ফেসবুকে ভিডিও দেখে ২৮ বছর পর কেনু মিয়াকে ফিরে পেল পরিবার

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২৪, ০৭:১৭ পিএম

দিন যায়, মাস যায়, যায় বছর। কেনু মিয়াকে ফিরিয়ে নিতে কেউ আসে না। নিজের ও পরিবারের কারো ঠিকানা বলতে পারেন না। শুধু নিজের নাম কেনু মিয়া, বাড়ি কুমিল্লা জেলার চৌদ্ধগ্রাম উপজেলায়, এইটুকু বলে আসছে বছরের পর বছর। ২৮ বছর পর গত শুক্রবার বিকেলে কেনু মিয়াকে তার পরিবারের কাছে তুলে দেন সোনাগাজী উপজেলার চরছান্দিয়া ইউনিয়নের ইসলামপুরের মানুষ।

জানা গেছে, গত ২০০৪ সালে সোনাগাজী উপজেলার চরছান্দিয়া ইউনিয়নের ইসলামপুরে আসে কেনু মিয়া। শুরুতে তার স্থান হয় স্থানীয় এছাক মেম্বারের পুরাতন বাড়িতে। সেখানে ৩ বছর অবস্থানের পর পাশ্র্ববর্তী  পল্লি চিকিৎিসক ওয়াজি উল্যার বাড়িতে থাকেন ৭ বছর। সেই বাড়ি থেকে একই এলাকার সিম্যান জেবল হকের বাড়িতে চলে যায় কেনু মিয়া। পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়া পর্যন্ত ওই বাড়িতে থাকতো সে। মানসিক ভারসাম্যহীন হলেও শান্ত স্বভাবের কেনু মিয়ার সবার কাছে পেতো আদর ভালোবাসা।  গ্রামের সবাই ধরে নিয়ে নিয়েছে কেনু মিয়ার পরিবারের কেউ বেঁচে নেই। পরিবার নিয়ে কেনু মিয়ার ভাবনা নেই। মাঝে মাঝে গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে দুই টাকা ও ভাত খেতে চাইতো। 

গত বুধবার (১৭ জানুয়ারি) সকালে কেনু মিয়া দৈনিক দেশ রূপান্তরের সোনাগাজী প্রতিনিধি আবুল হোসেন রিপনের বাড়িতে গিয়ে ভাত খেতে চাইলে তার সঙ্গে কথোপকথোনে বদলে যায় কেনু মিয়ার জীবন। ভাত খাইয়ে সাংবাদিক রিপন কেনু মিয়াকে সঙ্গে নিয়ে ভিডিও ধারণ করে সোনাগাজীর আলো নামক ফেসবুক পেজে পোস্ট করেন। ওই দৃশ্যে কেনু মিয়াকে মা ও বাড়িতে ফিরে যাওয়ার আকুতি করতে দেখা গেলে মুহুর্তে ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের জন্য হারিয়ে যাওয়ার ২৫ বছর পর পরিবারের কাছে ফিরে যায় কেনু মিয়া।

সোনাগাজী উপজেলার চরছান্দিয়া ইউনিয়নের ইসলামপুরের বাসিন্দারা স্থানীয় সংবাদকর্মী আবুল হোসেন রিপন বলেন, ভিডিওটি পোস্টের পর ওই দিন বিকালে কুমিল্লা জেলার চৌদ্ধগ্রাম উপজেলার কানকোপাত ইউনিয়নের বেলাল নামের সাবেক ইউপি সদস্য ফোন করে ভিডিও কলে কেনু মিয়াকে দেখতে চাই। তার অনুরোধে রাতে কেনু মিয়াকে খুঁজে ভিডিও কলে কথা বলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি, কিন্তু কেনু অসংলগ্ন কথা বলতে থাকে। ওই সময় বেলাল নামে ব্যক্তি জানায়, যাকে আপনারা কেনু মিয়া বলে চিনেন সেটা তার আসল নাম না, তার নাম কাজি মাহবুব, সম্পর্কে সে আমার চাচা হয়। পরদিন বেলাল ফের ভিডিও কলে ফোন করে বৃদ্ধা নারী ও মধ্যবয়সি পুরুষকে সামনে এনে নিশ্চিত করেন, সোনাগাজীতে কেনু মিয়া পরিচয়ে বসবাস ব্যক্তি ২৫ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া তাদের স্বজন কাজি মাহবুব। ওই নারী নিজেকে কেন মিয়ার মা ও পুরুষ ভাই বলে পরিচয় দেন। ওই সময় তারা সোনাগাজীতে এসে কেনু মিয়াকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে আকুতি জানায়।

তিনি আরও বলেন, কেনু মিয়াকে নিয়ে যেতে সোনাগাজীতে আসার বিষয়ে গ্রামবাসীকে অবহিত করলে তারা সায় দেয়। পরে আমি ঘটনাটি সোনাগাজী মডেল থানার ওসি সুদ্বিপ রায় রায় পলা কে অবহিত করলে তিনি ঠিকানা যাচাই করে সব ঠিকঠাক থাকলে কেনু মিয়াকে পরিবারের কাছে তুলে দিতে সম্মতি প্রদান করেন।

এদিকে কেনু মিয়াকে তার ভাই নিতে আসবে খবর জানাজানি হলে ইসলামপুরসহ আশপাশের এলাকার মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা তৈরির হয়। স্থানীয়রা জানায়, শুক্রবার দুপুরে কাজি বেলাল ও কাজি বাবুল নামে দুই ব্যক্তি সোনাগাজীতে এসে সিম্যান জেবল হকদের বাড়িতে যায়। যেখানে কেনু গত ১০ বছর ধরে বসবাস করছে। তাদের একজন কেনু মিয়ার ভাই ও অপরজন চাচা পরিচয় দেন।

স্থানীয় সাইফুল ইসলাম জানায়, কেনু মিয়া গত ১০ বছর ধরে আমাদের বাড়িতে বসবাস করছে, পাগল হলেও সে আমাদের পরিবারের সদস্যের মতো ছিল। ভাই ও চাচাকে কাছে পেয়ে একে অপরকে জড়িয়ে কাঁদতে থাকলে উপস্থিত মানুষের মধ্যে আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়।

কাজি বাবুল বলেন, যাকে এই এরাকার মানুষ কেনু মিয়া হিসেবে চিনে তার আসল নাম কাজি মাহবুব, সে আমার বড় ভাই। আমাদের বাড়ি কুমিল্লা জেলার চৌদ্ধগ্রাম উপজেলার কনকাপৈত ইউনিয়নের পাঠানপাড়া গ্রামে, আমাদের বাবার নাম কাজি ইউনুস ও মায়ের নাম মনোয়ারা। আমার ভাই কাজি মাহবুব ১৯৯৪ সালে মানসিকভাবে অসুস্থ্য হয়ে পড়ে, আমরা চিকিৎসা করালেও কোন উন্নতি হয়নি। পরে ৯৬ সালের মার্চ মাসে হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায়। তারপর আমরা বহু খোঁজাখুজি করেও তারা সন্ধান পাইনি, আমরা ধরে নিয়েছি সে মারা গেছে। সাংবাদিক ভাইয়ের ভিডিও দেখে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না আমার ভাই জীবিত আছে, পরে সোনাগাজীতে এসে ভাইকে দেখে বুঝতে পারলাম আমার ভাই এখনো জীবিত আছে। ভাইয়ের হারিয়ে যাওয়ার শোকে বাবা মারা গেছে, মা সবসময় আল্লার কাছে প্রার্থনা করতো মৃত্যুর আগে যেন ভাইকে দেখার সুযোগ হয়।

কাজি বেলাল বলেন, এই পৃথিবীতে কেউ কারো দায়িত্ব নিতে চাই না। একটা পাগলকে আশ্রয় দিয়ে, খাইয়ে পরিয়ে ভালো রাখার জন্য গ্রামের সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি এবং একই সঙ্গে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

সিম্যান জেবল হক বাড়ির বাসিন্দা আকবর হোসেন বাকুল বলেন, পরিচয় নিশ্চিত মহওয়ার পর আমরা কেনু মিয়াকে তার ভাই ও চাচার হাতে তুলে দিলে তারা তাকে বাড়িতে নিয়ে যায়। চলে যাওয়ার সময় তাকে বেশ হাসিখুশি দেখো গেছে। কেনু মিয়া নিয়ে যাওয়ার সময় এলাকায় কয়েকশ মানুষ উপস্থি ছিলেন। এলাকার অনেক নারী পুরুষকে এসময় কাঁদতে দেখা য়ায়, দীর্ঘদিন অবস্থানের কারনে তার প্রতি সবার মায়া জন্মেছে।

এদিকে শনিবার বিকালে মোবাইল ফোনে কথা হয় কাজি বাবুলের সঙ্গ। তিনি বলেন আমাদের এলাকার শত শত লোক ভাইকে দেখতে আসতেছে। ভাই এখন খুব বেশি কথা বলছে না। তবে মনে হয় সবাইকে আস্তে আস্তে চিনতে পারবে। মানসিক কিছু সমস্যা আছে বলে মনে হচ্ছে। যে কারণে ডাক্তার দেখাবো বলে আমরা চিন্তা করছি। আমার বৃদ্ধ মা ভাইকে পেয়ে খুব খুশি। আমরা চিন্তাও করতে পারিনি এত বছর পর ভাইকে ফিরে পাবো। ফেসবুকের কারণেই আমরা তাকে খুঁজে পেলাম। সবাই আমাদেরকে অনেক সহযোগিতা করেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত