সম্মান জবাবদিহিতা নিশ্চয়তা থাকলে জনগণ আইন মানে

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২:১৪ এএম

মেট্রোরেলের বগির ভেতর থেকে তাকিয়ে দেখছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনে থামার পর একসঙ্গে থাকা পাঁচজন তরুণ প্রচন্ড ভিড় ঠেলে রেলে উঠতে চাইছেন। চারজন কায়দা কসরত করে উঠতে পারলেও, পঞ্চমজন ওঠার আগেই দরজা বন্ধ হওয়া শুরু হলো। তরুণটি বিচলিত না হয়ে, স্মিত হেসে, চিৎকার করে বলে উঠল গিয়ে দাঁড়াইস, দশ মিনিটেরই তো ব্যাপার!

দরজা লাগার পর ট্রেনটি চলা শুরু করতেই তরুণের মুখটা আবছা থেকে আবছাতর হতে লাগল আর আমি কেবল ওর বলা কথাটা ভাবছিলাম। যেই নিশ্চিন্তের স্বরে সে বন্ধুদের অপেক্ষা করতে বলল, আপাতভাবে এই কথাটা খুবই সাধারণ শোনালেও, এর মাঝে লুকিয়ে আছে আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা, নগর হয়ে ওঠা এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে জনতার যে পারস্পরিক দায়িত্ববোধ, এর গভীর এক আখ্যান।

মেট্রোরেল ঢাকাবাসীর জন্য এক নতুন বিস্ময়। উন্নয়নের অন্য অনেক মেগা প্রজেক্ট নিয়ে প্রশ্নবোধক চিহ্ন থাকলেও, এই নব আবির্ভাব ঢাকাবাসীর জন্য এক বিপুল স্বস্তি ও আশা হয়ে এসেছে। প্রাক্কলিত সময়ের চেয়ে অনেক পরে এবং সরকারি অর্থের হিসেবে পুরোপুরি স্বচ্ছতা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও, জনগণ আপাতত মোহমুগ্ধ। প্রায় স্থবির হয়ে পড়া ট্রাফিকের শহরে মাত্র চল্লিশ মিনিটে শহরের এক মাথা থেকে আরেক মাথায় যাওয়ার নিশ্চয়তা শহরবাসীকে নতুন রকমের উদ্দীপনা দিচ্ছে। আমাদের দেশে জনগণের আচরণ নিয়ে একটা ঋণাত্মক ধারণা আছে। পাবলিক ডাস্টবিনে ময়লা ফেলে না বলে রাস্তা নোংরা হয়, প্লাস্টিকের প্যাকেট যত্রতত্র ফেলে, ফলে জলাবদ্ধতা হয়, আইন মানে না বলে ট্রাফিক জ্যাম হয়। দীর্ঘদিনের প্রপাগা-ায় অভিযোগগুলো প্রতিষ্ঠিত হলেও এর ঐতিহাসিক এবং বাস্তবিক কারণ পর্যালোচনা করলে ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়।

প্রায় দুইশ বছর উপনিবেশিক শাসন এবং এরপর চব্বিশ বছর স্বদেশেই ‘ভিন্ন জাতির’ মানুষ হওয়ায় আমাদের দেশের মানুষ কখনোই আধুনিক রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসেবে যে রাষ্ট্রের কাছে যে সম্মান, আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়ার কথা, তা পাননি। অনেকটা প্রজা হিসেবেই শোষিত হয়েছেন। নাগরিক অধিকারের অভাবে, স্বাভাবিকভাবেই নাগরিক সচেতনতাও গড়ে ওঠেনি। সরকারি সম্পত্তি, যা কিনা আদতে জনগণেরই সম্পদ, তা নিয়ে ব্রিটিশ আমলে আমাদের মানসিকতা ছিল কোম্পানিকা মাল দরিয়ামে ঢাল। কোম্পানির শাসনের পর দেশ স্বাধীন হলেও দরিয়াতে ছুড়ে দেওয়ার বদলে সরকারি সম্পত্তি কীভাবে তছরুপ করে নিজেদের আখের গোছানো যায়, এই ছিল ক্ষমতায় থাকাদের অন্যতম লক্ষ্য। সাধারণ জনতাও দেখেছে, দেশ স্বাধীন হলেও এদের নিজেদের সম্পদের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়নি, নাগরিক না হয়ে তারা প্রজাই থেকে গেছেন।

আর প্রজা হয়ে থাকা জনতাকে এই বার্তা দেওয়া হয় যে, তুমি যে সুবিধা পাচ্ছ, এইটা তোমার অধিকার না। এমনকি ভাষিক রাজনীতিও আছে। ‘সার্ভিস’ শব্দটার বাংলা যে সেবা হলো এই ব্যাপারটাই তো সমস্যাজনক। সেবা শুনলেই মনে হয় মুফতে পাওয়া কিছু, এর সঙ্গে একটা কোমল দানের ভাব, দয়া জড়িত। আদতে সার্ভিস কোনো দয়াদাক্ষিণ্য না। সার্ভিস মানে অর্থের বিনিময়ে আকাক্সিক্ষত অভিজ্ঞতাটি পাওয়া। ফিরে আসা যাক নিশ্চয়তার কথায়। ওই যে তরুণটি নিশ্চিতভাবে জানে পরের মেট্রোরেলটি দশ মিনিট পরেই আসবে। লোকাল বাস হলে সে এইটা ভাবতে পারত? ট্রেন হলে? সেসব ক্ষেত্রে পাঁচ বন্ধু ঠেলে ঠুলেই উঠত। ভিআইপি যাওয়ার জন্য যে শহরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তা আটকে রাখা হয়, সেখানে সুযোগ পেলে লোকে ট্রাফিক আইন ভেঙে আগে যাওয়ার চেষ্টা করবেই। ক্ষমতাশালীরা যেখানে অবাধে খালবিল দখল করে ফেলে, বন, পাহাড় সাফ করে ফেলে, সেখানে দূরে গিয়ে ডাস্টবিনে ময়লা ফেলার সংস্কৃতি আশা করা বৃথা। কোটি কোটি টাকা পাচার, ব্যাংক থেকে খেলাপি ঋণ করা যেখানে ক্ষমতার প্রতীক, সেখানে কর ফাঁকি দেওয়াই স্বাভাবিক। জঙ্গলে যেভাবে যে কোনো মূল্যে টিকে থাকাই নিয়ম। আর যেখানে টিকে থাকাই বড় সংগ্রাম, সেখানে দেশপ্রেম, দায়িত্ববোধের মতো ব্যাপারের অস্তিত্ব থাকে না।

কিন্তু মেট্রোরেলে লাইন ধরে সুশৃঙ্খলভাবে টিকিট কাটা, নিয়ম মেনে ট্রেনে ওঠা, এমনকি পুরো রাস্তায় দাঁড়িয়ে যাওয়াতেও জনতার সমস্যা হয় না। জনতা ধৈর্য কিংবা শৃঙ্খলা হারায় না। এই ছবিটাতে স্পষ্ট হয় যে, জনতা আইন মানে না এই আলাপটা সত্যের বিকৃতি। আইন মানার পরিস্থিতি থাকলে, নাগরিক হিসেবে সম্মান, জবাবদিহিতা এবং নিশ্চয়তা থাকলে জনগণ আইন মানে। যেখানে সেগুলো ন্যূনতমভাবে প্রয়োগ করা হয়, জনগণ সেখানে ঠিকই দায়িত্বশীল হয়ে ওঠে। দেখার বিষয়, মেট্রোরেলের এই নিয়মনিষ্ঠা, নিশ্চয়তা কতদিন টিকে থাকে। আমাদের সমাজব্যবস্থায়, আশঙ্কা হয়, দুর্নীতির করালগ্রাসে যে কোনো ব্যবস্থায় বিষাক্ত হয়ে ওঠে। সে রকমটা হলে, লাইনে দাঁড়ানো সুনাগরিকরা আবারও জান্তব আচরণে বাধ্য হবে। তবে মেট্রো আমাদের এক বড় শিক্ষা ইতিমধ্যেই দিল।

ওই যে ট্রেনে উঠতে না পারা তরুণের নিশ্চয়তা, নাগরিক হিসেবে সম্মানবোধ করা, এই ব্যাপারটা মেট্রো ছাপিয়ে বৃহৎ পরিসরেও আমাদের একটা বার্তা দেয়। চলমান অগ্রযাত্রায় নাগরিককে তার উপযুক্ত সুবিধা দিলে, তার প্রাপ্য অধিকারটা দিলে সে জীবন দিয়ে তা আগলে রাখবে। সুনাগরিক হয়ে দেশকে আরও বেশি নিয়মানুবর্তী করবে। সুব্যবস্থাই সুনাগরিক তৈরি করবে, উল্টোটার আশা করা কেবল অযৌক্তিক নয়, রাজনৈতিক অসততাও বটে।

লেখক : সাংবাদিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত