চ্যালেঞ্জ জেতার যাত্রা শুরু

আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০২৪, ০৮:২৫ এএম

রেকর্ডসংখ্যক স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য নিয়ে গঠিত ব্যতিক্রমী দ্বাদশ জাতীয় সংসদের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার শুরু হওয়া এ সংসদে স্বতন্ত্র সদস্যের চেয়ে বিরোধী দলের সদস্য যে কম সেটা আবার মনে করিয়ে দিয়েছেন বিরোধী দল নেতা।

অধিবেশন শুরুর প্রথম দিনেই বিরোধী দল নেতা জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের (জিএম কাদের) এ নিয়ে বলেছেন, সংখ্যার দিক থেকে এই সংসদ ভারসাম্যপূর্ণ হয়নি। এ সংসদে সম্পূর্ণ জাতিকে খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে।

এর আগে বেলা ৩টার দিকে অধিবেশন শুরু হয়। একাদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার আবারও একই পদে প্রার্থী হওয়ায় ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকুর সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। ডেপুটি স্পিকারের শুভেচ্ছা বক্তব্য শেষে দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী স্পিকার ও ডেপুটি পদে নির্বাচন হয়। আগের সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার আবারও তাদের নিজেদের পদে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন।

স্পিকার পদে ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর নাম প্রস্তাব করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। প্রস্তাবটি সমর্থন করেন সংসদের প্রধান হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী লিটন। এরপর সংসদে কণ্ঠ ভোটে সর্বসম্মতিতে তা পাস হয়। এরপর অধিবেশন কিছু সময়ের জন্য মুলতবি করা হয়।

সংসদ ভবনে রাষ্ট্রপতির দপ্তরে টানা চতুর্থবার নির্বাচিত স্পিকারকে শপথ পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। শপথ গ্রহণ শেষে সংসদ অধিবেশন পরিচালনায় আসেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। এরপর ডেপুটি স্পিকার পদে নির্বাচন হয়। এ পদে পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য শামসুল হক টুকুর নাম প্রস্তাব করেন সরকারদলীয় সংসদ সদস্য এবি তাজুল ইসলাম ও সমর্থন করেন মকবুল হোসেন। প্রস্তাবটি ভোটে দিলে সংসদ সদস্যরা ‘হ্যাঁ’ বলে সমর্থন জানান। দ্বিতীয়বার নির্বাচিত ডেপুটি স্পিকারকে শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।

টানা চতুর্থবার স্পিকার নির্বাচিত হওয়ায় সরকার ও বিরোধীদলীয় সদস্যরা সংসদ অধিবেশনে আলোচনার মাধ্যমে শিরীন শারমিনকে আনুষ্ঠানিক ধন্যবাদ জানান।

সংসদের প্রথম অধিবেশন ঘিরে পুরো সংসদ ভবন নবীন-প্রবীণ সংসদ সদস্যদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে। ৩০০ আসনের মধ্যে ২২৩ আসনে বিজয়ী হয়ে টানা চতুর্থবারের মতো সরকারি দলের আসনে বসে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। আর সংসদীয় ইতিহাসে এবারই প্রথম রেকর্ডসংখ্যক ৬২ জন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য দ্বাদশ সংসদে বসেছে।

অধিবেশনে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকার ও বিরোধী দলের অধিকাংশ সদস্য উপস্থিত ছিলেন। নতুন সংসদের প্রথম দিনের অধিবেশনে প্রধান বিচারপতি, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাসসহ দেশ-বিদেশি কূটনীতি, রাজনৈতিক নেতা, সরকারি কর্মকর্তা এবং ভিআইপিদের আত্মীয়স্বজনসহ পাঁচ শতাধিক অতিথি উপস্থিত ছিলেন। উদ্বোধনী অধিবেশনে ভিআইপি ও দর্শনার্থী গ্যালারি ছিল পরিপূর্ণ। রাষ্ট্রপতির ভাষণের পর সংসদের অধিবেশন আগামী রবিবার পর্যন্ত মুলতবি করা হয়।

সভাপতিমন্ডলী মনোনয়ন : ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন শেষে নিয়ম অনুযায়ী পাঁচ সদস্যের সভাপতিমন্ডলী মনোনয়ন দেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। তারা হলেন এবি তাজুল ইসলাম, শাহাবউদ্দিন, আ ফ ম রুহুল হক, হাফিজ উদ্দিন আহম্মেদ ও উম্মে কুলসুম। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে নামের অগ্রবর্তিতা অনুসারে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যরা বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন।

শোক প্রস্তাব উত্থাপন : এরপর শোক প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী শোক প্রস্তাবটি পেশ করেন। কুয়েতের আমির শেখ নাওয়াফ আল আহমদ আল জাবের আল সাবাহর ছাড়াও সাবেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সাবেক সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী জিনাতুন নেসা তালুকদার, সাবেক সংসদ সদস্য ড. মো. আকরাম হোসেন চৌধুরীসহ বিভিন্ন স্তরের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করা হয়।

অধিবেশন কক্ষের চিত্র : ঘিয়ে রঙের জমিনে বেগুনি আঁচল ও পাড়ের জামদানি শাড়ি পরে দুপুর ২টা ৫০ মিনিটের দিকে সংসদ অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় সিটে বসার আগে প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে জড়ো হন সংসদ সদস্যরা (এমপি)। সেখানে সরকারদলীয় এমপিদের চেয়েও স্বতন্ত্র এমপিদের অংশগ্রহণ বেশি দেখা গেছে। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সালাম ও কুশলবিনিময় করেন তারা। কয়েকজন এমপিকে দেখা যায় প্রধানমন্ত্রীকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে। প্রধানমন্ত্রীর সামনে দাঁড়িয়ে স্যালুট ও কুশলবিনিময় করেন কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম। নির্বাচনের আগে বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে এমপি নির্বাচিত হওয়া শাহজাহান ওমরও কুশলবিনিময় করেন। জাতীয় পার্টির দুই-একজন এমপিকেও প্রধানমন্ত্রীকে সালাম দিতে দেখা যায়।

মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা সবাই একদিকে : দ্বাদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশন কক্ষে সদস্যদের আসন বিন্যাসে বড় ধরনের পরিবর্তন আসেনি; তবে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা সবাই একদিকে বসেছেন। আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা যারা এবার মন্ত্রী হননি, তারা আগের মতো সামনের সারিতেই বসেছেন। আর মন্ত্রীরা প্রধানমন্ত্রীর পেছনের সারিতে, তার পেছনে বসেছেন প্রতিমন্ত্রীরা।

এমপিদের সেলফি : চলতি সংসদে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন শতাধিক এমপি। প্রথম অধিবেশনে যোগ দিয়ে তারা সেলফিতে মেতে ওঠেন। পাশাপাশি এক এমপি আরেক এমপির ছবি তুলে দেন। কেউ কেউ একপাশে দাঁড়িয়ে পুরো অধিবেশন কক্ষের ছবি তোলেন। বেলা ৩টায় অধিবেশন থাকলেও দুপুর ২টা ৩০ মিনিট থেকে অধিবেশন কক্ষে আসতে শুরু করেন এমপিরা। প্রথমে তারা নিজেদের আসন খুঁজে নেন। এরপরই মেতে ওঠেন ছবি তুলতে। পরে একাধিক এমপিকে ফেসবুকে সংসদ অধিবেশন কক্ষে তোলা সেলফি ও ছবি আপলোড করতে দেখা যায়।

প্রধানমন্ত্রীর চিরকুট : অধিবেশনের শুরুর দিকে স্পিকার নির্বাচন করা হয়। এরপরই শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ডা. দীপু মনি। এরপরই বক্তব্য দিতে শেখ ফজলুল করিম সেলিমকে ফ্লোর দিলে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য আবদুল লতিফ সিদ্দিকী হাত তোলেন। স্পিকার ইশারায় তাকে বসার অনুরোধ জানিয়ে শেখ সেলিমকে ফ্লোর দেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাতের ইশারায় লতিফ সিদ্দিকীকে বসার অনুরোধ জানান। পরে বিরোধীদলীয় নেতা জিএম কাদেরকে বক্তব্য দেওয়ার জন্য ফ্লোর দেন স্পিকার। তখন আবারও দাঁড়িয়ে বক্তব্য রাখার জন্য হাত তোলেন লতিফ সিদ্দিকী। সেবারও তাকে বসার অনুরোধ জানান স্পিকার। এরপর প্রধানমন্ত্রী কাগজে একটি চিরকুট লিখে পাঠান লতিফ সিদ্দিকীর কাছে। তাতে কী লেখা ছিল তা জানা না গেলেও এরপরই আর বক্তব্য রাখার জন্য দাঁড়াননি স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচিত এমপি লতিফ সিদ্দিকী।

ফেরদৌস ফটোগ্রাফার হয়ে গেলেন : এবারের সংসদে প্রথমবারের মতো এমপি নির্বাচিত হয়েছেন ‘হঠাৎ বৃষ্টি’খ্যাত চলচ্চিত্র নায়ক ফেরদৌস আহমেদ। অধিবেশন কক্ষে আসার পর থেকেই তাকে বেশ উচ্ছল দেখা গেছে। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও এমপির সঙ্গে কুশল ও শুভেচ্ছা বিনিময় করেন তিনি। পাশাপাশি অধিবেশন কক্ষের পাশে থাকা ভিভিআইপি গ্যালারিতে থাকা অতিথিদের সঙ্গেও শুভেচ্ছা বিনিময় করতে দেখা যায়। একপর্যায়ে অধিবেশন কক্ষে পেছনের সারিতে থাকা এক এমপিকে নিজের মোবাইল হাতে দিয়ে তাকে ছবি তুলে দেওয়ার অনুরোধ জানান। ওই এমপি ফেরদৌসের মোবাইল নিয়ে তার বেশ কয়েকটি ছবি তুলে দেন। এরপরই ওই এমপি ফেরদৌসের হাতে পাল্টা মোবাইল তুলে দিয়ে তার ছবি তুলে দেওয়ার অনুরোধ জানান। তিনিও ওই এমপির বেশ কয়েকটি ছবি তুলে দেন।

বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্য : নতুন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে ধন্যবাদ জানাতে গিয়ে বিরোধী দল নেতা জিএম কাদের বলেছেন, আসন সংখ্যার বিচারে এবার সংসদে শতকরা ৭৫ ভাগই সরকার দলের। স্বতন্ত্র ২১ ভাগ। তারাও অধিকাংশ সরকারদলীয়। মাত্র তিন থেকে চার ভাগ শুধু বিরোধীদলীয় সদস্য।

জিএম কাদের ১৯৯৬ সাল থেকে এমপি হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, এ সংসদ কখনো নিখুঁতভাবে দায়িত্ব পালনে সক্ষম হবে না। তারপরও সংসদকে কার্যকর করতে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

স্পিকারের ডানদিকে সরকারি দলের ও বাম পাশে বিরোধী দলের আসন উল্লেখ করে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য ছিল দুপক্ষই সমান হবে। একটা হলো সরকারি দল, আরেকটা হলো বিপক্ষ। তারা সংখ্যাও কাছাকাছি থাকবে। তাহলে তাদের মধ্যে সমানে সমানে লড়াই হবে। নিজেদের মতামতকে প্রধান্য দিয়ে তর্ক-বিতর্ক, ঝগড়াঝাটি হবে। সংসদে জনগণের পক্ষে সিদ্ধান্ত হবে। কিন্তু তেমনটি হয়নি।’

লাল ও সবুজের জাতীয় পতাকার কথা উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘শুধু লাল নয়, শুধু সবুজ নয়। যদি সরকারি দলকে লাল বলি তাহলে এ সংসদ সম্পূর্ণ লালময়। সবুজটা শুধু ছিটেফোঁটা। এ সংসদে সম্পূর্ণ জাতিকে খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। বর্তমান সংসদ জাতিকে কতটুকু প্রতিনিধিত্ব করতে সক্ষম হবে, তা আশঙ্কার বিষয়। ভালোভাবে বললে বলতে হবে বিতর্কের বিষয়।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত