শাবান মাসের রোজা ও আমল

আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০১:৩০ এএম

রোজা সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদতগুলোর অন্যতম, দয়াময় আল্লাহতায়ালা নৈকট্য অর্জনে অধিকতর সহায়ক একটি মাধ্যম এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ মহৎ সৎকাজ। রোজার পরিচয় হলো রোজা ভঙ্গকারী জিনিস থেকে বিরত থাকা, কাম-প্রবৃত্তি ত্যাগ করা এবং হারাম বিষয় পরিহার করা।

রোজার উদ্দেশ্য হলো আল্লাহকে ভয়, আত্মাকে পরিশুদ্ধ ও ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে পবিত্র রাখা এবং মহান আল্লাহর কাছ থেকে প্রতিদান ও পুরস্কার লাভ করা।

রোজা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সর্বোত্তম মাধ্যমগুলোর একটি, মহৎ কাজগুলোর অন্যতম এবং বিশাল সওয়াবের কাজ। আর এটা ধৈর্যশীলদের ইবাদত, মুত্তাকি বান্দাদের পাথেয় এবং সফলকামীদের সম্পদ। রোজার মর্যাদা হিসেবে এটাই যথেষ্ট যে, আল্লাহতায়ালা আদম সন্তানের আমলকে দুটি অংশে বিভক্ত করেছেন, অতঃপর রোজাকে স্বতন্ত্র অংশ হিসেবে নিজের দিকে সম্পৃক্ত করেছেন। আর অবশিষ্ট সব আমলকে এক অংশের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আদম সন্তানের প্রত্যেক সৎকর্ম কয়েকগুণ বর্ধিত করা হয়। একটি নেকি দশগুণ থেকে নিয়ে সাতশগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। মহান আল্লাহ বলেন, কিন্তু রোজা ছাড়া। কেননা, তা আমার উদ্দেশ্যে পালিত হয়। আর আমি নিজেই তার পুরস্কার দেব। সে পানাহার ও কাম-প্রবৃত্তি আমার উদ্দেশ্যেই বর্জন করে। রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দময় মুহূর্ত রয়েছে। একটি আনন্দ হলো ইফতারের সময় আর অন্যটি তার প্রতিপালকের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে।’ (সহিহ মুসলিম)।

আর সহিহ বোখারিতে রয়েছে, ‘আদম সন্তানের প্রতিটি কাজ তার নিজের জন্যই, তবে রোজা ব্যতীত। তা আমার জন্য এবং আমি নিজেই তার পুরস্কার দেব। রোজা পালনকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশকের চেয়েও অধিক সুগন্ধময়।’

হজরত সাহল বিন সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জান্নাতে রাইয়ান নামক একটি দরজা আছে। এ দরজা দিয়ে কেয়ামতের দিন রোজা পালনকারীরাই প্রবেশ করবে। তাদের ছাড়া আর কেউ এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। বলা হবে, রোজা পালনকারীরা কোথায়? তখন তারা এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। যখন তাদের সর্বশেষ ব্যক্তি প্রবেশ করবে তখন দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে। যাতে এ দরজা দিয়ে আর কেউ প্রবেশ না করে।’ (সহিহ মুসলিম)।

সুতরাং রোজা হলো জাহান্নামের আগুন থেকে ঢাল ও সুরক্ষাস্বরূপ। আর পাপ কাজ সম্পাদন, কাম-প্রবৃত্তি ও শয়তানের অনুসরণ থেকে বাধাস্বরূপ। রোজা পালনকারীর জন্য দুটি খুশির মুহূর্ত রয়েছে এবং তার জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক একটি দরজা রয়েছে।

সর্বোত্তম রোজা হলো রমজান মাসের রোজা পালনের মাধ্যমে ইসলামের আবশ্যকীয় রুকন আদায় করা আর সর্বোত্তম নফল রোজা হলো শাবান মাসের রোজা। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) শাবান মাস ছাড়া বছরের অন্য কোনো মাসে এত অধিক রোজা পালন করতেন না।’ (সহিহ মুসলিম)।

হজরত আয়েশা (রা.) থেকে আরও বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) একাধারে এত বেশি রোজা পালন করতেন যে, আমরা বলাবলি করতাম, তিনি আর রোজা পরিত্যাগ করবেন না। আবার কখনো এত বেশি রোজা না করে একাধারে কাটাতেন যে, আমরা বলাবলি করতাম, তিনি আর নফল রোজা পালন করবেন না। আমি রাসুল (সা.)-কে রমজান ছাড়া কোনো পুরো মাসের রোজা পালন করতে দেখিনি এবং শাবান মাসের চেয়ে কোনো মাসে বেশি নফল রোজা পালন করতে দেখিনি।’ (সহিহ বোখারি)।

হজরত উসামা বিন জায়েদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমি আপনাকে তো শাবান মাসে যে পরিমাণ রোজা পালন করতে দেখি, বছরের অন্য কোনো মাসে সে পরিমাণ রোজা পালন করতে দেখি না। তিনি বললেন, শাবান মাস রজব ও রমজানের মধ্যবর্তী এমন একটি মাস, যে মাসের গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষ খবর রাখে না; অথচ এ মাসে আমলনামা আল্লাহর কাছে উত্তোলন করা হয়। তাই আমি পছন্দ করি যে, আমার আমলনামা আল্লাহর কাছে উত্তোলন করা হবে আমার রোজা পালন অবস্থায়।’ (সুনানে নাসায়ি)।

হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে মাসসমূহের মধ্য থেকে শাবান মাসে রোজা পালন করা অধিক প্রিয় ছিল।’ (মুস্তাদরাকে হাকেম)

সুতরাং অন্যান্য মাস অপেক্ষা শাবান মাসে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নফল রোজা অধিক ছিল এবং তিনি শাবান মাসের অধিকাংশ দিনে রোজা পালন করতেন।

অতএব, হে আল্লাহর বান্দারা! আপনারা সাধ্যানুযায়ী শাবান মাসে রোজা পালন করুন এবং আল্লাহতায়ালাকে উত্তম ঋণ প্রদান করুন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তোমাদের নিজেদের জন্য ভালো যা কিছু অগ্রিম পাঠাবে তোমরা তা পাবে আল্লাহর কাছে। তা উৎকৃষ্টতর এবং পুরস্কার হিসেবে মহত্তর। আর তোমরা ক্ষমা প্রার্থনা করো আল্লাহর কাছে; নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা আল-মুজজাম্মিল : ২০)।

হে মুসলিম সম্প্রদায়! আল্লাহতায়ালা আপনাদের অনর্থক সৃষ্টি করেননি আর আপনাদের এমনি ছেড়েও দেবেন না। তিনি জীবন ও মৃত্যুকে সৃষ্টি করেছেন আপনাদের মধ্যে কে উত্তম আমলকারী তা পরীক্ষার জন্য। সুতরাং আপনারা মৃত্যু আসার আগেই আমলের দিকে অগ্রসর হোন, পরীক্ষা ও প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত হোন, আপনাদের কাজের সঙ্গে কথাকেও উন্নত করুন, হিসাবের সম্মুখীন হওয়ার আগেই আত্মসমালোচনা করুন এবং মহান, ক্ষমতাধর আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের প্রস্তুতি নিন।

শাবান এমন একটি মাস যে মাসে আল্লাহর কাছে আমলসমূহ উপস্থাপন করা হয়। সুতরাং শেষ সময়ের আমলের ক্ষেত্রে অগ্রগামী হোন। কেননা আমলের ভালো-মন্দ নির্ভর করে তার শেষ অবস্থার ওপর। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের জন্য উত্তম আদর্শ, তিনি শাবান মাস সম্পর্কে বলেছেন, ‘এ মাসে আমলনামা আল্লাহতায়ালার কাছে উত্তোলন করা হয়। তাই আমি পছন্দ করি যে, আমার আমলনামা আল্লাহর কাছে উত্তোলন করা হবে আমার রোজা পালন অবস্থায়।’ (সুনানে নাসায়ি)।

উদাসীনতার সময়ে ইবাদত করা আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম, বিশ্ব পালনকর্তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ, গাফেলদের জন্য সতর্কীকরণ এবং মুমিনদের জন্য উপকারী উপদেশ।

শাবান মাস ইবাদতের এমন মৌসুম, যা থেকে অধিকাংশ মানুষ গাফেল থাকে। কাজেই আপনারা এ মাসের সময়গুলোকে কাজে লাগাতে আগ্রহী হোন, এ মাসের দিন ও মুহূর্তগুলোকে মূল্যায়ন করুন, আল্লাহর উপহারের দিকে অগ্রসর হোন ও তার সন্তুষ্টি অনুসন্ধান করুন। তাছাড়া নবী কারিম (সা.) এ মাসের দিনগুলোতে অধিক পরিমাণে রোজা রাখতেন, তিনি বলেছেন, ‘শাবান মাস রজব ও রমজানের মধ্যবর্তী এমন একটি মাস যে মাসের গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষ খবর রাখে না; অথচ এ মাসে আমলনামাসমূহ রাব্বুল আলামিনের কাছে উত্তোলন করা হয়। তাই আমি পছন্দ করি, আমার আমলনামা আল্লাহর কাছে উত্তোলন করা হবে আমার রোজা পালন অবস্থায়।’ (সুনানে নাসায়ি)।

সুতরাং আপনারা গাফিলতি থেকে সতর্ক হোন, কেননা তা বান্দা ও রবের মধ্যকার সম্পর্ককে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর আপনি আপনার রবকে নিজ মনে স্মরণ করুন সবিনয়ে, সশঙ্কচিত্তে ও অনুচ্চস্বরে, সকালে ও সন্ধ্যায়। আর উদাসীনদের অন্তর্ভুক্ত হবেন না।’ (সুরা আল আরাফ : ২০৫)

যার ওপর গত রমজান মাসের রোজা বাকি রয়েছে, সে যেন শাবান মাস শেষ হওয়ার আগেই তা আদায় করে নেয়। কেননা এক রমজানের রোজা পরবর্তী রমজান পর্যন্ত বিলম্ব করা জায়েজ নেই।

আল্লাহতায়ালা আমাকে ও আপনাদের তার পছন্দনীয় ও সন্তোষজনক কাজের তওফিক দান করুন এবং আমার ও আপনাদের থেকে সৎআমলগুলো কবুল করুন।

১৬ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার, মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। অনুবাদ: মুহাম্মদ আতিকুর রহমান

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত