত্রস্ত ও অসহায়, যে কোনো বিচারে বলা যায়; এক শ্রেণির কিশোর, তরুণ ও শিক্ষার্থীর মধ্যে উচ্ছৃঙ্খল আচরণের এই বহিঃপ্রকাশ সমাজের বিবেক ধরে নাড়া দিয়েছে। অবস্থা এমন যে, নিছক অল্প বয়সী ছেলেপুলেদের কান্ড বলে বিষয়টি উপেক্ষা করা যায় না। বরং বলতে হয়, অবস্থাটি বিষবৃক্ষের রূপ নিতে শুরু করেছে।
কিন্তু অবস্থাটি বিশ্লেষণ করলে বলতেই হয়, এক শ্রেণির কিশোর, তরুণ ও শিক্ষার্থীর অধঃপতনের জন্য সার্বিকভাবে এই দারিদ্র্য উপদ্রুত সমাজের পরিবেশই বহুলাংশে দায়ী। তারুণ্যের ধর্মই আবেগে উচ্ছ্বসিত হওয়া। বয়ঃসন্ধির বয়সে দুনিয়ার সব দেশে, সব সমাজে তরুণ বয়সী ছেলে-মেয়েদের মনের আবেগ ও স্বপ্ন বাস্তবের ক্ষুদ্র গন্ডি অতিক্রম করে যায়। এ সময়ে এই বয়সে তারুণ্যকে যদি আশা ও প্রত্যাশা জোগান যায় তাহলে আর যা-ই হোক তাদের বেপথ হওয়ার ভয় থাকে না। এই বেড়ে ওঠার সময়ে তারুণ্যকে যদি স্বপ্ন ও কর্মের মন্ত্রে দীক্ষিত করে তোলা যায় তাহলে এই তারুণ্যই দেশ-সমাজের বিশাল শক্তি হয়ে দেখা দিতে পারে। আমাদের দরিদ্র সমাজে দুর্ভাগ্য এই যে, আমরা তারুণ্যের এই চাহিদাকে বিবেচনা দিতে জানি না। আমরা তাদের স্বপ্ন ও প্রত্যাশার খোঁজ নিই না। উপরন্তু, শিক্ষাঙ্গনে ‘মাসল ফোর্স’ তৈরির নানা কৌশল, নানা চেষ্টা তৎপরতা উচ্চারণ ও বক্তৃতার আড়ালে বহুদিন থেকে অব্যাহতভাবে চলে আসছে। তরুণদের বেয়াদব আর উচ্ছৃঙ্খল বলেই সমাজপতিরা খালাস। কিন্তু এই বেয়াদবি আর উচ্ছৃঙ্খলতার শিক্ষা তারা কোত্থেকে পায়, কীভাবে পায় সেই বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়ায় কোনো দায়িত্ব সমাজ গ্রহণ করে না। তারুণ্যই সমাজের সবচেয়ে বড় শক্তি। এই শক্তি যাতে উচ্ছৃঙ্খল ও অসংযত আচরণের মধ্যে অপন্ডচয়িত ও নিঃশেষিত না হয় তজ্জন্য অভিভাবকদের অবশ্যই যথোচিত দায়িত্ব পালন করতে হবে। আমাদের সমাজে ছেলেমেয়েদের বখে যাওয়ার পেছনে অভিভাবকদের উদাসীনতা এবং জড়-বুদ্ধিও যে বহুলাংশে দায়ী, এ কথা অস্বীকার করে কী লাভ? তারুণ্যের শক্তিকে আশা, স্বপ্ন ও আদর্শ জোগাতে হলে শিক্ষা-ব্যবস্থাকেও যথোচিতভাবে নির্মাণ করতে হবে। ডিগ্রিসর্বস্ব শিক্ষাব্যবস্থা বহুক্ষেত্রেই তরুণ শক্তির হতাশা ও নৈরাশ্যের মূল। এই সত্য বহুকাল থেকে স্বীকৃত হয়ে আসছে বটে, কিন্তু কর্মভিত্তিক বা ভোকেশনাল শিক্ষাব্যবস্থা এখনো বাস্তবের বহু দূরেই অবস্থান করছে। এটা দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কী?
লেখক: রাহাত খান সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক ১৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৫
