ফেসবুকে কত ইস্যু আসে, কত ইস্যু যায়! কিছু হট্টগোল হয়ে আবার নতুন ব্যাপার নিয়ে মেতে উঠে নেটিজেনরা। ফলে, কিছুদিন আগে যখন দেখলাম মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষায় পরীক্ষার্থীর খাতা ছেঁড়া নিয়ে হট্টগোল। শুরুতে অতটা গা করি নাই।
এরপর দেখলাম ঘটনা পালটে গেছে। অভিযুক্ত ছাত্রীর অভিযোগ নাকি বানোয়াট। সেই ছাত্রী পরীক্ষা খারাপ দেওয়ায়, ভয়ে, আশঙ্কায় একটি বানানো নাটক সাজিয়েছেন।
তিনি অভিযোগ করেছিলেন, পরীক্ষায় অসৎ উপায় অবলম্বন করছে এই সন্দেহে একজন পর্যবেক্ষক উনারটাসহ তিন শিক্ষার্থীর ওএমআর শিট ছিঁড়ে ফেলেন। পরে ওই পর্যবেক্ষক নিজের ভুল বুঝতে পারেন। এরপর তাদের নতুন করে ওএমআর শিট দেন। কিন্তু ওই সময় পরীক্ষা শেষ হওয়ার মাত্র পাঁচ মিনিট বাকি ছিল। বারবার অনুরোধের পরও পরীক্ষার্থীদের জন্য পর্যবেক্ষক অতিরিক্ত সময় বাড়াননি।
এহেন অভিযোগ সামাজিকমাধ্যমে চাউর হলে লোকে ফেটে পড়ে। কিন্তু দিন দু-এক দিন আগে তদন্ত প্রতিবেদন এবং সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে জানা যায় যে, ওই তরুণী শিক্ষার্থী ঘটনার দুই দিন পর বানোয়াট এই অভিযোগ পেশ করেছিল। আর এই চিত্রনাট্যের লেখক-পরিচালক তারই বাবা-মা! যাদের দায়িত্ব সন্তানকে মানুষ বানানো, তারাই এই মেয়েটির জীবনযুদ্ধের শুরুতেই অসততার শিক্ষা দিল।
কাকতালীয়ভাবে, ফেসবুক ঘাটতে গিয়েই একটা পুরোনো খবর মেমোরিতে এল। ঠিক ছয় বছর আগে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছিল রাজধানীর এক স্কুলের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের অভিভাবকেরা মিলে চাঁদা দিয়ে একটি তহবিল করেছিলেন। সেই তহবিলের উদ্দেশ্য কি ছিল? প্রতি পরীক্ষার আগেই ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করা। শুধু কি তাই? সেই প্রশ্নের চটজলদি সমাধানের জন্য নিয়োগ করা হয়েছিল একদল শিক্ষকও। ওই তহবিল থেকেই অর্থ দেওয়া হতো এই জীবন গড়ার কারিগরদের।
বাপ-মা হলেই যে ধোয়া তুলসী পাতা হবেন এমনটা ভাবার কারণ নাই। ঈশপ তো সেই কোন যুগে গল্পে লিখেছিলেন এক দাগি আসামি ফাঁসির আগে শেষ ইচ্ছা পোষণ করেছিল মায়ের সঙ্গে দেখা করবে। সেই ইচ্ছাপূরণ হওয়ার পর সে মায়ের কানে কানে কথা বলার ভান করে কানে এক রাম কামড় দিয়ে বসে। মাসহ সবাই বিস্মিত হয়ে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে ছেলেটি বলে, তোমার মনে আছে মা প্রথম দিন স্কুলে গিয়ে আমি একটা পেনসিল চুরি করেছিলাম। তুমি সেই দিন আমাকে বকা না দিয়ে উল্টা খুশি হয়েছিল। সেদিন যদি তুমি আমার কানটা মলে দিতে আমি ধীরে ধীরে দাগি আসামি হতাম না।
কিন্তু, এই দায় কি কেবল বাবা মারই? আমাদের সামাজিক ব্যবস্থার কি দায় নেই? যেই সমাজ ব্যবস্থা কেবল টাকাপয়সা আর যশ ছাড়া বাকি সবকিছুকে পরিত্যক্ত, ব্যর্থ, অচল মনে করে!
বাবা-মা জানেন, সততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা এই ধরনের আলাপ এই ব্যবস্থায় বাখোয়াস। রেসে হেরে যাওয়াদের সান্ত্বনা বুলি। জিততে হবে, যে কোন প্রকারে। উইনার টেকস ইট অল।
ছেলেমেয়রা পরীক্ষায় ভালো না করলে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হতে পারবে না। সেগুলো না হতে পারলে টাকা পয়সা কামাতে পারবে না। বিসিএস অফিসার না হলে ক্ষমতা আর বিপুল ঘুষ জুটবে না।আর এগুলো না হলে, যে জীবন কাটাতে হবে তা ভয়াবহ। বাপ-মা সেই দুঃস্বপ্নও দেখতে চান না। তাই একটা সময় সততার বাঁধ ভেঙে যায়।
বর্তমানে আমাদের সমাজ ব্যবস্থার প্রচলিত রূপ ভেঙে সেই দায়িত্ব বর্তেছে রাষ্ট্র আর বাজারের কাছে। আগে সমাজ একজনকে আগলে রাখত, নিরাপত্তা দিত। আবার, তাঁর সমস্ত রকম বস্তুগত চাহিদাও মেটাতো। আর সমাজের এই ঋণ ব্যক্তি শোধ করত সামাজিক নিয়মকানুন মেনে।
সমাজ যেটা করত তা হচ্ছে, বিত্ত আর সম্মানের একটা ভারসাম্য রাখা। প্রতি যুগেই অসৎ, দুর্নীতিবাজ লোক ছিল, কিন্তু সামাজিক বন্ধন শক্ত হলে এদের খারাপ কাজকে খারাপভাবেই দেখার সুযোগ থাকে। তুমি বাপু যতই ধনী হও, তুমি চোর। তোমার যতই ডিগ্রি থাক, তুমি অসৎ উপায়ে পাশ করেছ তা আমরা জানি। সামাজিকভাবে এই বক্র দৃষ্টি, হীন করে রাখা যেনতেন প্রকারে সাফল্য হওয়াটাকে নিরুৎসাহিত করত।
অন্যদিকে স্বল্প বেতনের শিক্ষক কিংবা মসজিদের ইমাম পাইতেন অসীম শ্রদ্ধা। মুজতবা আলীর মাস্টারমশাই গল্পে আমরা দেখি মাস্টারের আট সদস্য বিশিষ্ট পরিবারের আয় আর সাহেবের কুকুরের এক ঠ্যাং এর পেছনে ব্যয় সমান। নিদারুণ এই গল্প আমাদের প্রচণ্ড কষ্ট দেয়, কিন্তু আমরা মাস্টারমশাইয়ের সততার একটা তেজও দেখি (এর মানে এই না শিক্ষকের বেতন এত অমানবিক হবে। এই বড় আলাপ অন্যত্র)। এখনকার দিনে এই তেজটা দেখানোর রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে বাজারকেন্দ্রিক সমাজ ব্যবস্থা । স্কুলের কমিটি হোক আর মসজিদের কমিটি, সেসব জায়গার নেতা হবেন সবচেয়ে বড় চোরটি। সবচেয়ে বড় লুটেরাটি।
এই সব চোর আর লুটেরাদের বরাবরই ক্ষমতা ছিল। কিন্তু একটা সামাজিক প্রতিরোধও ছিল। অন্তত একটা ঘেন্না বা অবজ্ঞার দৃষ্টি ছিল। কিন্তু, এখন সর্বনাশের চূড়ান্ত হয়ে গেছে, সেই দৃষ্টিগুলো, সেই মানসিকতাকে পুরোপুরি বাতিল করে দিতে পেরেছে বাজারভিত্তিক ব্যবস্থা। বড় চোরদের এখন মন থেকেই সবাই শ্রদ্ধা করা শিখে যাচ্ছে, চোর না হওয়াটাকে ভাবছে দুর্বলতা।
বাজার তাঁর পণ্য বেচার জন্য যৌথ পরিবার ভেঙে অণু পরিবার ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করতে বিপুল প্রচার করে সফল হয়েছে। আমাদের সামনে রাখা হচ্ছে অগণিত, অপ্রয়োজনীয় সব পণ্য। বিজ্ঞাপনের চমকে আমরা মনে করছি এগুলো না হলেই না! আমাদের এই অসীম কেনার লড়াইয়ে, ভোগের লড়াইয়ে থাকতে হবে আজীবন।
এই লড়াইয়ে থাকতে হলে মানবজীবনকে অর্থ আর যশ কামানোর যন্ত্রে পরিণত করে একে চালু রাখতে হবে চিরকাল। এই যজ্ঞে মানবিকতা, সততা এইগুলো পরিত্যাজ্য। যেই সমাজ ভারসাম্য রাখে তাঁকে ভেঙে দেওয়া জরুরি।
আর তাই, সেই অসৎ উপায় অবলম্বন করা ছাত্র আর অভিভাবকেরা এই বিপুল যজ্ঞের শিকার। তবে শিকার বলে এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই। যত বড় যজ্ঞই হোক, যত দৃঢ় ব্যবস্থাই হোক, আমাদের মানুষের জীবন ফিরিয়ে আনার লড়াই চালাতে হবে। সামষ্টিক এবং ব্যক্তিগতভাবে।
