বইমেলায় মেট্রোর আবহ

আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০২৪, ০৮:৩১ এএম

আসছে ভাষার মাস, ফিরছে আবারও বইমেলা। যেখানে শোক রূপ নেবে শক্তির, যেখানে প্রাণের উচ্ছ্বাসে মিলবে প্রাণ। যে প্রাণ ছড়িয়ে দেবে নতুন বইয়ের ঘ্রাণ ৫৬ হাজার বর্গমাইলে। সারা বছর বইপ্রেমীরা থাকেন এ মেলার অপেক্ষায়।

দীর্ঘ এক মাস বইপড়ুয়া সব বয়সী পাঠক বিচরণ করবে জ্ঞানের রাজ্যে। চলছে তারই শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। আর মাত্র এক দিন বাকি। এরপর হাতুড়ি-পেরেকে ঠোকাঠুকি রূপ নেবে নান্দনিকতার।

এবার করোনার মতো মহামারী কিংবা তেমন কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা নেই। লিপইয়ার হওয়ায় মিলছে বাড়তি এক দিন। মেট্রোরেলের সুবিধাও পাবে মানুষ। ভালো একটি মেলার আশা করছেন পাঠক-প্রকাশকরা।

বাংলা একাডেমি মেলার সব আয়োজন সম্পন্ন করছে। এবারও বইমেলার প্রতিপাদ্য ‘পড়ো বই গড়ো দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় বইমেলা উদ্বোধন করবেন।

সোমবার বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ঘুরে দেখা গেছে, মেলাপ্রাঙ্গণজুড়ে এখন হাতুড়ি-পেরেক আর করাত চলার শব্দ। এরই মধ্যে দাঁড়িয়ে যাওয়া কোনো কোনো স্টলে চলছে রঙতুলির পোঁচ। অধিকাংশ স্টল-প্যাভিলিয়নের কাঠামো দৃশ্যমান। কারিগররা কেউ পেরেকে হাতুড়ি ঠুকছেন, কেউ করাত দিয়ে কাঠ-বোর্ড কাটছেন। কেউ করছেন সাজসজ্জা ও চুনকামের কাজ।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অংশে এগিয়ে রয়েছে প্যাভিলিয়ন নির্মাণের কাজ। উদ্বোধনের আগেই সাজসজ্জার কাজ শেষ হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে প্রস্তুতির প্রায় ৯৫ শতাংশ শেষ।

মঙ্গলবার বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এবারের আয়োজনের বিস্তারিত জানান বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য-সচিব কে এম মুজাহিদুল ইসলাম। জানান, ৬৩৫টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৯৩৭টি ইউনিট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবার। একাডেমি প্রাঙ্গণে ১২০টি প্রতিষ্ঠানকে ১৭৩টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অংশে ৫১৫টি প্রতিষ্ঠানকে ৭৬৪টি ইউনিট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। গত বছর বইমেলায় অংশ নিয়েছিল ৬০১ প্রতিষ্ঠান। এবার প্রকাশনা সংস্থা বেড়েছে ৩৪টি। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রায় সাড়ে ১১ লাখ বর্গফুট এলাকাজুড়ে মেলা অনুষ্ঠিত হবে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এবার বইমেলার বিন্যাস গতবারের মতোই তবে কিছু আঙ্গিকগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। মেট্রো স্টেশনের কারণে মেলার বাহির-পথ এবার একটু সরিয়ে মন্দির-গেটের কাছাকাছি করা হয়েছে। এছাড়া টিএসসি, দোয়েল চত্বর, এমআরটি বেসিং প্ল্যান্ট ও ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউশন অংশে মোট ৮টি প্রবেশ ও বাহিরপথ থাকবে। খাবারের স্টলগুলো ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউশনের সীমানাঘেঁষে বিন্যস্ত করা হয়েছে।

গত বছরের মতো শিশুচত্বর মন্দির গেটে প্রবেশের ঠিক ডান দিকে বড় পরিসরে রাখা হয়েছে, যেন শিশুরা অবাধে বিচরণ করতে পারে এবং তাদের কাক্সিক্ষত বই সহজে সংগ্রহ করতে পারে। এবার লিটল ম্যাগাজিন চত্বর স্থানান্তরিত হয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উন্মুক্ত মঞ্চের কাছাকাছি গাছতলায়। সেখানে প্রায় ১৭০টি লিটলম্যাগকে স্টল দেওয়া হয়েছে।

বইমেলায় বাংলা একাডেমি এবং মেলায় অংশগ্রহণকারী অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ২৫% কমিশনে বই বিক্রি করবে। প্রতি শুক্রবার ও শনিবার মেলায় সকাল ১১:০০টা থেকে দুপুর ১:০০টা পর্যন্ত ‘শিশুপ্রহর’ থাকবে। অমর একুশে উদযাপনের অংশ হিসেবে শিশুকিশোর চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি এবং সংগীত প্রতিযোগিতার আয়োজন থাকবে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা থাকবে।

একাডেমির মহাপরিচালক কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা বলেন, ‘ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে রেখেই আমাদের এই বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবারের মেলা উদ্বোধনের পর যে পথ দিয়ে মেলা ঘুরে ঘুরে দেখবেন সেই পথজুড়ে সাজানো থাকবে ভাষা আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধু বিষয়ক তথ্যাবলি। দীর্ঘদিন পর বাংলা একাডেমি আবারও একক আয়োজনে ফিরেছে। সম্পূর্ণ আয়োজন আমরা দেখভাল করছি। আমরা চেষ্টা করছি সবচেয়ে ভালো বইমেলা উপহার দিতে।’ 

বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সহসভাপতি শ্যামল পাল বলেন, ‘করোনার পর গত বছরের মেলা কিছুটা এলোমেলো ছিল। এবার ভালো মেলা আশা করছি। কারণ বাংলা একাডেমি এবার তদারকি করবে। আমাদের প্রস্তুতিও ভালো।’

২০২৩ সালের বইমেলার পুরস্কার

অমর একুশে বইমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের ২০২৩ সালে প্রকাশিত সেরা বইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রকাশককে ‘চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার’ এবং ২০২৩ সালের বইমেলায় প্রকাশিত বইয়ের মধ্য থেকে শৈল্পিক বিচারে সেরা বইয়ের জন্য ৩টি প্রতিষ্ঠানকে ‘মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ দেওয়া হবে। এছাড়া ২০২৩ সালে প্রকাশিত সেরা শিশুতোষ বইয়ের জন্য ১টি প্রতিষ্ঠানকে ‘রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার’ এবং এ-বছরের মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে স্টলের নান্দনিক সাজসজ্জায় শ্রেষ্ঠ বিবেচিত প্রতিষ্ঠানকে ‘কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ দেওয়া হবে। এবারের গ্রন্থমেলায় বাংলা একাডেমি প্রকাশ করছে নতুন ও পুনর্মুদ্রিত ১০০টি বই।

বইমেলার সময়সূচি

এবারের বইমেলা অধিবর্ষের বইমেলা। ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ পর্যন্ত ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন দুপুর ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। রাত সাড়ে ৮টার পর নতুন করে কেউ মেলা প্রাঙ্গণে ঢুকতে পারবেন না। ছুটির দিন বইমেলা চলবে সকাল ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। একুশে ফেব্রুয়ারি মহান শহীদ দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে মেলা শুরু হবে সকাল ৮টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। এবারও মেলার তথ্যকেন্দ্র থেকে পাওয়া যাবে নতুন বইয়ের খবর। মেলায় প্রতিদিন থাকবে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনাসভা। ‘লেখক বলছি’ মঞ্চে থাকবে বই নিয়ে লেখক-পাঠকের মতবিনিময়। প্রতিদিন বিকাল ৪টায় বইমেলার মূল মঞ্চে সেমিনার এবং সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত