পশ্চিম তীরের জেনিনে হাসপাতালে চিকিৎসাকর্মীর ছদ্মবেশে ঢুকে তিন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরায়েল। গাজায়ও বেসামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত রয়েছে। গত শুক্রবার আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) নির্দেশনার পর অব্যাহত রয়েছে ইসরায়েলি নৃশংসতা। গাজার মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছানো নির্বিঘ্ন করতেও তাৎপর্যপূর্ণ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি তেল আবিব। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক সংবাদের বিশ্লেষণী ওয়েবসাইট ‘মিডলইস্টআই’ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে, ইসরায়েল গাজার মানবিক সংকট বাড়িয়ে তুলতে ভূমিকা রাখছে যা প্রতিষ্ঠিত; কিন্তু গাজা সীমান্তবর্তী মিসর যে ফিলিস্তিনিদের খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রী পরিবহনে শুরু থেকে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে, তা কি নজরে এসেছে আরব বিশ্বের কিংবা বিশ্ববাসীর?
আইসিজের নির্দেশনাকে হাতিয়ার করেই মিসরকে এই ইস্যুতে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে মিডলইস্টআই। গত শুক্রবারের ঘোষণায় আইসিজে গণহত্যাজনিত কর্মকান্ড ঠেকাতে ইসরায়েলকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়। দক্ষিণ আফ্রিকার করা এ মামলার শুনানিতে ইসরায়েলের পক্ষের প্রতিনিধি দাবি করে, ‘গাজায় প্রবেশের একমাত্র পথ মিসরের নিয়ন্ত্রণে।’ অর্থাৎ ইসরায়েল বোঝাতে চেয়েছে, মিসরের উন্মুক্ত সীমান্তপথ দিয়ে সহায়তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে তেল আবিবের কোনো বাধাই নেই।
ইসরায়েলি অবরোধে থাকা গাজার একমাত্র উন্মুক্ত সীমান্ত মিসরের সিনাই উপদ্বীপের সঙ্গে। সিনাই থেকে রাফাহ ক্রসিং হয়ে সহায়তা পৌঁছায় গাজায়। এ সীমান্তে ইসরায়েলি সেনাদের নজরদারিও নেই। ইসরায়েলের দিক থেকে ওই দাবির পর মিসরে বেশ ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
গত ৯ অক্টোবর ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় গাজায় পূর্ণ অবরোধ আরোপ করে। ইসরায়েলের চাপে রাফাহ ক্রসিং মিসর বন্ধ করে দেয়। এ ছাড়া সহায়তার যাবতীয় চালান ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষকে পর্যবেক্ষণের অনুমোদন দেয়। গাজায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কোনো সমন্বয় করেনি মিসর।
মানবিক সংকট তীব্র হওয়ার কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রাইসি গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক লাহিব হিগেল বলেন, ‘মূল কারণটি হচ্ছে, ইসরায়েলের পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়া জটিল বিষয় এবং দ্বৈত ব্যবহারের যোগ্য দ্রব্যকে গাজায় প্রবেশের অযোগ্য ঘোষণা করে ইসরায়েল।’ তিনি জানান, যেমন ধাতব পণ্য (অস্ত্রের মতো ব্যবহৃত হওয়ার শঙ্কা) প্রবেশ করতে দেয় না ইসরায়েল। ডেবোরাহ হ্যারিংটন নামের এক ব্রিটিশ চিকিৎসক জানান, ইসরায়েলের এ কর্মকান্ড প্রহসন; কারণ তারা শিশুদের ডায়াপার পর্যন্ত ঢুকতে দেয়নি ইসরায়েলি প্রশাসন।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ফিলিস্তিনি-মিসরীয় আন্দোলনকর্মী রামি শাথ মনে করেন, গাজায় সংকটে ‘মিসর ১০০ শতাংশ জড়িত’। মিসরের নাগরিকত্ব ত্যাগ করা এ ব্যক্তির দাবি, ২০১৩ সালের পর থেকে মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির প্রশাসন গাজায় ‘ইসরায়েলের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ’ তৈরির পথ প্রশস্ত করে দিয়েছে।
এ আন্দোলনকর্মীর ভাষ্য, ‘মিসর এবং ইসরায়েলের প্রতি এর আত্মসমর্পণ তেল আবিবকে শক্তিশালী করেছে। রাফাহ একমাত্র উন্মুক্ত সীমান্ত। এটি দেখিয়ে ইসরায়েল বলার সুযোগ পায়, আমরা গাজা অবরোধ করিনি। কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে, মিসর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করে ইসরায়েল।’
বিশ্লেষকরা মনে করেন, গাজা প্রশ্নে মিসরীয় প্রশাসনের অবস্থানের ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ করা যায় সিসি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে। মোহাম্মদ মুরসিকে উৎখাত করে ক্ষমতায় আসা সিসি ধারাবাহিকভাবে গাজা নীতিতে বদল এনেছেন।
আদালতে বক্তব্য উপস্থাপনের সময় ইসরায়েল বলে, ‘ইসরায়েল, মিসর, যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ মিলে প্রতিদিন যৌথ তৎপরতা চালায়, একই সঙ্গে কাজের সময় সহায়তা পৌঁছানোর সরঞ্জাম জটিলতা দেখা যায়।’ বিশ্লেষকরা এ বক্তব্য থেকে বলছেন, এর দ্বারা বোঝা যায়, মিসর গাজার মানবিক সংকট মোকাবিলার বিষয়ে অক্ষম নয়; বরং অনাগ্রহী।
