শিক্ষাব্যবস্থায় নিজস্ব সংস্কৃতির সঠিক সংযোগ

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২৪, ১২:১৬ পিএম

শিক্ষা ও সংস্কৃতির মধ্যে প্রবল শক্তিশালী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বিদ্যমান থাকায় এদের যাত্রা হতে হয় যুগপৎ। উভয়ের গতি এবং গন্তব্য হতে হয় নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। মানব সমাজে স্থান, কাল, আবহাওয়া, জনগোষ্ঠী, ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে শিক্ষা ও সংস্কৃতির ভিন্ন ধারার জন্ম হয়। সে জন্য পাশ্চাত্যের অসংখ্য আচারকে প্রাচ্যে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়; একইভাবে প্রাচ্যের সংস্কৃতির অনেক কিছুই পাশ্চাত্যে বাহুল্য বিবেচিত হয়। মূলত দেশ, জাতি ভেদে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতায় যে পার্থক্য সৃষ্টি হয় সেটির ভিত্তিতেই সাংস্কৃতিক পার্থক্য গড়ে ওঠে। শিক্ষা হলো সংস্কৃতির একটি অংশমাত্র। তাই যে কোনো জাতির সাংস্কৃতিক পালাবদলের সরাসরি প্রভাব পড়ে শিক্ষায়। আরও স্পষ্ট করে বললে সেই দেশ ও জাতির শিক্ষা দর্শনে।

জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান এবং সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর সংজ্ঞা অনুসারে সংস্কৃতি হচ্ছে কোনো জাতি বা গোষ্ঠীর স্বতন্ত্র আধ্যাত্মিক, বস্তুগত, বৌদ্ধিক এবং মানসিক সেট। সংস্থার মতে সংস্কৃতি কেবল শিল্প ও সাহিত্যের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয় বরং মানুষের জীবনধারা, একত্রে জীবনযাপনের নানা উপায়, সামাজিক মূল্যবোধ, জাতিগত ঐতিহ্য এবং নানান বিষয়ে নাগরিকের যৌক্তিক বিশ্বাসকেও অন্তর্ভুক্ত করে। অন্যদিকে ইউনেস্কো শিক্ষাকে শেখার সুবিধা বা জ্ঞান, দক্ষতা অর্জন, মূল্যবোধ সৃষ্টির উপায়, বিজ্ঞানসম্মত অভ্যাস অর্জনের প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেছে। আধুনিক যুগে তাই প্রায় সব সচেতন ও উন্নত রাষ্ট্রই শিক্ষা ও সংস্কৃতির যুগপৎ গতিপথ নিশ্চিত করতে সচেষ্ট হচ্ছে।

স্বাভাবিক অবস্থায় যে কোনো দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে পাঠ করলে তাদের সংস্কৃতির ব্যাপারে খুব ভালো বোঝাপড়া অর্জন করা যায়। তাই কোনো দেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশের ধারার মধ্যে পার্থক্য দৃষ্টিগোচর হলে সেখানে ব্যতিক্রমী অথবা অস্বাভাবিক কিছু ঘটার আশঙ্কা থাকে। সংস্কৃতি যেহেতু নাগরিকের প্রাত্যহিক আচরণের অংশ, তাই শিক্ষার ওপর সমাজের প্রভাব থাকে সুস্পষ্ট। কোনো দেশে গণতন্ত্র ও বাক স্বাধীনতা জারি থাকলে সেই দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় স্বাধীনতা, সাম্য, মুক্তচিন্তা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, মানবিক মূল্যবোধ অধিক গুরুত্ব পায়। অন্যদিকে রাজতন্ত্রনির্ভর দেশের শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রে থাকে স্তুতিমূলক চিন্তা-চেতনার প্রতিফলন। এসব দেশের পাঠ্যবই ইতিহাস, অর্থনীতি, বিজ্ঞানের বিকাশের ধারার সঙ্গে পরিশীলিত হয় না; বরং পুরনোকে আঁকড়ে ধরার একটা তীব্র প্রবণতা থাকে। তবে এই সংকট সবচেয়ে তীব্র হয় একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায়। এসব দেশ একদিকে নিজেরা নতুন মূল্যবোধের জন্ম দিতে অক্ষম, আবার অন্যদিকে বিদেশি ঐতিহ্যকে সঠিকভাবে নাগরিকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে ব্যর্থ হয়।

শিক্ষা দর্শনে মূল্যবোধের গুরুত্ব অত্যধিক। প্রাচীন ভারতের বৈদিক শিক্ষাব্যবস্থার ওপর দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়, সে সময় পার্থিব জীবনের তুলনায় আধ্যাত্মিকতার ওপর অধিক গুরুত্ব দেওয়া হতো। শুরুর দিনগুলোতে বৈদিক শিক্ষাব্যবস্থায় পাঠদান ছিল একেবারেই গুরুকেন্দ্রিক। তখন গুরু তার শিষ্যদের শ্রুতি পদ্ধতিতে পাঠদান করতেন। শিষ্যরা তা গভীর অভিনিবেশে স্মৃতিতে ধারণ করতেন।। শ্রুতির অবশ্য তিনটি ধাপ ছিল শ্রবণ, চিন্তন এবং প্রণিধান। বৈদিক শিক্ষায় শিক্ষকরা বেদে বর্ণিত বিষয়গুলো গল্পের ছলে উপস্থাপন করতেন এবং শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলাপের মাধ্যমে তাদের চিন্তা-চেতনা বুঝে উঠতে চেষ্টা করতেন। এই পদ্ধতিতে যারা অগ্রগামী শিক্ষার্থী ছিলেন, তাদের ওপর অপেক্ষাকৃত দুর্বল সহপাঠীদের পড়ানোর দায়িত্ব পড়ত, একে বলা হতো পড়ো-সরদার পদ্ধতি।

প্রাচীন আমলে ভারতীয় উপমহাদেশে অনেকগুলো বিহার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বিহার শব্দের অর্থ হলো বিশ্ববিদ্যালয়। বৌদ্ধদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত সর্ববৃহৎ বিহারের নাম নালন্দা মহাবিহার বা নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়। পঞ্চম খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত নালন্দা মহাবিহার ছিল প্রাচীন আমলে নির্মিত একটি উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়। তৎকালীন ক্ষমতাসীনরা নিশ্চিতভাবেই শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন এবং তারা সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন; ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়েছিলেন। বৌদ্ধ শাসনের যুগে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সোমপুর মহাবিহার, জগদ্দল মহাবিহার, শালবন বিহার ইত্যাদি। বৈদিক শিক্ষায় ধর্মীয় নৈতিকতার প্রভাব থাকলে সেখানে গণিত, বিজ্ঞান, জ্যোতিষশাস্ত্র, ভাষা, চিকিৎসাশাস্ত্র, শিল্পকলা ইত্যাদি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে পড়ানো হতো। উপমহাদেশে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে এখানে আরবি ও ফার্সি ভাষার প্রভাব বাড়তে থাকে। ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থায় ইসলাম ধর্ম সংশ্লিষ্ট অনেক আচরণ জায়গা করে নেয়। সেই আমলে প্রণীত মাদ্রাসা শিক্ষায় হিন্দুদেরও আরবি-ফার্সি শেখার সুযোগ ছিল। ভারতে মুসলিম শাসনামলে আরবি ও ফার্সি ভাষায় উন্নত জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা ছিল, বিশেষত চিকিৎসাবিজ্ঞানের।

পর্তুগিজ নাবিক ও বণিকদের হাত ধরে ইউরোপীয়দের ভারতে আসার দিনগুলোতে খ্রিস্টান মিশনারির মাধ্যমে উপমহাদেশে ইউরোপীয় শিক্ষা, ধর্ম, সংস্কৃতি এবং দর্শনের প্রবেশ ঘটে। পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ আমলে ইংরেজির প্রভাব পড়ে আমাদের শিক্ষায়। সেই সময় খাদ্যাভ্যাস, পোশাক থেকে শুরু করে ইউরোপিয়ান সংস্কৃতির অসংখ্য উপাদান আমাদের প্রাত্যহিক জীবনযাপনের অংশ হয়ে ওঠে। আমাদের ভাষা, বিজ্ঞান, গণিত শিক্ষায় পর্তুগিজ, ডাচ, ফরাসি, ইংরেজ প্রভৃতি জাতির অবদান ও প্রভাব অনস্বীকার্য। ইউরোপীয় ভাষা, জ্ঞান, মূল্যবোধ, সভ্যতা, অর্থনীতি, রাজনীতি, দর্শন, আধুনিক  চিকিৎসাবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রভৃতি ধীরে ধীরে ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় স্থান পায়। ফলে উপমহাদেশীয় শিক্ষিত শ্রেণির পক্ষে ভারতের বাইরেও লেখাপড়া, কর্মসংস্থান, বসবাসের একটা নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়।

আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় একজন শিশু শিক্ষার্থীর দ্বারা পুরনো জ্ঞানের বহুবিধ চর্চার চেয়ে নতুন জ্ঞান সৃষ্টির পদ্ধতি শেখানো হয়। এজন্য শুরুতেই একজন শিশুর অসীম সৃজনক্ষমতাকে স্বীকার করা হয়। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক স্যামুয়েল বেঞ্জামিন ব্লুম জীববিজ্ঞানের শ্রেণিবিভাজন প্রকাশক ট্যাক্সোনমিকে শিক্ষা বিজ্ঞানে শিখনের পর্যায় ব্যাখ্যা করতে ব্যবহার করেছেন। ছয়টি ধাপে তিনি শিখন পদ্ধতির ধারার কৌশলগত বিশ্লেষণ করেছেন। জ্ঞান (নলেজ), অনুধাবন (কম্প্রিহেনশন), প্রয়োগ (অ্যাপ্লিকেশন), বিশ্লেষণ (অ্যানালাইসিস), সংশ্লেষণ (সিনথেসিস) এবং মূল্যায়ন (ইভাল্যুয়েশন)। ইউরোপীয়, উত্তর আমেরিকান কিংবা পূর্ব-এশিয়ান দেশের শিক্ষাব্যবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে তারা যাপিত জীবনের বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে সংযুক্ত করে তোলে। ফলে শিক্ষার্থী নিজের অভিজ্ঞতা থেকে যেমন শিখতে পারে তেমনি বিদ্যালয়ে শেখা বিষয়ের সঙ্গে নিজের যাপিত জীবনের সাযুজ্য খুঁজে পায়, যা শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহকে যেমন বাড়তে দেয়, তেমনি জীবননির্ভর হওয়ার এই শিক্ষণের স্থায়িত্ব হয় দীর্ঘস্থায়ী ও কার্যকরী।

শিক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সেটি মানবিক হচ্ছে কি-না তা নিশ্চিত করা। গ্রিক, জাপানি কিংবা উপমহাদেশীয় শিক্ষায় ধর্ম, নৈতিকতা, মানবিকতার গুরুত্ব বেশি থাকায় এই অঞ্চলের মানুষের মনোভাব, আচরণ, সামাজিক আচার, ভাষা অনেক বেশি কোমল ও মানবিক। অন্যদিকে পৃথিবীর যে সব দেশের শিক্ষায় বস্তুগত অর্জন, ব্যক্তিস্বার্থ, পার্থিব জীবনকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয় সেই জাতির মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ, লোভ, দুর্নীতি, কপট আচরণের প্রবণতা বেশি থাকে।

বাংলাদেশ সরকার জাতীয় শিক্ষাক্রম-২০২১ এর ওপর নির্ভর করে দেশপ্রেমী, উৎপাদনমুখী, অভিযোজন-সক্ষম সুখী ও বৈশ্বিক নাগরিক সমাজ গড়ে তোলার মাধ্যমে যে স্বপ্ন দেখছে তা প্রশংসনীয়। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় নিজস্ব সংস্কৃতির সঠিক সংযোগ না ঘটিয়ে নতুন শিক্ষাক্রম প্রণীত হয়েছে। একই ভুল হয়েছিল জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ এর ক্ষেত্রেও। বিদেশি শিক্ষাব্যবস্থাকে অনুকরণ করে প্রণীত সেই শিক্ষানীতি সফল হয়নি।

এটা ঠিক যে ফিনল্যান্ড, জাপান, সুইডেন, ব্রিটেন, দক্ষিণ কোরিয়া, পর্তুগাল, ফ্রান্স কিংবা ভারত প্রত্যেক দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ভিনদেশি শিক্ষা উপাদান খুঁজে পাওয়া যায়। তবে রাষ্ট্রগুলোর প্রত্যেকেই নিজস্ব ভাষা, ঐতিহ্য, আচার, কৃষ্টি, সামাজিক রীতির সঙ্গে ব্যাপক পার্থক্য নির্দেশক কোনো উপাদান হঠাৎ করে তাদের কারিকুলামে যুক্ত করে না। রাতারাতি তাদের শিক্ষানীতিতে কৌশলগত পরিবর্তন করে শিক্ষার্থীদের গিনিপিগ বানায় না। বরং সামাজিক পরিবর্তনের স্বাভাবিক ধারাকে বিবেচনায় নিয়ে অত্যন্ত ধীরে নতুন শিক্ষণ পদ্ধতিকে পরিচিত করে তোলে। ফলে রাষ্ট্রের ও নাগরিকের মধ্যকার সম্পর্কে অবিশ্বাস জন্ম নেয় না। বরং শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিষয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল, যৌক্তিক ও সচেতন আচরণে অভিভাবক সমাজ নিশ্চিন্ত থাকতে পারে।

বাংলাদেশে সরকারি কর্মপরিকল্পনায় নাগরিকের মতামত প্রদানের ক্ষেত্র দিন দিন সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। জনগণের সঙ্গে সরকারের সিদ্ধান্তগ্রহণকারী মহলের সুস্পষ্ট দূরত্ব লক্ষণীয় রয়েছে। বাংলাদেশে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সবচেয়ে ক্ষমতাবান গোষ্ঠী হলো আমলাতন্ত্র। তারা আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, নাগরিকের মনন, নৈতিকতার ভিত্তি, আর্থিক সক্ষমতা, দৃষ্টিভঙ্গি প্রভৃতির প্রতি প্রকৃতার্থে শ্রদ্ধাশীল নয়। বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষাক্রম-২০২১ এই বিষয়টি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। মোদ্দাকথা হলো, নতুন শিক্ষাক্রমে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির সঙ্গে সংযোগ স্বল্পতার কারণে একদিকে সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে। শিক্ষার্থীদের বিপুল অংশকে আরও বিদেশমুখী করবে। অপেক্ষাকৃত ধনিক শ্রেণি তাদের সন্তানকে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে পাঠাতে আগ্রহী হবে।

লেখক: গবেষক, নোভা ইউনিভার্সিটি অব লিসবন, পর্তুগাল

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত