সুন্নতে খতনা করাতে গিয়ে রাজধানীর ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশু আয়ানের মৃত্যুর রেশ না কাটতেই এবার মালিবাগের জেএস ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড মেডিকেল চেকআপ সেন্টারে আরেক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আহনাফ তাহমিন আয়হাম (১০) নামের ওই শিশু মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র ছিল।
আহনাফের স্বজনদের অভিযোগ, ওই হাসপাতালের ডা. এস এম মুক্তাদিরের তত্ত্বাবধানে গত মঙ্গলবার রাতে আহনাফকে খতনা করাতে নিয়ে যান বাবা ফখরুল আলম ও মা খায়কুন নাহার চুমকি। লোকাল অ্যানেস্থেশিয়া দিয়ে খতনা করার কথা থাকলেও ফুল অ্যানেস্থেশিয়া দেওয়া হয় আহনাফকে, যে কারণে তার জ্ঞান ফেরেনি।
আহনাফের বাবা বাদী হয়ে হাতিরঝিল থানায় কর্তব্যে অবহেলার কারণে মৃত্যুর অভিযোগে একটি মামলা করেছেন। মামলায় ইতিমধ্যে হাসপাতালটির দুই চিকিৎসক ডা. এস এম মুক্তাদির ও ডা. মাহবুবকে গ্রেপ্তার করেছে হাতিরঝিল থানা-পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত ডা. মোক্তাদির জে এস হাসপাতালের মালিক। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) অর্থোপেডিক সার্জন। ডা. মাহবুব একই হাসপাতালের অবেদনবিদ্যা (অ্যানেস্থেসিওলজি) বিভাগের চিকিৎসক। মামলার আরেক আসামি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক ইশতিয়াক আজাদ পলাতক রয়েছেন। মামলায় তিনজনের নামে ও অজ্ঞাতপরিচয়ের আরও পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়।
গ্রেপ্তার দুই চিকিৎসককে গতকাল বুধবার আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হাতিরঝিল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রুহুল আমিন। আসামিপক্ষের আইনজীবী রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিনের আবেদন করেন। বিচারক তাদের রিমান্ড ও জামিন নামঞ্জুর করে দুই দিন জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন।
শিশু আহনাফের মৃত্যু হয়েছে যে ডায়াগনস্টিক ও মেডিকেল সেন্টারে তার ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালনার লাইসেন্স থাকলেও হাসপাতাল পরিচালনার অনুমতি ছিল না বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। প্রতিষ্ঠানটি সিলগালা করে দিয়েছে অধিদপ্তর।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. আবু হোসেন মো. মইনুল আহসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটির ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অনুমোদন থাকলেও হাসপাতাল পরিচালনার অনুমোদন ছিল না। আমরা তাদের সব কার্যক্রম বাতিল করেছি। ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স বাতিল করার প্রক্রিয়াও শুরু করেছি। অনুমোদন না নিয়ে মেডিকেলসেবা পরিচালনার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
আহনাফের মৃত্যুর কারণ জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এ পরিচালক বলেন, ‘আমরা ওই প্রতিষ্ঠানে গিয়ে কাউকে পাইনি, ফলে শিশুটির মৃত্যুর কারণ এখনো জানতে পারিনি। তার পরিবার অভিযোগ করেছে, খতনা করার সময় তার মৃত্যু হয়েছে। বিস্তারিত তদন্তের পর মৃত্যুর কারণ জানা যাবে।’
আহনাফের বাবা ফখরুল আলম কান্নাজড়িত কণ্ঠে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আহনাফকে যখন ওটিতে দিলাম, আমার ছেলেটি বলছিল বাবা ভয় লাগতেছে। আমি বলেছিলাম, বাবা কোনো সমস্যা নেই, আল্লাহ ভরসা। এরপর ওটিতে ঢুকল আর সব শেষ। আমার সুস্থ সন্তানকে মেরে ফেলা হলো।’
তিনি বলেন, ‘আমরা চিকিৎসককে বলেছিলাম যেন ফুল অ্যানেস্থেশিয়া দেওয়া না হয়। তারপরও তা করেন ডাক্তার মুক্তাদির। আমি তাদের শাস্তি চাই। আমি চাই দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক, যাতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে।’
এর আগে গত ৩১ ডিসেম্বর সুন্নতে খতনা করানোর জন্য আয়ান নামে এক শিশুকে রাজধানীর ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অভিভাবকদের অনুমতি ছাড়াই তাকে পূর্ণমাত্রার অ্যানেস্থেশিয়া দিয়ে খতনা করান চিকিৎসক। জ্ঞান না ফেরায় তাকে আরেকটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গত ৮ জানুয়ারি পাঁচ বছর বয়সী শিশুটি মারা যায়।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী ‘মর্মাহত’ : রাজধানীর মালিবাগের জেএস ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড মেডিকেল চেকআপ সেন্টারে খতনা করাতে গিয়ে শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. সামন্ত লাল সেন। গতকাল এক বিবৃতিতে মন্ত্রী বলেন, ওই ঘটনায় তিনি ‘অত্যন্ত মর্মাহত’; দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী এক বিশেষ বিবৃতিতে বলেন, ‘এ ঘটনায় আমি অত্যন্ত মর্মাহত। কিছুদিন আগেও এমন একটি ঘটনা আমরা লক্ষ্য করেছি। সে ঘটনায় আমরা উপযুক্ত ব্যবস্থাও নিয়েছি। তবে সেই ঘটনার পরও যারা সতর্ক হতে পারেনি, এ রকম আর কারও কোনোরকম দায়িত্বে অবহেলা বা গাফিলতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। দোষী প্রমাণিত হলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির বিরুদ্ধে শুধু কঠোর ব্যবস্থা নেওয়াই হবে না, ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলাকারী দোষীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, যাতে পরে আর কোনো প্রতিষ্ঠান এ রকম গুরু দায়িত্বে অবহেলা করতে সাহস না পায়। চিকিৎসায় অবহেলা পাওয়া গেলে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অন্যদিকে, রাজধানীর ল্যাব এইড হাসপাতালে ঘটে যাওয়া অন্য আরেকটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেও বিবৃতি দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ল্যাব এইড হাসপাতালে এনডোস্কপি করাতে গিয়ে একজনের মৃত্যুর ঘটনায় গত মঙ্গলবার সেখানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পরিদর্শন করা হয়েছে যার রিপোর্ট ২২ ফেব্রুয়ারি হাতে আসবে। রিপোর্ট দেখে সে বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
