কিছুদিন আগেই শেষ হওয়া অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক ছিলেন মাহফুজুর রহমান রাব্বি। পাকিস্তানের কাছে ৫ রানে হেরে সুপার সিক্স থেকে বিদায় নেয় বাংলাদেশ। বিশ্বকাপের পর প্রিমিয়ার লিগ সামনে রেখে নতুন স্বপ্ন দেখছেন উঠতি এই ক্রিকেটার। দেশ রূপান্তরের সামীউর রহমানকে জানালেন আগামীর স্বপ্ন।
অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ শেষে এই মুহূর্তে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সম্পৃক্ততা তো আপনার আর নেই। সামনে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ, কোনো ক্লাব থেকে কি যোগাযোগ করেছে?
রাব্বি : এই মুহূর্তে বিসিবির সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। প্রিমিয়ার লিগে খেলার জন্য গাজী গ্রুপ ক্রিকেটার্সে চুক্তিবদ্ধ হয়েছি।
গত মৌসুমে কি প্রিমিয়ার লিগে খেলেছিলেন, নাকি এবারই প্রথম খেলতে যাচ্ছেন?
রাব্বি : গত বছর প্রথম বিভাগ ক্রিকেটে খেলেছি, প্রিমিয়ারে এবারই প্রথম।
বিশ্বকাপের আগে এশিয়া কাপে আপনাকে অধিনায়কত্ব দেওয়া হয়েছিল। প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ এশিয়া কাপ জেতে। অধিনায়ক হয়ে দলের সদস্যদের প্রতি আপনার বার্তাটা কী ছিল?
রাব্বি : আমার আসলে বিশেষ কোনো বার্তা ছিল না। সবকিছু সহজ স্বাভাবিক রাখা। পুরনো যে ভুলগুলো ছিল, সেগুলো শুধরে নেওয়া। খেলোয়াড়দের কীভাবে মানসিকভাবে উদ্দীপ্ত রাখা যায়, কীভাবে তাদের কাছ থেকে সেরা পারফরম্যান্সটা বের করে আনা যায়, এতটুকুই চেষ্টা করেছি।
অনূর্ধ্ব-১৯ এশিয়া কাপ জেতাটা কি একটু চাপ হয়ে গিয়েছিল বিশ্বকাপে গিয়ে? বিশেষ করে খেলা যেহেতু দক্ষিণ আফ্রিকায় ছিল, যেখানে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ^কাপ জিতেছে...
রাব্বি : ওরকম আসলে কোনো চাপ ছিল না। আমরা স্থির করেছিলাম ভালো কিছু করব। ভালো ক্রিকেট খেলব। এ রকম ইচ্ছা ছিল সবারই। বিশ্বকাপটা আসলে ভাগ্যের ব্যাপার। শেষ মুহূর্তে পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটা আমাদের খুব একটা ভাগ্য সহায়তা করেনি, চাপের মুখে সবাই ভেঙে পড়েছি। তা ছাড়া অস্ট্রেলিয়াও ভালো দল ছিল। আসলে আমাদের খুব ভালো একটা সুযোগ ছিল ফাইনালে খেলার।
পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচের আগে বাংলাদেশের সামনে সমীকরণ ছিল। শুধু জিতলেই হবে না, রানরেট বাড়াতে হবে। ১৫৫ রান, ৩৮ ওভার ১ বলে করতে হবে। মনে হচ্ছিল এই রানটা তাড়া করা সম্ভব, দুই ইনিংসের বিরতিতে সতীর্থদের কী বলেছিলেন? কোচ কী বলেছিলেন?
রাব্বি : আমি ব্যাটসম্যানদের স্বাভাবিক খেলাটাই খেলতে বলেছিলাম। আমাদের ব্যাটিং বেশ শক্তিশালী। আমি বলেছিলাম ৩৮ ওভারের হিসাবটা মাথায় না নিতে। ৩৮ ওভার যদি আমরা আমাদের স্বাভাবিক ব্যাটিংটাই করতে পারি, তাহলেও ২০০ রান হওয়া সম্ভব ছিল। আমরা ওভার, রানরেট এসব নিয়ে একদমই দুশ্চিন্তা করিনি। পাকিস্তান খুব ভালো বোলিং করেছে।
ম্যাচের ভাগ্য তো পেন্ডুলামের মতো দুলেছে। কখন মনে হয়েছিল যে এই ম্যাচটা জিতবেন আর কখন খারাপ লেগেছে সবচেয়ে বেশি?
রাব্বি : ম্যাচের শুরু থেকেই মনে হচ্ছিল আমরা হারব না। ওরা যখন ১৫৫ রান করল, তখন মনে হয়েছে হারব না। শেষে মারুফ আর বর্ষণ যখন ব্যাট করছিল তখনো মনে হয়েছে হারব না। তখন আসলে নেগেটিভ কিছুই ভাবছিলাম না।
কিন্তু শেষে এসে যখন হেরে গেলেন, তারপর কী হয়েছিল? হোটেলে অন্য সবার অবস্থা কেমন ছিল?
রাব্বি : আসলে বলে বোঝাতে পারব না কতটা খারাপ লেগেছে। মনে হচ্ছিল যে খুব প্রিয় কিছু জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। কেউ আসলে ভাবেনি এ রকম কিছু হবে। ওই রাতটা কেউ আসলে ঘুমাতে পারেনি। মাঠ থেকে যখন হোটেলে যাই, তখন মনে হচ্ছিল কিছু একটা রেখে যাচ্ছি। খুবই কষ্টের একটা মুহূর্ত ছিল আমাদের জন্য।
সবাই খুবই কম বয়সের, এই সময়ে আবেগটা প্রবল হয়। দলের কেউ কি খুব ভেঙে পড়েছিল, হাউমাউ করে কেঁদেছিল?
রাব্বি : আমাদের পেসার ইমন (ইকবাল হোসেন) খুব ভেঙে পড়েছিল। আসলে সবাই খুব কান্নাকাটি করেছিল, এটা হবেই আসলে।
অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জিততে না পারলে সব শেষ হয়ে যায়নি; বরং আপনাদের পথচলা মাত্র শুরু হলো। এখন সামনের দিনগুলোতে পরিকল্পনা কী?
রাব্বি : প্রথম লক্ষ্য সামনে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে ভালো একটা পারফরম্যান্স করে নজর কাড়তে পারলে হয়তো বিসিবির হাই পারফরম্যান্স প্রোগ্রামে চলে আসব। ওখানে খুব ভালো প্র্যাকটিস হয়, বিদেশি কোচ থাকে। ভালো একটা প্রস্তুতি, অনুশীলন, দিকনির্দেশনা সবকিছুই পাওয়া যাবে। মূল লক্ষ্য আপাতত প্রিমিয়ার লিগে ভালো করে এইচপি দলে সুযোগ পাওয়া।
যখন বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে খেলা হয়, তখন প্রতিপক্ষও থাকে সমান বয়সের। কিন্তু যখন পেশাদার ক্রিকেটের দুনিয়ায় চলে আসা হয়, তখন দেখা যায় প্রতিপক্ষের কোনো কোনো ক্রিকেটারের খেলোয়াড়ি জীবনটাই হয়তো আপনার বয়সের কাছাকাছি। এই অভিজ্ঞতার তারতম্যটাই কি বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের সঙ্গে পেশাদার ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় পার্থক্য বলে মনে হয় আপনার কাছে?
রাব্বি : এটা তো অবশ্যই, অভিজ্ঞতা অবশ্যই একটা ব্যবধান গড়ে দেয়। অভিজ্ঞতা অবশ্যই দরকার। তবে এ রকম কোনো ভাবনা যদি মাথায় চলে আসে যে উনি তো আমার চেয়ে অনেক অভিজ্ঞ, ওনার সঙ্গে পারব না তাহলে আবার ভালো করা যাবে না। অভিজ্ঞতা কাজ করবে, তবে খেলাটা তো আসলে ব্যাটে-বলে।
অতীতে অনেক সময় দেখা গেছে, অনূর্ধ্ব-১৯ দলের সাফল্যে চটজলদি অনেকেই জাতীয় দলে চলে আসেন এবং পরে তারা আর নিজেদের জায়গা পাকা করতে পারেন না, হারিয়ে যান। আগে অভিষেক হয়ে গেলে ক্যারিয়ারটা অনেক সময়ই বড় হয় না। এ ব্যাপারে কী মনে করেন?
রাব্বি : এটা আমার কাছেও মনে হয়। আমি চাই আগামী অন্তত দুই বছরের মধ্যে যেন আমার জাতীয় দলে অভিষেক না হয়। জাতীয় দলে আসার আগের সময়টায় আমি যতটা সম্ভব শিখতে চাই, তৈরি হতে চাই। তিন-চার বছর আমি যদি পেশাদার ক্রিকেট খেলি, নিজের স্কিল ডেভেলপ করি এবং পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিতে পারি, তাহলে জাতীয় দলে এলে আমার জন্য কাজটা সহজ হবে। তাই আমার কাছে মনে হয় পরিণত হয়ে এবং প্রস্তুত হয়েই জাতীয় দলে আসাটা ভালো।
