জাতীয় পার্টিতে নতুন বাঁক

আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০২৪, ০৮:৪০ এএম

নির্বাচনের পর জাতীয় পার্টিতে শুরু হয়েছিল অভিযোগ-বিক্ষোভের পালা। এর ধারাবাহিকতায় বহিষ্কার ও স্বেচ্ছায় পদত্যাগের ঘটনাও দেখা গেছে। এর ধারাবাহিকতায় এবার আবার শীর্ষ দুই নেতাকে বহিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছেন দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক বেগম রওশন এরশাদ। বহিষ্কৃত ও পদত্যাগকারীদের সঙ্গে আলোচনার পর গতকাল রবিবার এ ঘোষণা এলো।

দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদেরকে অব্যাহতি দিয়ে রওশন এরশাদ নিজেকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করেছেন। আর মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুকে অব্যাহতি দিয়ে দল থেকে বহিষ্কৃত প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী মামুনুর রশীদকে মহাসচিবের দায়িত্ব দিয়েছেন তিনি। সম্মেলনের আগপর্যন্ত তারা দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানিয়েছেন।

স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ হলেন এরশাদের স্ত্রী। চেয়ারম্যান জিএম কাদের হলেন এরশাদের ছোট ভাই। এর আগেও জিএম কাদেরকে একাধিকবার অব্যাহতি দিয়েছিলেন রওশন এরশাদ। একই সঙ্গে নিজে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেসব সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছিল গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতির মাধ্যমে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় রওশন অনুসারী নেতারা তাকে দলের চেয়ারম্যান ঘোষণা দিয়েছেন। জিএম কাদের অনুসারী নেতারা তার পাল্টা জবাব দিয়েছেন।

রওশন এরশাদ দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদেরকে বহিষ্কার করার এখতিয়ার রাখেন কি না তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু। রওশন এরশাদ জাপার দুই শীর্ষ নেতাকে অব্যাহতির ঘোষণা দেওয়ার পর এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

জাপার মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু গতকালই দলের বনানী কার্যালয়ে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, যিনি অব্যাহতি দিয়েছেন তিনি দলের কেউ নন। বহিরাগতদের কথা আমাদের কানে যায়নি। রওশন এরশাদকে সম্মান জানিয়ে আলংকারিক পদ দেওয়া হয়েছে। এর বেশি কিছু নয়।’

দলীয় কাউন্সিল ও কার্যালয়ের বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘এই বহিরাগতরা মূর্খ। তাই গঠনতন্ত্র না জেনে এমন করেছে। আর দলের কাউন্সিল বা কার্যালয়ের বিষয়ে তাদের অধিকার নেই।’

রাতে আবার যোগাযোগ করা হলে চুন্নু দেশ রূপান্তরকে বলেন, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী রওশন এরশাদ কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার রাখেন না। চেয়ারম্যান জিএম কাদের প্রয়োজন মনে করলে তার পরামর্শ নিতে পারেন, কিন্তু তিনি বাধ্য নন।

তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনেও আমাদের গঠনতন্ত্র রয়েছে। এরপর কে বা কারা আরেকটা গঠনতন্ত্র বানিয়ে অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। আমরা রওশন এরশাদের ঘোষণাকে পাত্তা দিচ্ছি না, জাপায় জিএম কাদেরই একক নেতা।’ দল ভেঙে গেল কি না এমন প্রশ্নে চুন্নু বলেন, ‘তাদের পাশে কারা আছে, খবর নেন। তাদের কয়জনের রাজনীতিতে অবদান আছে, অর্জন আছে। তাদের গ্রহণযোগ্যতা নেই।’

গতকাল রওশনের ডাকা সভামঞ্চে ছিলেন সম্প্রতি অব্যাহতি পাওয়া প্রেসিডিয়াম সদস্য সাইফুল ইসলাম সেন্টু, সুনীল শুভরায়, ভাইস চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম পাঠান, সাবেক সংসদ সদস্য ইয়াহিয়া চৌধুরী।

গত ২৫ জানুয়ারি জিএম কাদের ও মুজিবুল হক চুন্নুর নেতৃত্বে অনাস্থা জানিয়ে ঢাকা মহানগরের ১০ থানার ৬৭১ জন নেতা পদত্যাগ করেছেন।

কিন্তু নির্বাচনের পর থেকে চেয়ারম্যান ও মহাসচিবের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া দলের কো-চেয়ারম্যান আবু হোসেন বাবলা, অতিরিক্ত মহাসচিব লিয়াকত হোসেন খোকা, প্রেসিডিয়াম মেম্বার সাইফুদ্দীন আহমেদ মিলনকে দেখা যায়নি। এমনকি এ সভায় উপস্থিত ছিলেন না দল থেকে অব্যাহতি পাওয়া কো-চেয়ারম্যান কাজী ফিরোজও।

জিএম কাদের ও রওশন অনুসারীরা আলাদা আলাদা দুটি গঠনতন্ত্র তৈরি করে রেখেছেন এবং নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী গঠনতন্ত্রের ক্ষমতা প্রয়োগ করার চেষ্টা করেন। যদিও নির্বাচন কমিশনে জাতীয় পার্টি থেকে যে গঠনতন্ত্র গৃহীত হয়েছে, তাতে জিএম কাদেরকে সর্বময় ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। রওশন এরশাদ গঠনতন্ত্রের ২০/১ ধারার ক্ষমতাবলে জিএম কাদেরকে চেয়ারম্যান পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার কথা বলেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জিএম কাদের ও রওশন অনুসারীরা আলাদা দুটি সংবিধান তৈরি করলেও তার একটা ধারা ছাড়া সবকিছুই একই। উভয় গঠনতন্ত্রই জাপার বহিষ্কৃত মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা কর্তৃক গৃহীত ও প্রকাশিত। রওশন অনুসারীদের হাতে যে গঠনতন্ত্র রয়েছে সেখানে একটি ধারায় বলা হয়েছে, দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষকই দলের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী।

রওশন এরশাদ জিএম কাদের ও মুজিবুল হককে চেয়ারম্যান ও মহাসচিব পদ থেকে অব্যাহতি দিলেও দল থেকে বহিষ্কার করেননি।

সাইফুদ্দীন আহমেদ মিলন বলেন, ‘আমরা কখনো আন্দোলনে চেয়ারম্যান-মহাসচিবের অব্যাহতি চাইনি। আমরা আমাদের ক্ষোভের কথা দলের দুই সর্বোচ্চ নেতাকে জানাতে চেয়েছি। আমরা জিএম কাদেরের সঙ্গেই আছি।’

এরশাদের জীবদ্দশাতেই চার ভাগে বিভক্ত হয়েছে জাপা।

২০১৯ সালের ১৪ জুলাই এরশাদের মৃত্যুর পর থেকে রওশন-জিএম কাদের দ্বন্দ্ব চলছে। দলের চেয়ারম্যান পদ নিয়ে প্রথম বিরোধ শুরু হয়। এরশাদের মৃত্যুর চার দিন পর জিএম কাদেরকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন দলের মহাসচিব। প্রায় দুই মাস পর রওশনকে পাল্টা চেয়ারম্যান করা হয়। এর মধ্যে বিরোধীদলীয় নেতা কে হবেন সে বিষয়ে সংসদের স্পিকারকে চিঠি দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত রওশনকে বিরোধী দল নেতা করে চেয়ারম্যান পদে থাকেন জিএম কাদের। ২০২২ সালের আগস্টে রওশন থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় দলের সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করেন। পরদিন স্পিকারকে আবার চিঠি দিয়ে রওশনকে বিরোধী দল নেতার পদ থেকে সরিয়ে দিতে চিঠি দেন জিএম কাদেরপন্থিরা। গত বছর জিএম কাদেরের ভারত সফরের সময় রওশন এরশাদ নিজেকে জাপা চেয়ারম্যান ঘোষণা করে গণমাধ্যমে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দেন। পরদিন তিনি তা অস্বীকার করেন। এরপর দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে আবার রওশন ও জিএম কাদের অনুসারীদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। সেই বিরোধের জের ধরে নির্বাচনের বাইরে থাকেন রওশন এরশাদ ও তার ছেলে রাহাগীর আল মাহী সাদ এরশাদসহ অনুসারীরা। তবে এসব বিরোধেও দলের ভাঙন ধরার গুঞ্জন উঠলেও ভাঙেনি। এখন আবার একই গুঞ্জন উঠেছে।

রওশন অনুসারীর এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, আজ থেকে জাপার কাকরাইল কার্যালয় হবে প্রাণকেন্দ্র। বর্তমানে দলটির কর্মকান্ড পরিচালিত হয় চেয়ারম্যানের বনানী কার্যালয় থেকে। রওশনপন্থিরা এখন আলাদা হয়ে কাকরাইল কার্যালয়ে যাবেন। ওই নেতা জানান, ইতিমধ্যে সদ্য দায়িত্ব পাওয়া মহাসচিব মামুনুর রশীদ জেলা ও আঞ্চলিক পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছেন। তাদের লক্ষ্য নির্বাচনকেন্দ্রিক ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে যত বেশিসংখ্যক নেতাকর্মীকে দলে ভেড়ানো।

জাপা ভেঙে যাবে কি না এমন প্রশ্নে অব্যাহতি পাওয়া প্রেসিডিয়াম সদস্য সুনীল শুভরায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি তা মনে করি না। আজ থেকে জাপা রওশন এরশাদের নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনায় চলবে। এখন নেতাকর্মীদের পরীক্ষা দিতে হবে যারা এরশাদের আদর্শে বিশ্বাস করে তারা রওশনের নেতৃত্বে চলবে। আর কেউ যদি জিএম কাদেরের নেতৃত্ব মানতে চায়, তাহলে সে তাই করবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত