কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হাটশ হরিপুর ইউনিয়নে পদ্মা নদীর চর থেকে মিলন হোসেন (২৭) নামে এক যুবকের আট টুকরো মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ হত্যার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে সাবেক ছাত্রলীগ নেতাসহ পাঁচ যুবককে আটক করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, মিলন হত্যাকাণ্ডের হোতা এস কে সজীব। তিনি জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি (বহিষ্কৃত)। পাশাপাশি পুলিশের তালিকাভুক্ত কিশোর গ্যাং-প্রধান। এস কে সজীবের নেতৃত্বে কুষ্টিয়া শহরে একটি গ্যাং চলে। বর্তমানে স্বেচ্ছাসেবক লীগের রাজনীতি করছেন তিনি। তবে কোনো পদ-পদবি নেই। এস কে সজীব জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ইয়াসির আরাফাতের (তুষার) সঙ্গে থেকে রাজনীতি করেন।
জানা যায়, হত্যাকাণ্ডের পর এস কে সজীব শহরেই স্বাভাবিকভাবে ঘোরাফেরা করছিলেন। পুলিশ তাকেসহ পাঁচজনকে শহর থেকে আটক করে হেফাজতে নেয়।
এ ছাড়া নরসিংদী থেকে দুজনের, কুড়িগ্রামে অজ্ঞাত ব্যক্তি এবং পঞ্চগড়ে নিখোঁজ দুই ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
পদ্মার চরে পুঁতে রাখা ছিল যুবকের লাশের ৮ টুকরো : গত শুক্রবার রাত ২টায় শুরু করে গতকাল শনিবার সকাল পর্যন্ত কুষ্টিয়া মডেল থানা পুলিশের অভিযানে চারটি স্থানে পুঁতে রাখা মিলন হোসেনের দেহাংশগুলো উদ্ধার করা হয়। পরে টুকরোগুলো কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠায় পুলিশ।
নিহত মিলন হোসেন দৌলতপুর উপজেলার বাহিরমাদি গ্রামের বাসিন্দা মওলা বক্সের ছেলে। কুষ্টিয়া শহরের হাউজিং ই-ব্লকের একটি ভাড়া বাসায় স্ত্রী মিমি খাতুনসহ বসবাস করতেন।
এ হত্যাকা-ে জড়িত সন্দেহে পুলিশ শহরে কিশোর গ্যাংসহ হত্যা ও নানা অপরাধের হোতা সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এস কে সজীব (২৫), জনি আহমেদ (২২) ও সজল আহমেদসহ (২৪) পাঁচ যুবককে আটক করেছে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে কুষ্টিয়া অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পলাশ কান্তি জানান, ‘নিহত মিলন হোসেনের হত্যাকান্ডে জড়িত সন্দেহে আটক সজিব, সজল ও জনিকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে টাকা-পয়সা ভাগাভাগি-সংক্রান্ত দ্বন্দ্বের জেরে এ হত্যাকান্ড ঘটে থাকতে পারে।’ এই মুহূর্তে এর বেশি বলা যাচ্ছে না। আটক যুবকদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত আছে কি না, তা বিস্তারিত জানা যাবে।
নিহতের সদ্য বিবাহিত (নয় মাস আগে বিবাহিত) স্ত্রী মিমি খাতুন (২৫) জানান, ‘গত ৩১ জানুয়ারি, সকাল ১০টায় বাসা থেকে বের হন মিলন। বেলা সাড়ে ১১টা থেকে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তখন থেকেই আমি ও আমার পরিবারের লোকজন খোঁজাখুঁজি শুরু করি। সম্ভাব্য সব স্থানে খুঁজে কোনো সন্ধান না পেয়ে কুষ্টিয়া মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করি।
মিমির অভিযোগ, ‘মিলনের ব্যবসায়িক পার্টনার সজল ওইদিন সকালে মোবাইলে ফোন করে ডেকে নিয়ে যান। তারপর থেকেই মিলনের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। আমি আগে জানতাম না যে সজল একজন অস্ত্রধারী ও মাদক সম্পৃক্ত ব্যক্তি। জানলে আমি মিলনকে ওর সঙ্গে মিশতে দিতাম না। সজল খুব ভয়ংকর লোক, ওর একটা গ্যাং আছে, ওরাই মিলনকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে হত্যা করেছে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কুষ্টিয়া মডেল থানার এক উপপুলিশ পরিদর্শক বলেন, ‘আটক সজিব, জনি ও সজল ওরা তো কিশোর বয়স থেকেই অপরাধ জগতে ঢুকে পড়েছে। এরা হত্যা, ব্ল্যাকমেইল (কৌশলে জিম্মি), মোবাইল নম্বর ক্লোন বা হ্যাক করে বিকাশের টাকা প্রতারণা, অস্ত্র, মাদকসহ নানা অপরাধ সংঘটনে জড়িত একটি চক্র। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে মিলন হোসেন নামে যে যুবক নিহত হয়েছেন সেও এই চক্রের সঙ্গে জড়িত। কিশোর গ্যাং লিডার খ্যাত সজিবের বিরুদ্ধে অনেকগুলো মামলা এখন আদালতে বিচারাধীন আছে।’
কুষ্টিয়া মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক শেখ মো. সোহেল রানা বলেন, ‘গত ৩১ জানুয়ারি নিহতের স্ত্রী মিমি খাতুনের করা সাধারণ ডায়েরির সূত্র ধরে সজল ও সজিব নামে দুই যুবককে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারা হত্যাকান্ডে জড়িত বলে স্বীকার করেছেন, তারা কীভাবে এবং কেন এ হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে সে বিষয়েও একটি প্রাথমিক ধারণা দিয়েছেন।’
নরসিংদীতে সন্ত্রাসীদের হামলায় যুবক নিহত : নরসিংদীতে সুমন মিয়া (৩২) ওরফে কালা সুমন নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। গত শুক্রবার রাত ১টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
এর আগে শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টায় নরসিংদী শহরের চিনিশপুর ইউনিয়নের পশ্চিম ঘোড়াদিয়া এলাকার মোল্লা বাড়ি মসজিদের সামনে এ হামলার ঘটনা ঘটে। নিহত কালা সুমন ঘোড়াদিয়ার সংগীতা এলাকার ছোবান মিয়ার ছেলে।
নরসিংদী মডেল থানার ওসি তানভীর আহমেদ বলেন, নিহত সুমনের সঙ্গে এলাকার বেশ কয়েকজনের দ্বন্দ্বের খবর পাওয়া গেছে। তাছাড়া মাদক ব্যবসার, বাজার কমিটি নিয়েও দ্বন্দ্ব রয়েছে। এসবের জেরেই হত্যাকান্ড ঘটতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে নরসিংদীর পলাশে রেললাইনের পাশ থেকে সুমন সাহা (৩৪) নামে এক দিনমজুর যুবকের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গতকাল শনিবার সকালে উপজেলার জিনারদী ইউনিয়নের বরাব এলাকার রেললাইনের পাশে তার মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন আনসার ভিডিপি সদস্যরা। নিহত সুমন সাহা জিনারদী ইউনিয়নের রাবান গ্রামের ভালুকাপাড়া এলাকার নেপাল চন্দ্র সাহার ছেলে। তিনি বরাব আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা।
কুড়িগ্রামের ভুট্টা ক্ষেত থেকে অজ্ঞাত ব্যক্তির লাশ উদ্ধার : কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার ধরলা নদীর চরের পশ্চিম ধনীরাম গ্রামের ভুট্টা ক্ষেত থেকে ষাটোর্ধ্ব বয়সী এক গলাকাটা ও মুখমণ্ডল ক্ষতবিক্ষত অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করেছে ফুলবাড়ী থানা পুলিশ। গতকাল শনিবার দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ফুলবাড়ী থানা পুলিশের ওসি প্রাণকৃষ্ণ দেবনাথ।
পঞ্চগড়ে একই দিনে দুই ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার : পঞ্চগড়ের দুই উপজেলায় নিখোঁজ দুই ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এদের মধ্যে বোদা উপজেলার মাড়েয়া বামনহাট ইউনিয়নের করতোয়া নদীর সাঁওতালপাড়া ঘাটে একজন এবং সদর উপজেলার চাকলাহাট ইউপির ডোলপাড়া গ্রামে মাটি খুঁড়ে অন্যজনের লাশ উদ্ধার করা হয়।
পঞ্চগড়ে পৃথক উপজেলায় নিখোঁজের দুদিন পর মাটিচাপা অবস্থায় টাবুল বর্মন (৪৮) ও নিখোঁজের সাত দিন পর হাত-পা বাঁধা অবস্থায় নুরুল ইসলাম (৪০) নামে দুই ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
গত শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টায় পঞ্চগড় সদর উপজেলার চালকাহাট ইউনিয়নে ও সন্ধ্যায় বোদা উপজেলার মাড়েয়া বামনহাট ইউনিয়নের সাঁওতালপাড়া ঘাট থেকে মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে টাবুল বর্মনকে মাটিচাপা অবস্থায় ও নুরুল ইসলামকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় নদীতে ভাসমান পাওয়া যায়। লাশ দুটির সুরতহাল শেষে গতকাল শনিবার সকালে ময়নাতদন্তের জন্য পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
শনিবার দুপুর ১টায় পুলিশ সুপার এসএম সিরাজুল হুদা তার অফিস কক্ষে আয়োজিত এক প্রেস বিফ্রিংয়ে জানান, দুটি হত্যাকান্ডই পরিকল্পিত। দুটি হত্যাকান্ডে জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে।
