সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষায় ওয়াজের ভূমিকা রয়েছে

আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০২৪, ১২:২৯ পিএম

দেশবরেণ্য আলেম ও মুফাসসিরে কোরআন মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী। উত্তরা গাউসুল আজম মসজিদের খতিব ও মারকাযুত তারবিয়াহ বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। এ ছাড়া বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে সুনামের সঙ্গে দেশ-বিদেশে পবিত্র কোরআনের তাফসির করছেন। সম্প্রতি ওয়াজ মাহফিলের নানা বিষয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে তার মতামত ব্যক্ত করেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুফতি এনায়েতুল্লাহ

দেশ রূপান্তর : আদর্শ দাঈর গুণাবলি কেমন হবে?

মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী : দাওয়াত শব্দের অর্থ আহ্বান। পরিভাষায় মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান করাকে দাওয়াত বলে। যে ব্যক্তি এই মহতি কাজ করেন, তাকে দাঈ বলা হয়। দাঈ শব্দের অর্থ প্রচারক। দাঈকে ইলম ও আমলওয়ালা হতে হবে। সেই সঙ্গে নিজের দুর্বলতাগুলো উপলব্ধি করার মতো মেজাজ থাকা। এটা মনে করতে হবে, আমি দুর্বল। কোনো দাঈ যদি নিজেকে সবল মনে করেন, তার ভেতরে মুরব্বিদের মানার যোগ্যতা না থাকে; পূর্ববর্তী আলেমদের দাওয়াতি রীতি-নীতির প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা না থাকে তাহলে সে প্রকৃত দাঈ নয়, এমন দাঈ দ্বারা সমাজের কল্যাণ ও দ্বীনের প্রচার আশা করা যায় না। তাদের দ্বারা অকল্যাণ হওয়া স্বাভাবিক।

দেশ রূপান্তর : সাধারণ মানুষের কাছে ওয়াজের প্রভাব কতটুকু?

মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী : সাধারণ মানুষের ওপর ওয়াজের প্রভাব ব্যাপক রয়েছে। এর মাধ্যমে বহু মানুষের আমল-আকিদা দুরস্ত হয়। মানুষ দাওয়াত ও তাবলিগে যাওয়ার উৎসাহ পায়, হাক্কানি আলেম ও পীর-বুজুর্গদের সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ পায়। ওয়াজের ব্যাপকতার কারণে যুব সমাজের চরিত্র বিধ্বংসী বিভিন্ন অপসংস্কৃতিমূলক অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। এটাকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই, ওয়াজ অপ্রয়োজনীয় কোনো বিষয় নয়। সমাজে চলমান নানাবিধ বিশৃঙ্খলা দূরীকরণের ওয়াজ সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখছে। এটা অস্বীকারের কোনো সুযোগ নেই।

দেশ রূপান্তর : পূর্ববর্তী আলেমরা সুর দিয়ে বয়ান করেছেন, সুর ছাড়াও করেছেন। ইদানীং বয়ানে সুর ইত্যাদি নিয়ে বিভিন্ন কথাবার্তা চলছে, বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী : অবশ্যই সুর ছাড়া আকর্ষণীয় কথা বলা সম্ভব। আবার সুর না দিয়েও দামি কথা বলা যায়। কিন্তু সবাই তো এটা পছন্দ করে না। কেউ আছে সুর পছন্দ করে। উভয় প্রকারের শ্রোতা থাকে মাহফিলে। আর সুর দোষের কিছু নয়। সুরের প্রতিযোগিতা পূর্ববর্তী আলেমরা করেছেন। আরবি, উর্দু ও ফার্সি শের-আশআরের (কবিতা) প্রতিযোগিতা, কেরাত প্রতিযোগিতা করেছেন। হামদ, নাত শুনেছেন। এসব তো সুর দিয়েই হয়। তবে সুর নকল করতে গিয়ে সুরকে গানের সুরের মতো বানিয়ে ফেলা অথবা সুরকে যদি আসল বানিয়ে ফেলা হয়- এটা অবশ্যই নিন্দনীয়।

দেশ রূপান্তর : দর্শক-শ্রোতা ও আয়োজকরা এখন ভাইরাল বক্তা দাওয়াতের প্রতি বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে।

মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী : নানা কারণে মানুষ ভাইরাল বক্তা তালাশ করতে পারে। এটা মাঠে-ময়দানের আয়োজন, আর মাঠ পর্যায়ের আয়োজনে যাকে দাওয়াত করলে মানুষ জড়ো হয়, তাকে চাওয়া অন্যায় নয়, অযৌক্তিকও নয়। মুরুব্বি আলেমদের অনেকে আছেন, যাদের আলোচনা শোনার জন্য আলেম-উলামা, মাদ্রাসার ছাত্ররা যায়। আবার কিছু বক্তা আছেন, যাদের কথা শোনার জন্য সাধারণ মানুষ ভিড় করেন। অনেক সাধারণ মানুষ বিদআতি কিংবা ওলামায়ে দেওবন্দের আকিদার সঙ্গে যাদের মিল নাই এমন বক্তার ভক্ত হয়ে- বয়ান শুনতে যান। যারা ওয়াজ শোনার জন্য যান, তাদের হৃদয়ে যদি কিছু কথা গেঁথে যায়, চলার পথ পরিবর্তন করে সঠিক পথে চলার চেষ্টা করেন। সেটা তো মন্দ নয়। সুতরাং সাধারণ মানুষ যাদের পছন্দ করেন, আপনি একেবারে তাদের বাদ দিয়ে কোনো উন্মুক্ত প্রোগ্রাম করবেন- এটা হবে না।

দেশ রূপান্তর : অনেক সময় বক্তারা পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিতে গিয়ে বাড়াবাড়ি করে ফেলেন, এটা কি সঠিক?

মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী : ওয়াজের মঞ্চ কিন্তু ব্যক্তিগত সুবিধা-অসুবিধা কথা বলার জায়গা নয়। সুতরাং এখানে পরস্পরবিরোধী কথা বলার সুযোগ নেই। হ্যাঁ, কথা হতে পারে কোনো বক্তার ভুল কিংবা অশুদ্ধ কথা ও তথ্যের জবাবে প্রসঙ্গক্রমে কিছু বলা নিয়ে। তবে এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করা একেবারেই ঠিক নয়। তবে কোনো অভিভাবক ও মুরব্বি শ্রেণির কোনো আলেম যদি কারও সংশোধনের নিয়তে এসব করেন, সেটা নিয়ে কোনো কথা নেই। আমাদের অনেক ত্রুটি, ত্রুটির ব্যাপকতার কারণে অনেক সময় মুরব্বিদের সংশোধনকে ধারণ করতে পারি না; এটা আমাদের দুর্বলতা। মুরব্বিরা যদি কখনো কোনো উঠতি বা উদীয়মান তরুণ বক্তাকে কোনো পরামর্শ দেন, কোনো বিষয়ে সংশাধনের কথা বলেন- তা মানতে হবে। মুরব্বিরা যে যোগ্যতা ও দূরদর্শিতা দিয়ে দেখেন, সেটা আমি-আপনি দেখি না, তার যে দূরদর্শিতা এটা আমার-আপনার নেই। কোনো মুরব্বি যদি আমাকে কোনো দিকনির্দেশনা দেন অবশ্য অবশ্যই সেটা মহব্বত। ওই বিষয়গুলো মেনে নেওয়াটাও মহব্বত। তারা রাগ হতে পারেন, আমি যদি রাগ করি- তাহলে সেটা আর মহব্বত রইল না। তবে ইখতিলাফি (বিতর্কিত) ও কাউকে সংশোধনের যে বিষয়গুলো আছে, সেগুলো যেন সুন্দর ভাবে হয়। যেটা হজরত মুসা (আ.)-কে আল্লাহতায়ালা শিখিয়ে দিয়েছিলেন। নরম নরম মিষ্টি মিষ্টি কথার মাধ্যমে দুশমনকে নসিহত করা। তারপরও স্মরণ রাখা, ইখতিলাফি বিষয় আলোচনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পড়াশোনা করে নেওয়া। বিশেষ করে আদাবুল ইখতিলাফসহ এ জাতীয় গ্রন্থ মোতালায়া (অধ্যয়ন) করে নেওয়া।

আমাদের মতভেদ, পারস্পরিক ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা-ভক্তির কমতি আছে, এগুলো যেন ফুটে না ওঠে। তাই আমাদের উচিত মুরব্বিদের যেকোনো ধরনের শাসন, নসিহতগুলো বিনাবাক্যে মেনে নেওয়া।

দেশ রূপান্তর : আলোচকদের নানা উপাধি ও আল্লামা শব্দ ব্যবহার নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে কথা হচ্ছে, খেয়াল করেছেন?

মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী : দেখুন, আমি নিজে যেহেতু আলোচক। প্রায়ই আমার নামের আগে পরে অনেক উপাধি দেওয়া হয়। অনেকে মনে করে, এসব উপাধি আমার দেওয়া। অথচ আমি ভিজিটিং কার্ড পর্যন্ত ব্যবহার করি না। কোনো প্রতিষ্ঠান নাম কীভাবে লিখবে, এ বিষয়ে কোনো গাইডলাইন দেওয়া হয় না। আমি বিভিন্ন সময় ওয়াজে, এমনকি একাধিক সাক্ষাৎকারেও বলেছি, মাত্রাতিরিক্তি ভক্তি দেখিয়ে অযৌক্তিক উপাধি না দিতে। সাহাবায়ে কেরাম নিজের নাম কীভাবে লিখেছেন, হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ও হজরত ওমর (রা.) নামের সিলমোহর কীভাবে বানিয়েছিলেন, এটার ওপর আমি আলাদা আলোচনাও করেছি। এগুলো মাথায় রাখা। তবে মুরব্বি, সত্যিকারের জ্ঞানী-গবেষক, চিন্তক ও আমলওয়ালা আলেম ছাড়া কারও জন্য আল্লামা ব্যবহার করা উচিত নয়।

দেশ রূপান্তর : বক্তাদের হাদিয়ার বিষয়ে...।

মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী : এ প্রশ্নটা আমি নিলাম না। তবে প্রসঙ্গক্রমে বলি, ১৯৯৮ সাল থেকে আমি নিয়মিত আলোচক। সেই থেকে এখন পর্যন্ত কোনোদিন অগ্রিম টাকা নিইনি। এটা নেওয়ার প্রশ্নই আসে না। তবে যাতায়াতের খরচ এক জিনিস, আর অগ্রিম টাকা নেওয়া আরেক জিনিস। যদি এমন হয়, পূর্ণ টাকা কিংবা আংশিক টাকা অগ্রিম নিয়ে- পরে প্রোগ্রামে যাব- তাহলে সেটা ঘৃণিত কাজ। যেটা আমাদের পূর্ববর্তী কোনো আলেম করেননি। তারা এসব বিষয়ে অনেক কঠোর ছিলেন। হজরত থানভি (রহ.)-এর এ বিষয়ে যে হেদায়েতগুলো আছে, সেগুলোকে অনুসরণ করা যেতে পারে।

মাহফিলের হাদিয়ার জন্য চুক্তি করা এবং অগ্রিম টাকা নিয়ে মাহফিলে যাওয়া, পূর্ববর্তী আলেমদের রীতিবিরুদ্ধ কাজ। যারা এসব কাজ ইচ্ছা করে করেন, তারা কখনোই সত্যিকারের ইসলাম প্রচারক (দাঈ ইল্লাল্লাহ) হতে পারেন না।

দেশ রূপান্তর : মাহফিল আয়োজকদের কোন কোন বিষয়ে খেয়াল রাখা উচিত?

মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী : একসময় ওয়াজ-নসিহতে বক্তা চয়ন করা হতো স্থানীয় ওলামায়ে কেরামের সমর্থনে। এলাকার বড় হুজুর যাকে পছন্দ করে দিতেন, তাকে সবাই দাওয়াত দিত। এখন খালি ঘরে বসে ইউটিউবে একটা বক্তব্য ছেড়ে দিল, সেও দাওয়াত পায়। কারণ ওয়াজের মাঠে ৫০ থেকে ৬০ ভাগ মাহফিল এমন হয়, যেগুলোর সংগঠক ও আয়োজকরা এগুলোই পছন্দ করেন। আমি মনে করি, বক্তা নির্বাচনের ক্ষেত্রে এমন চয়ন পদ্ধতির সংস্কার দরকার।

দেশ রূপান্তর : তাহলে বক্তা বাছাইয়ের পদ্ধতি কী হবে?

মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী : এটা যেহেতু ধর্মীয় কাজ। ধর্মীয় কাজে সমাদৃত বিজ্ঞ আলেমদের মাধ্যমেই হতে হবে। মাহফিলের আয়োজকরা স্থানীয় বড় আলেমদের মুরব্বি মেনে মাহফিলের আয়োজন করবে। এভাবে মুরব্বি দেখে যদি মাহফিলের ব্যবস্থাপনাসহ মেহমান দাওয়াত দেওয়ার কাজ সম্পাদন করা হয়, তাহলে সেটা উত্তম। এমন ওয়াজ দ্বারা সমাজের মানুষের ভেতরে ভালো প্রভাব পড়বে।

মনে রাখবেন, যারা দলিলভিত্তিক কথা বলেন, সমাজের জন্য ভেবে প্রয়োজনীয় বিষয়ে আলোচনা করেন, উত্তম চরিত্রের কথা বলেন, সুন্দর নিয়তে সুন্দর তরিকায় সুন্দর কথাগুলো সুন্দর পন্থায় মানুষের সামনে উপস্থাপন করেন, তারাই সত্যিকারের বক্তা। তাদের মাধ্যমে আল্লাহ দ্বীনের কাজ নেবেন। এর বাইরে, ওয়াজের মাঠে এসে, নাম-যশ কামানো যাবে ঠিক; কিন্তু সে বয়ানের ময়দানে টিকে থাকবে না- হারিয়ে যাবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত