নিম্ন আয়ের পরিবারের কিশোররা অপরাধে জড়াচ্ছে বেশি

  • মোহাম্মদপুরে বেশি উৎপাত
  • কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যে বেড়েছে গণছিনতাই
আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০২৪, ০৯:১৬ এএম

গণছিনতাইয়ের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা কিশোর গ্যাং। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, রায়েরবাজার ও আদাবর এলাকায় তাদের উৎপাত বেশি দেখা যাচ্ছে।

এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার এইচএম আজিমুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় টোকাই রয়েছে, ভবঘুরে ও নিম্ন আয়ের মানুষ রয়েছে, বস্তি আছে এবং অনেক এলাকা খালি রয়েছে। যে কারণে দেখা যায় এখানে এ ধরনের অপরাধ হচ্ছে।

উপকমিশনার এইচএম আজিমুল হক বলেন, ‘কোনো ঘটনা ঘটলে আমরা লুকাই না। সেগুলোকে আমরা গ্রেপ্তার করি এবং মামলা দিই। কিন্তু দেখা যায় জামিনে বের হয়ে এসে আবার তারা এ ধরনের কাজ করে।’

গত ২৪ ডিসেম্বর রায়েরবাজার এলাকায় সাত-আটজন তরুণ-কিশোর পথে যাকে পেয়েছে, তার কাছ থেকেই মানিব্যাগ, মোবাইল ছিনিয়ে নিয়েছে। সাইকেল চালিয়ে আসা ব্যক্তির গতিরোধ করে সাইকেলও ছিনিয়ে নিয়েছিল তারা। এর ঠিক পাঁচ দিন আগে ১৯ ডিসেম্বর মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ থেকে চাঁদ উদ্যান হাউজিং এলাকার সড়কে দেশীয় ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে সামনে যাকে পেয়েছে তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে সব। এর আগে ২৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় বসিলা গার্ডেন সিটি এলাকায় একই কায়দায় গণছিনতাইয়ের শিকার হয় পথচারী ও রাস্তার পাশের অন্তত ২০টি দোকান।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন জাতীয় নির্বাচনে নিরাপত্তা নিয়ে ব্যস্ত, তখন মোহাম্মদপুর এলাকায় এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। যদিও পুলিশ বলছে, ঘটনার পরপরই তারা অভিযান চালিয়ে অনেককে গ্রেপ্তার করেছে।

স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, মোহাম্মদপুর এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের একাধিক গ্রুপ রয়েছে। এরা প্রায় সবাই মাদকাসক্ত। মাদককের টাকা জোগাড় করতে প্রায় প্রতিদিনই দল বেঁধে ছিনতাই করে থাকে। তবে বড় ঘটনা হলেই তা জানাজানি হয়। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় থাকে। পুলিশ মাঝেমধ্যে অভিযান চালালেও মূল হোতারা আড়ালেই থাকে।

২০১৭ সালে উত্তরায় স্কুলছাত্র আদনান হত্যাকান্ডের মাধ্যমে কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি আলোচনায় আসে। সেসময় চাঞ্চলকর এই হত্যাকান্ডের মূল হোতাসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করে র‌্যাব। পরে উত্তরা, গাজীপুরসহ কয়েকটি এলাকায় স্কুলছাত্র শুভসহ আরও কয়েকটি হত্যাকান্ড ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।

র‌্যাব জানায়, ২০১৭ সাল থেকে র‌্যাব গত বছরের শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন অপরাধে কিশোর গ্যাংয়ের ১ হাজার ১২৬ জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের মধ্যে ৪০ জনকে জরিমানা ও মুচলেকা নিয়ে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালে র‌্যাবের অভিযানে কিশোর গ্যাংয়ের বিভিন্ন গ্রুপের ৩৪৯ জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক খন্দকার আল মঈন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০১৭ সালে স্কুলছাত্র আদনান হত্যাকান্ডের মাধ্যমে কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়টি সামনে আসে। বিশ্বের পশ্চিমা দেশগুলোতে গ্যাং ও কিশোর গ্যাংয়ের অস্তিত্ব দীর্ঘদিনের। বাংলাদেশের কিশোররা বিদেশি এই গ্যাং কালচার রপ্ত করে কয়েক দশক আগে। ধীরে ধীরে কিশোর গ্যাং সদস্যরা সন্ত্রাসী হয়ে ওঠে। গ্যাংয়ে-গ্যাংয়ে দ্বন্দ্ব, অন্তর্কোন্দল, চাঁদাবাজি, এলাকার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও মাদক সিন্ডিকেটে জড়িয়ে পড়ে। শুরুতেই ঢাকাকেন্দ্রিক থাকলেও পরে দেশের বিভিন্ন বিভাগ ও জেলা শহরেও ছড়িয়ে পড়ে গ্যাং কালচার।

গত ১৩ অক্টোবর মোহাম্মদপুর এলাকায় ছিনতায়ের প্রস্তুতিকালে রমজান আলী ও স্বপন নামে কিশোর গ্যাংয়ের দুই সদস্যকে চাপাতি, ছুরিসহ গ্রেপ্তার করেছিল ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)।

ডিবির তেজগাঁও বিভাগের মোহাম্মদপুর জোনাল টিমের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি) মো. আনিচ উদ্দীন সেসময় বলেছিলেন, গ্রেপ্তারকৃতরা কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য এবং তারা দীর্ঘদিন ধরে মোহাম্মদপুর ও আদাবর থানা এলাকায় ছিনতাই করে আসছিল।

গত ২৮ নভেম্বর র‌্যাব-২ রাজধানীর মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল এলাকায় অভিযান চালিয়ে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে ১২ জন এবং র‌্যাব-২-এর আরেকটি দল ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাইয়ের প্রস্তুতিকালে ১২ জনকে গ্রেপ্তার করে। তারা সবাই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য।

পুলিশের এক কর্মকর্তা কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে অক্টোবর মাসে একটি সেমিনারে বলেছেন, বাংলাদেশে ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত কিশোর গ্যাংবিষয়ক ৩২৫টি মামলা হয়েছে। মামলাসূত্রে ১১০টি গ্যাংকে শনাক্ত করা গেছে, যাদের সদস্যসংখ্যা প্রায় ১ হাজার। ওই সময়ে ঢাকা মহানগর এলাকায় প্রায় ৫৪টি কিশোর গ্যাংয়ের সন্ধান পাওয়া গেছে। এগুলোর সদস্যসংখ্যা প্রায় ৭১০।

ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ২৩৫টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ অনেক ভুক্তভোগীই হয়রানির আশঙ্কায় মামলা করেন না। দেখা গেছে, ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে বেশি, যেখানে মামলার সংখ্যা প্রায় ৮৪টি।

ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপকমিশনার ফারুক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা সাধারণত দেখা যায় মাদকসেবন ও ছিনতাই করে থাকে। কোনো ঘটনা ঘটলে বা অভিযোগ পেলে কিংবা গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের গ্রেপ্তার করে থাকে। তিনি মনে করেন, আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি সামাজিকভাবে উদ্যোগ নিলে কিশোর গ্যাংয়ের অধরাধ অনেক কমে আসবে।

র‌্যাবের পরিচালক খন্দকার আল মঈন বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ প্রতিরোধে র‌্যাব লিফলেট বিতরণ, বিলবোর্ড, স্টিকার স্থাপন, টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন প্রচার ও বিভিন্ন প্রিন্ট মিডিয়ায় ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে। এ ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধীদের বিরুদ্ধে র‌্যাবের গোয়েন্দা নজরদারি ও জোরালো অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত