বাংলা একাডেমির ‘একুশে বইমেলা’ নামে পৃথক বিভাগ থাকা দরকার

আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০২:৪৭ এএম

প্রকাশক হওয়ার কোনো ইচ্ছাই ছিল না অ্যাডর্ন পাবলিকেশনের স্বত্বাধিকারী সৈয়দ জাকির হোসাইনের। তার ভাষায় ‘বিপদে পড়ে হয়েছি। হয়েই বিশেষায়িত প্রকাশক হওয়ার চেষ্টায় আছি। প্রকাশনাকে শুধুই ব্যবসা মনে করি না।’

বিপদটা কী ছিল জানতে চাইলে জাকির হোসাইন বলেন, ‘১৯৯৪ সালে কবি ময়ুখ চৌধুরীর গবেষণা পান্ডুলিপি নিয়ে কাজ শুরু করে বই প্রকাশ শুরু করি। এরও দেড় দশক আগে থেকে ছাত্রজীবনেই বই প্রকাশ, সম্পাদনার কাজ করে আনন্দ পেতাম। ১৯৯৭ সাল থেকে একুশে বইমেলায় বই প্রকাশ করছি। প্রকাশনা নিয়ে আগ্রই আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে। যেকোনো নতুন বিষয়ই আমাদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণায় সহযোগিতা ও বই প্রকাশ করে দিতে দিতে প্রকাশক হতে হয়েছে আসলে।’

দেশ রূপান্তরের প্রশ্নের জবাবে বলছিলেন, ‘প্রকাশক হয়ে বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশকে দেশ ও বিদেশে বিশেষভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছি। একুশ নিয়ে, বর্ণে বর্ণে সভ্যতা ও বর্ণে বর্ণে ভালোবাসা স্লোগানে অ্যাডর্ন বুকস অ্যাডর্ন লাইফ সেøাগানে কাজ করতে পারছি। নানা সংকলনমূলক ফুটানি পরিহার করে মৌলিকতার আলোকে বই প্রকাশ করতে পারছি। প্রকাশনায় আমার আরও বড় অর্জন হচ্ছে, নীরবে আমাদের কিছু বিশেষ বই শূন্য থেকে ১২-১৬ বছর পর্যন্ত শিশুরা পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। প্রকৃত পাঠক, মানুষ হতে চাওয়া পাঠক গড়ে তুলছি, যারা চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে পারছে, সামাজিকও হচ্ছে। পড়ালেখায়ও উন্নতি করছে। এসবই আমাদের সফলতা।’

প্রসঙ্গক্রমে সৈয়দ জাকির হোসাইন বললেন, ‘শুধুই মেলাকেন্দ্রিক কোনো লেখকের বই আমরা করি না। সারা বছরের কাজ করলে ১০-২০টা নতুন বই হয়েই যায়। আমরা প্রতিবছরই বাছাই করা বই নিয়ে মেলায় থাকি।’

বইয়ের প্রচারণা নিয়ে বিশেষ কোনো পদক্ষেপ নেই জানিয়ে সৈয়দ জাকির হোসাইন বলেন, ‘পাঠকের কাছে সরাসরি বই উপস্থিত করছি, যিনি প্রকৃত পাঠক, সংগ্রাহক, তিনি খুঁজে নেবেনই।’

প্রকাশনার সংকট জানতে চাইলে জাকির হোসাইন বলেন, ‘সমস্যার পাহাড়, কী বলতে যে কী বলি! উত্তরণ করি, বইকে নিয়ে কাজ করতে করতে। যে দেশে শিক্ষাক্রমে টুলসে রূপান্তর হয়েছে, সেখানে জ্ঞান তো বড়ই চ্যালেঞ্জ। বই তো জ্ঞানেরই বাহক।’

কেমন পা-ুলিপি পেলে বই প্রকাশ করেন প্রশ্নের জবাবে এই প্রকাশক বলেন, ‘লেখাটি সত্যিকার লেখা হলেই। এটাই বরাবরই করেছি। তবে একজন সব বই কী প্রকাশ করতে পারবে, লেখক চাইলেই। পা-ুলিপিকে না বলতে জানাই আমার যোগ্যতা। যেটা বই হবে না, সেটা কেন প্রকাশ করব?’

মেলা ঘিরে প্রত্যাশা করতে গিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন সৈয়দ জাকির হোসাইন। তিনি বলেন, ‘বইমেলা দেখে, বইমেলার কোনো মা-বাবা আছে সেটা বুঝতে কষ্ট হয়। আপাতত কোনো বইতে প্রথম ১৬ পৃষ্ঠায় কোনো ভুল থাকলে প্রচার ও মোড়ক উন্মোচনের সুযোগ বন্ধ করুক। আর কিছু বলার নেই, মেলা শুরু হয়ে যাওয়ার পর এই সময়ে। তবুও বইমেলাটি শুরু হয় নিয়মিত, শেষও হয়। এটাই হয়তো চিরায়ত চরিত্র বাঙালির। সবকিছু এমনই। তাই আলাদা কিছু প্রত্যাশা আমার নেই।’

সৈয়দ জাকির হোসাইন বলেন, ‘বাংলা একাডেমির কাছে অনেক প্রত্যাশা জাতির বা পাঠকের থাকলেও বাংলা একাডেমি গত চার দশকে সে জায়গায় পুরোপুরি যেতে পারেনি। বাংলা ভাষার উৎকৃষ্টতা প্রকাশে বাংলা একাডেমি যতটুকু এগিয়েছে, প্রত্যাশা ও প্রয়োজনের তুলনায় তার চেয়ে বহুদূর পিছিয়েছেই বলা চলে। একুশের বইমেলা নিয়েও তাই। দক্ষ ও কার্যকর মানুষ বা নেতৃত্ব তো আকাশ থেকে আসে না। এখান থেকেই সৃষ্টি হতে হবে। সেখানেই নজর ও কাজ হওয়া চাই। বাংলা একাডেমিতে একুশে বইমেলা শিরোনামে একটি পৃথক বিভাগ হওয়া দরকার। ধার করা বিভাগ বা ধার করা মা-বাবা দিয়ে সন্তান বড় করা যায় না, লালনপালনও করা যায় না।’

নিভৃতে প্রচারণার আলোর বাইরে থাকা এই প্রকাশক বলেন, ‘আমাদের শুধুই মন খুলে খোলা আকাশের মতো সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আকাশটি, সূর্যটি সবারই জন্য। বইও তাই।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত