কিছুদিন ধরেই ক্রিকেটে সরব একটি বিষয়, ‘টেস্ট ক্রিকেটের মৃত্যু’। নামজাদা কিংবদন্তি, তারকা ও বিশ্লেষকরা একে একে এ বিষয়ে তাদের মতামত তুলে ধরেন। স্টিভ ওয়াহ থেকে শুরু করে হাল আমলের জেসন হোল্ডার পর্যন্ত সবার কণ্ঠেই ঘুরে ফিরে একটি বিষয় উঠে আসে- যেভাবে চলছে তাতে টেস্ট ক্রিকেটের মৃত্যু আসন্ন। কেউ আবার নিজের মতো করে এ পরিণতি রোধের সমাধানও বাতলে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
এতোসবের ভিড়ে ২৮ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখটি টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় একটি দিন হয়ে থাকবে। দুটি নাম লেখা থাকবে সেই গাঁথায়। প্রথমটি শামার জোসেফ, আর দ্বিতীয়টি টম হার্টলি।
২৭ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জয়ের উচ্ছ্বাসে ভাসে উইন্ডিজ। শ্বাসরোধ করা উত্তেজনা ছড়িয়ে আট রানের ব্যবধানে ‘মাইটি অস্ট্রেলিয়া’কে পরাজিত করে উইন্ডিজদের আনকোরা একটি টেস্ট দল। অশ্রুসিক্ত হতে বাধ্য হন কিংবদন্তি ব্রায়ান লারা, কার্ল হুপার, ইয়ন বিশপসহ ক্রিকেট ভালোবাসা সমর্থকেরাও।
গায়ানার রাজধানী জর্জটাউন থেকে ২২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীপথ পেরিয়ে প্রত্যন্ত গ্রাম বারাকারা থেকে উঠে আসা এক নৈশপ্রহরী শামার জোসেফ ক্যারিবীয়দের এনে দেন এ উদযাপনের উপলক্ষ্য। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিংয়ের সময় ইয়র্কার বল পায়ের আঙ্গুলে আঘাত হানলে রক্তাক্ত হয়ে মাঠ ছেড়েছিলেন শামার। চোট এতোটাই গুরুতর ছিল যে এদিন মাঠে নামার কথাই ছিল না তার।
ব্যথানাশক ইনজেকশন নিয়ে মাঠে নেমে যখন বল নেন ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ অজিদের হাতে। জাফর ইকবালের সায়েন্স ফিকশন ‘নিঃসঙ্গ গ্রহচারী’র নায়কের মতো বিরূপ পরিস্থিতিতে শতভাগ আবেগ নিয়ে লড়ে যান যোদ্ধা শামার। আর প্রকৃতি সবসময় বীরদের সঙ্গেই থাকে। সাত উইকেট নিয়ে একাই জিতিয়ে আনেন নিজের দলকে।
শামারের চোখধাঁধানো বোলিংয়ের স্তুতি গাইতে গিয়ে ইয়ান বিশপ বলেন, ‘ডানপায়ে চোট নিয়ে অসাধারণ সাহসী ও শীর্ষ মানের বোলিং করার জন্য তরুণ শামার জোসেফকে ধন্যবাদ জানাই। তুমি যা অর্জন করেছ এবং ভবিষ্যতেও যা করে যাবে, সব কিছুর কৃতিত্ব তোমার এবং তোমার প্রিয়জনদের।’
ভারতের কিংবদন্তি শচিন টেন্ডুলকার শামার প্রসঙ্গে নিয়ে বলেন, ‘শামার জোসেফের ৭ উইকেট নেওয়ার অসাধারণ স্পেলটি টেস্ট ক্রিকেটের নিখুঁত দৃঢ়তা এবং নাটকীয়তাকে তুলে ধরে। এটি এমন একটি সংস্করণ যা কোনো খেলোয়াড়ের সামর্থ্যকে চ্যালেঞ্জ করে। ২৭ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ঐতিহাসিক জয়ের মূল স্থপতি সে।’
ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক কেভিন পিটারসেন তার এক্স পোস্টে আবেগ প্রকাশ করেন এভাবে, ‘ওয়াও, ওয়াও, ওয়াও! টেস্ট ক্রিকেটে, তুমি একেবারে নিখুঁত সৌন্দর্য।’ সঙ্গে ভালোবাসার ইমোজি জুড়ে দেন।
এবি ডি ভিলিয়ার্স তো আরও এক কাঠি এগিয়ে। তিনি ব্রিসবেনের এই উপাখ্যানের নাম দিয়েছেন, ‘দা শামার জোসেফ ফেইরিটেল!’
ব্রিসবেন থেকে ভারতের হায়দরাবাদ; ৯ হাজার ৪৪৩ কিলোমিটার পাড়ি দিতে রিমোটের একটি বোতাম চাপাই যথেষ্ট। শামার রূপকথা শেষ হলেও তখনো বাকি টেস্টের ইতিহাসময় দিনটির আরও একটি জ্বলজ্বল করা অধ্যায়ের। যেখানে ইংলিশ ব্যাটার ওলি পোপের মহাকাব্যিক ১৯৬ রানের ইনিংসটি ম্লান হয়ে যাওয়ার কথা ভারতের মাটিতে আরও একটি টেস্ট পরাজয়ের নিচে চাপা পড়ে। সেখান থেকেই সব আলো নিজের দিকে কেড়ে নেন এ ম্যাচেই টেস্ট অভিষেক হওয়া এক অখ্যাত বাঁহাতি স্পিনার টম হার্টলি।
২৩১ রানের লক্ষ্য তাড়ায় নামা ভারতকে ঘূর্ণিবিষে খাবি খাইয়ে তিনি আটকে রাখেন ২০২ রানে। তাতে ২৮ রানের যে জয়ে মাতে ইংল্যান্ড তা অধিনায়ক বেন স্টোকসের ভাষায়, ‘নিঃসন্দেহে সেরা জয়’। হার্টলি শিকার করেন শামারের মতোই সাত উইকেট।
১৯৩৩ সালের পর ইংলিশ স্পিনারদের মধ্যে অভিষেক টেস্টে সেরা নৈপুণ্য দেখান হার্টলি। ৬২ রানে ৭ উইকেট। শামারের মতো হার্টলির বেড়ে ওঠার গল্প চোখের পানি ফেলার মতো না হলেও। টেস্ট ক্রিকেটের মৃত্যুর ক্ষণ গোণার সময়ে দাঁড়িয়ে একই দিনে দুটি ভিন্ন মঞ্চে ক্রিকেট বিশ্ব দেখার সৌভাগ্য অর্জন করে টেস্ট ক্রিকেটের প্রকৃত সৌন্দর্য।
টেস্টকে ক্রিকেটের সবচেয়ে বনেদি সংস্করণ কেন বলা হয় সেই প্রশ্নের উত্তর নিজেদের নৈপুণ্য দিয়েই লিখে রেখে গেলেন শামার জোসেফ, ওলি পোপ ও টম হার্টলিরা।
