ইংরেজি ‘রিভার’ যে অর্থে ব্যবহৃত হয়, বাংলায় ‘নদী’ তার যথার্থ প্রতিশব্দ হতে পারে না। প্রতীচ্যের নদী মূলত ‘ভৌগোলিক’ বা প্রাকৃতিক জলধারা মাত্র। যেই কারণে ইংরেজি রিভার শব্দটি যে লাতিন ‘রিপা’ শব্দ থেকে এসেছে, এর অর্থ হচ্ছে নদীতীরবর্তী জনপদ। কিন্তু প্রাচ্যে নদী নিছক প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ নয়; এর সঙ্গে যোগ রয়েছে প্রজ্ঞা ও পারমিতার।
ভারতীয় উপমহাদেশে নদীকে পৌরাণিক চরিত্র হিসেবে দেখা হয়েছে। যেমন : পুরাণে গঙ্গা ও গৌরী দুই সহোদরা। বাস্তবেও গঙ্গা থেকেই উৎপন্ন হয়েছে গড়াই তথা গৌরী। যমুনার জল কালো কৃষ্ণের সংস্পর্শে; তার অষ্টভার্যার একজন কালিন্দী। উত্তর প্রদেশের যমুনা নদীর অপর নামও কালিন্দী। মজার ব্যাপার, বঙ্গেও যমুনা ও কালিন্দী নামে দুই সহোদরা নদী রয়েছে। সাতক্ষীরার সীমান্ত নদী ইছামতী আরও ভাটিতে গিয়ে এই দুই নামে বিভক্ত। নদীর পৌরাণিক উপাখ্যান দেখলে মনে হতে পারে, এগুলো যেন একটি অতিপ্রাকৃতিক পরিবারের অংশ।
যা হোক, নদীর যে সংজ্ঞা, সেটাকেও প্রতীচ্যের চোখে দেখলে হবে না। যেমন : ‘নদী’ কী, এই প্রশ্ন প্রথম তুলেছিলেন খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকের আগে ভারতীয় মুনি ও সংস্কৃত ব্যাকরণবিদ ‘যাস্ক’। উত্তরটাও তিনিই দিয়েছিলেন শব্দ করে বলেই নদী। নদী শব্দের মূলে রয়েছে সংস্কৃত ‘নাদ’। সোজা কথা বলা যায়, যে জলরাশি নাদ বা শব্দ করে, তাই নদী।
শুধু তাই নয়; প্রাচ্যে যেভাবে নদ ও নদীকে আলাদা করে ভিন্ন ভিন্ন তাৎপর্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটাও বাকি বিশ্বে বিরল। নদীকে নারী ও নদকে পুরুষবাচক সস্তা চিন্তার কথা বলছি না। সেটা নিছক ভাষাগত এবং এ নিয়ে যারা নরক গুলজার করেন, তাদের অঢেল অবসর ঈর্ষণীয়। নদী বিষয়ে এই অঞ্চলের আদি চিন্তকরা আসলে জীবনদায়ী স্রোতস্বিনীকে ভাগ করেছিলেন এভাবে নদ হচ্ছে চিন্তাধারা বা চেতনা, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ধারা; আর নদী হচ্ছে কর্মধারা বা উৎপাদন, পরিবহন, অর্থকরী ধারা। যে কারণে ভারতীয় উপমহাদেশের আদি দুই ধারা সিন্ধু ও ব্রহ্মপুত্র হচ্ছে ‘নদ’। আর যে ধারাকে স্বর্গলোক থেকে মর্ত্যে আনয়ন করা হয়েছিল, সেই গঙ্গা হচ্ছে ‘নদী’।
কর্মধারার কারণেই গঙ্গা নিছক একটি নদী নয়; বরং আরও শত শত প্রবাহের ডাকনাম। বস্তুত, খোদ গঙ্গারই ১০৮টি নাম রয়েছে; সেগুলো একত্রে ‘গঙ্গা অষ্টোত্তর শত নামাবলি’ নামে পরিচিত। বর্তমান বাংলাদেশেই আমি অন্তত ১২টি নদী পেয়েছি, যেগুলোর নামে গঙ্গা রয়েছে। যেমন : গঙ্গা, নবগঙ্গা, কালীগঙ্গা, বুড়িগঙ্গা, তুলসীগঙ্গা, পোড়াগঙ্গা, গঙ্গাজলি, গঙ্গারাম, গঙ্গাধর, রামগঙ্গা, নারায়ণীগঙ্গা ও কাষ্টগঙ্গা। ভাবলে অবাক হতে হয়, ১৯১২ সালে প্রকাশিত যতীন্দ্রমোহন রায়ের ‘ঢাকার ইতিহাস’ গ্রন্থে বুড়িগঙ্গার পাশাপাশি আরও অন্তত তিনটি গঙ্গাকে ‘ঢাকা জেলার বক্ষদেশে উপবীতবৎ শোভা পাইতে’ দেখা যায়। নদীর ‘কর্মধারা’ উপযোগিতার কারণেই এমন নাম। মজার ব্যাপার, ইংরেজি ভাষায় ‘গ্যাংওয়ে’ বা বণিকপথ কথাটি প্রাচ্য থেকেই আমদানি করা; গাঙপথ থেকে গ্যাংওয়ে।
আমরা দেখব, বিশ শতকের গোড়ায় বাংলায় নদ-নদীর আধ্যাত্মিক চিন্তা থেকে ব্যবহারিক ভাবনা গুরুতর হয়ে উঠছে। সেই সময়, ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে বাঁধ দিয়ে নদী বেঁধে ফেলার সর্বনাশা প্রবণতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও উদ্বিগ্ন করেছিল। এসব আয়োজনের বিরুদ্ধে ১৯২২ সালে তিনি লিখেছিলেন ‘মুক্তধারা’। সেই নাটকে উঠে এসেছে, উত্তরকূট রাজ্যের মুক্তধারাকে লৌহবাঁধ দিয়ে বাঁধতে গিয়ে কত মানুষ ধূলিচাপায় মারা যায়, বন্যায় ভেসে যায় এবং চাষের ক্ষেত শুকিয়ে দুর্ভিক্ষ শুরু হয়। কিন্তু যন্ত্ররাজ তবুও যখন বাঁধ নির্মাণ থেকে সরে আসেন না। প্রজাদের বরাতে যুবরাজের দূত বলেন, ‘তারা বিশ্বাস করতেই পারে না যে, দেবতা তাদের যে জল দিয়েছেন কোনো মানুষ তা বন্ধ করতে পারে।’
আরও পরে, দেশভাগের পর এ দেশের নদীচিন্তা কীভাবে রাজনৈতিক রূপ ও রাষ্ট্রীয় ইস্যু হয়ে উঠছে, সেটা আমরা দেখি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তৎপরতার মধ্যে। তখনই নদী ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তিনি ভেবেছেন। শুধু রাজনৈতিক দিক থেকে নয়, নদী-ভাবনার ক্ষেত্রেও বঙ্গবন্ধু স্পষ্টই নিজের সময়ের চেয়ে কতটা এগিয়ে ছিলেন, একটি একটা উদাহরণ দেই। নদী ও বন্যা ব্যবস্থাপনার বৈশ্বিক ‘ফ্লাগশিপ’ প্রতিষ্ঠান নেদারল্যান্ডসের ‘আইএইচই ডেলফট ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার এডুকেশন’ গঠিত হয়েছে ১৯৫৭ সালে। আমারও সুযোগ হয়েছে সেখানে যাওয়ার। গোটা দুনিয়ায় নদী ব্যবস্থাপনা রপ্তানিকারক এই প্রতিষ্ঠান নদীভাঙন ও বন্যার সঙ্গে বসবাসে বাংলাদেশের সামাজিক শক্তি বুঝতে চেয়েছিল। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমি তাদের এক কর্মশালায় বলেছিলাম দেখো, আমরা সন্তানের নাম রাখি বন্যা, প্লাবন, বৃষ্টি ও নদী। কারণ আমরা এগুলোকে ভালোবাসি ও জীবনের অংশ মনে করি। ফলে পশ্চিমা ‘ফ্লাড’ আর বঙ্গীয় ‘বন্যা’ কখনো এক হতে পারে না। তা ব্যবস্থাপনার পদ্ধতিও এক হতে পারে না। যা হোক, সে ভিন্ন প্রসঙ্গ; আগ্রহীরা পড়তে পারেন ডাচ ‘ফ্লাড’ বনাম বঙ্গীয় ‘বন্যা’ (শেখ রোকন, সমকাল, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮)।
আমরা দেখি, আইএইচই ডেলফট প্রতিষ্ঠারও আগে ১৯৫৬ সালে বঙ্গবন্ধু নদী ও পানি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে কথা বলছেন। আওয়ামী লীগ কাউন্সিলে তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তব্য ‘বন্যা-পূর্ব্ব পাকিস্তানিদের জীবনে নূতন নয়। কিন্তু বিজ্ঞানসমৃদ্ধ ও সম্পদ বলিষ্ঠ মানুষ অসহায়ের মতো আজও প্রকৃতির রুদ্র পীড়ন সহ্য করিবে কি না, ইহাই হইল সবচেয়ে বড় সওয়াল। হোয়াংহো নদীর প্লাবন, ট্যানিসিভ্যালির তাণ্ডব ও দানিয়ুবের দুর্দমতাকে বশে আনিয়া যদি মানুষ জীবনের সুখ সমৃদ্ধির পথ রচনা করিতে পারে তবে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার মতো শান্ত নদীকে আয়ত্ত করিয়া আমরা কেন বন্যার অভিশাপ হইতে মুক্ত হইব না?’ (দৈনিক আজাদ, ২০ মে ১৯৫৬)
ষাটের দশকে নদী কীভাবে রাজনৈতিক প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছিল, সেই সত্য বাংলাদেশের মানুষের চেয়ে আর কে বেশি জানে? তখন স্লোগান উঠেছিল ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’। কেবল রাজপথের স্লোগানে নয়, খোদ মুক্তিযুদ্ধেও এ দেশের নদ-নদী হয়ে উঠেছিল ‘দ্বিতীয় বাহিনী’। পুলিৎজার বিজয়ী মার্কিন সাংবাদিক সিডনি শনবার্গ নিউ ইয়র্ক টাইমসে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রতিবেদন ও বিশ্লেষণ পাঠিয়েছিলেন তখন। একাত্তরের ১৩ এপ্রিল ডেটলাইনে তিনি লিখেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানের গ্রামাঞ্চলের জটিল পথ গাঙ্গেয় ব্রহ্মপুত্র জলধারা ও সহস্র নদীর আঁকিবুঁকি পশ্চিম প্রদেশের শুষ্ক ও পার্বত্য অঞ্চল থেকে আগত পাঞ্জাবি ও পাঠানদের কাছ অপরিচিত। যখন বর্ষায় নদী ফুলে উঠবে এবং মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বন্যায় পূর্ব পাকিস্তানের বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়বে, তখন এই অপরিচিতি আরও বাড়বে। ‘আমরা এখন বর্ষার অপেক্ষায় রয়েছি’, বললেন এক বাঙালি অফিসার। ‘তারা পানিকে এত ভয় পায় যে, আপনি ভাবতেই পারবেন না এবং আমরা হচ্ছি জলের রাজা। তারা তখন ভারী কামান ও ট্যাংক নিয়ে চলতে পারবে না। প্রকৃতি হবে আমাদের দ্বিতীয় বাহিনী’। (ডেটলাইন বাংলাদেশ : নাইন্টিন সেভেন্টিওয়ান/ সিডনি শনবার্গ/ মফিদুল হক অনূদিত/ সাহিত্য প্রকাশ, ১৯৯৫)
সদ্য স্বাধীন দেশেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নদ-নদীর ভূ-রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষাগত গুরুত্বের কথা ভুলে যাননি। দেশের অভ্যন্তরীণ নদীব্যবস্থায় আঞ্চলিক অভিন্ন নদী কতটা ভূমিকা রাখে এখন আমরা অভিজ্ঞতা ও সংকট দিয়ে জানছি। অথচ বঙ্গবন্ধু তখনই বুঝেছিলেন, আমাদের অভিন্ন প্রায় সব নদীর উজান যেহেতু ভারতে, সেখান থেকে পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে সর্বাগ্রে। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার বাইরেও তিনি নদীর কথা গুরুত্ব দিয়ে ভেবেছেন। তিনি পাকিস্তানের কারাগার থেকে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশে ফিরলেন আর মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকে নদীর প্রসঙ্গ তুললেন। কী হবে অভিন্ন নদীগুলোর ভবিষ্যৎ। মাত্র দুই মাসের কিছু সময়ের বেশি, তিন মাসও না। অথচ তখনই যৌথ নদী কমিশন বা জেআরসি গঠনের আলোচনা হচ্ছে এবং ওই বছরের নভেম্বরে চুক্তি স্বাক্ষরিত হচ্ছে! আর কোনো রাষ্ট্রনায়ক নদী সুরক্ষায় স্বল্পতম সময়ের মধ্যে এমন সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছেন বলে আমার জানা নেই।
পরবর্তীকালে বাংলাদেশের নদীচিন্তা স্বাভাবিক কারণেই আরও বিস্তৃত হয়েছে। বিষয়টি বোঝা যায় সংবাদমাধ্যমে দিকে তাকালে। দেখা যাবে, নব্বইয়ের দশকের আগে নদী প্রধানত দুই কারণে সংবাদমাধ্যমের উপজীব্য হতো। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যৌথ নদী নিয়ে কোনো আলোচনা প্রসঙ্গে অথবা বন্যার পানি নদ-নদীর ‘বিপদসীমা’ অতিক্রম করলে। তখনো দখল প্রকট হয়ে ওঠেনি। দূষণ থাকলেও তা ছিল সংবাদমাধ্যমের নজরদারির বাইরে। নদী ঘিরে সংকট যত বেড়েছে, সংবাদমাধ্যমে এই ইস্যুর উপস্থিতি তত গাঢ় হয়েছে। নব্বইয়ের দশকের পর থেকে উপজীব্য হতে থাকে নাব্য সংকট, পানিবণ্টন, দখল, দূষণ, বাঁধ, পর্যটন, ভাঙন প্রভৃতি নদীকেন্দ্রিক বিষয়।
এ সময় নদীকে ‘ডেমোনাইজ’ করার প্রবণতাও বাড়ে। যেমন ভাঙনপ্রবণ নদীকে ‘রাক্ষসী’ বলে সম্বোধন করা হয়; তার ‘করাল’ গ্রাসের কথা বলা হয়। এই ভাঙন যে আসলে নদীর চিৎকার; উজানে পানি প্রত্যাহারের কারণে তার ছটফটানি মাত্র এই সহানুভূতি আমাদের নদীচিন্তায় অনুপস্থিত।
আমরা দেখব, নদীর কান্নার বিষয়টিও বাংলাদেশের নদীচিন্তায় কীভাবে বাঙময় হয়ে উঠেছে। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ তার ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ দেখিয়েছেন, সমাজে যখন অবিচার ও অনাচার বেড়ে যায়, তখন নদী কাঁদে। তিনি লিখেছেন ‘নদী যদি কেঁদে থাকে তবে নিজের দুঃখে নয়, কুমুরডাঙ্গার অসহায় অধিবাসীদের দুঃখেই কেঁদেছিল।’
তথাকথিত আধুনিককালেও নানা গবেষণা ও সমীক্ষায় দেখছি, নদ-নদীর স্বাস্থ্যের সঙ্গে সমাজ ও রাষ্ট্রের বিদ্যমান কাঠামোর সম্পর্ক রয়েছে। যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সুশাসন ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যত আদৃত, সেখানে নদী দখল ও দূষণের হার ও মাত্রা তত কম। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ জাপান। সেখানকার নদীগুলোর পরিস্থিতি আমাদের চেয়েও নিকৃষ্ট ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সেখানে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার যত প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয়েছে, নদীর পরিস্থিতি তত উন্নত হয়েছে।
কথা হচ্ছে, নদীচিন্তার বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নদী সুরক্ষা-সংক্রান্ত তৎপরতাও পরিবর্তন হওয়া উচিত ছিল। দুর্ভাগ্যবশত, সেই কাজটি এখনো ছন্নছাড়া। এগুলোকে গুছিয়ে নিতে হবে; যেমন ব্যক্তি ও সামাজিক ক্ষেত্রে, তেমনই রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে।
লেখক : মহাসচিব, রিভারাইন পিপল
