জুমার নামাজের ওয়াজে খতিব সাহেব বলছিলেন, শবেবরাত আসছে। সেদিন আমল করবেন, যারা বলে আমল নেই, তারা লসে আছে। শবেবরাত নিয়েই আমাদের দেশে তিন ধরনের মতামত ঘুরছে একদল বলে এর কোনো ভিত্তি নেই, শুদ্ধতার বিচারে। অন্য দল বলে এর ভিত্তি আছে, পালন করা যাবে, কিন্তু উৎসব করা যাবে না। অন্য দল হালুয়া-রুটি দিয়ে শবেবরাত পালন করে উৎসব আকারে। মতপার্থক্যের এ তফাতটা শুধু ধর্মীয়ই থেকে যায় না, বরং এই মতের অনুসারীদের রাজনীতিতেও চলে আসে।
ইসলামে ওয়াজের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ওয়াজ সাধারণত দুই ধরনের হয়। জুমার ওয়াজ এবং মাঠে-ময়দানের ওয়াজ মাহফিল। প্রতি জুমায় এলাকার মসজিদের ইমাম সাহেব বাসিন্দাদের ইমান আমল ঠিক রাখার জন্য ওয়াজ করে থাকেন। আর মাঠের ওয়াজ এলাকাকেন্দ্রিক আয়োজিত হয়। এলাকার মাদ্রাসা বা যুবসমাজ আয়োজন করে। সামর্থ্য অনুযায়ী আলেম-ওলামাদের নিয়ে আসা হয়, তারা সেই এলাকার মানুষদের ধর্মীয় বিষয়ে দীক্ষা দেন, শিক্ষা দেন।
ইসলামের শুরু থেকেই ওয়াজ রাজনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে নানাভাবে। ব্রুস এম বর্থউইক তার ‘দ্য ইসলামিক সারমন এজ আ চ্যানেল অব পলিটিক্যাল কমিউনিকেশন’ (১৯৬৭) নিবন্ধে ওয়াজ নিয়ে বিস্তারিত বলেছেন। সেখানে তিনি ওয়াজের সেকাল-একাল বলেছেন। তিনি বলেছেন রাসুল (সা.) থেকেই ওয়াজের শুরু। হজরত মুহাম্মদ (সা.) যে রাষ্ট্র রেখে গেছেন তা একই সঙ্গে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক রাষ্ট্র ছিল। তাই শুরু থেকেই ইসলামের ওয়াজ ছিল যুগপৎভাবে ধর্ম ও রাজনীতির কাছে দায়বদ্ধ। হজরত মুহাম্মদ (সা.) একই কাজ করতেন। তার দেওয়া বয়ানে, কখনো তার নবীসত্তা প্রবল হতো, কখনো শাসকসত্তা। তার খলিফারাও একই কাজ করতেন।
ইসলামের সীমানা বেড়ে গেলে প্রদেশগুলোতে রাসুল (সা.) বা খলিফা কর্র্তৃক নিযুক্ত শাসকরা বয়ান করতেন। বাকি মসজিদগুলোতে খলিফা নিযুক্ত কিংবা প্রদেশপ্রধান নিযুক্ত কোনো আলেম ব্যক্তি নামাজ পড়াতেন এবং বক্তব্য দিতেন। আর যুদ্ধের ময়দানে সেনাবাহিনীর প্রধানের হাতে ছিল নামাজ পড়ানোর দায়িত্ব। এসব বক্তব্য সাধারণত শত্রুদের প্রতি শক্ত অবস্থানের বর্ণনা থাকত।
মুসলিম সাম্রাজ্যের সীমানা বেড়ে যাওয়ার পর শাসকরা নামাজের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন, তবে উপলক্ষের নিমিত্তে কখনো নামাজ পড়াতেন তারা। এ সময়ে বড় মসজিদে একজন শুক্রবারের নামাজের জন্য নির্ধারিত ছিলেন, যিনি জুমার নামাজ পড়াবেন এবং খুতবা পড়বেন। বাকি ওয়াক্তিয়া নামাজগুলোর দায়িত্ব ছিল অন্য আরেকজনের। আর ছোট মসজিদে একজনই সব করতেন। পরবর্তীকালে ক্রমেই মসজিদগুলো শাসকের হাত থেকে বেরিয়ে যেতে থাকে। শুধু তাতে শাসকের জন্য খুতবা পড়া হয়। আর বিদ্রোহমূলক কোনো বক্তব্য প্রদান করা যাতে না হয়, সেদিকে নজর দেওয়া হয়।
আসগার ফাতিহি লিখেছেন দ্য ইসলামিক পালপিট এজ আ মিডিয়াম অব পলিটিক্যাল কমিউনিকেশন, (১৯৮১) সেখানে তিনি রাসুলের পর থেকে কলোনিয়াল সময় পর্যন্ত কীভাবে ওয়াজের রাজনৈতিক ব্যবহার হয়েছে তাই লিখছেন। তিনি লিখেছেন, মসজিদ শুরু থেকেই কেবল উপাসনালয় হিসেবে নয় বরং সামাজিক মিলনকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। জুমার খুতবায় সবসময় একটা রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য বজায় থাকত শুরু থেকে। শুরুর সময়ে অনেক যুবরাজ, বিদ্রোহী নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি করতে চেয়েছে এই খুতবা বা বয়ানকে কাজে লাগিয়ে।
তবে ধর্মের শুরুর দিকে রাজধানীর বাইরে ধর্মের দুটো পদ ছিল, একজন খতিব ছিলেন, যিনি প্রাত্যহিক নামাজ পড়াতেন, শুক্রবারের খুতবা দিতেন। অন্যজন ছিলেন ক্বাস। ক্বাস সরকারি কোনো নির্দেশনা পড়ে শোনাতেন মসজিদে, মানুষের মাঝে। কিছু ইমাম, খতিব বা ক্বাস এই সময়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তাদের বক্তব্যের নিজস্বতার কারণে এবং মানুষ তাদের এতটাই ভক্ত হয়ে উঠত যে, যেকোনো অথরিটির বিপরীতে গিয়ে তারা তাদের পক্ষ নিতেও দ্বিধা করত না। আবার কখনো দুই বক্তার ভক্তদের মধ্যে গোল বেধে যেত।
এই গেল শুরুর অবস্থা। ইসলাম যখন আধুনিক সময়ে আসল, তখন আধুনিক সময়ের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে গিয়েও ওয়াজের মধ্যে নানা ধরনের রাজনৈতিকতা দেখা গেছে। বর্থউইক যেমন লিখেছেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মিসরের উলামারা নতুন বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে চাইলেন, এ সময়ে এসে তাদের শিক্ষাদীক্ষায় সমাজ, আধুনিক ভাষা, বিজ্ঞান, ইত্যাদির প্রবেশ ঘটল। মডার্ন সংস্কৃতি আর ট্র্যাডিশনাল ইসলামিক কালচারের মধ্যে একটা যোগসূত্র স্থাপন করতে চাইলেন বয়ান দিয়ে। ফলে এ সময়টায় আবার ওয়াজে নতুনত্ব আসে। তারা পুরো সমাজটাকেই ওয়াজের দ্বারা বদলে দেওয়ার, মানুষের আত্মাকে জাগিয়ে তোলার ব্যাপারে সচেষ্ট হন। বুঝিয়ে দিতে চান যে, ইসলাম হচ্ছে সামাজিক পরিবর্তন ও মুক্তি ধর্ম। এর ফলে আবার রাষ্ট্র এই বয়ান বা খুতবাকে নিজের হাতে নেওয়ার জন্য, এতে পরিমিতি আনার জন্য সচেষ্ট হয়। তারা তাদের রাষ্ট্রের ভাবনাকে কোরআন-হাদিসের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। ফলে আবার তা রাজনৈতিক যোগাযোগের একটা মাধ্যম হিসেবে পরিগণিত হতে শুরু করে।
বিশ শতকে এসে মিসর ঠিক করল, রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রশ্নের উত্তর দেবে ওয়াজগুলো, ফলে এ সময়ে সরকার কর্র্তৃক বয়ান লিখে দেওয়া হতো, নয়তো বয়ানে সরকার নির্ধারিত টপিকে আলোচনা করতে বলে দেওয়া হতো। ১৯৫২ সালে যখন আনোয়ার সাদাত ক্ষমতায়, তখন তিনি মিম্বরে বসতেন, ওয়াজ করতেন কখনো। তিনি বলতে চাইতেন, স্বাধীনতা ও ধর্মের অর্থ হচ্ছে, শোষণের উচ্ছেদ, মানুষের আত্মাকে স্বার্থপরতা থেকে মুক্ত করা, আগের সাম্রাজ্যের সব ধরনের প্রভাব থেকে মুক্ত করা। তাছাড়া আরব জাতীয়তাবাদ এবং আলজেরিয়ার যুদ্ধকেও ধর্মের আবরণ পরানো হয়েছিল। সেখানকার খুতবার টেক্সট ছিল, ‘হে বিশ্বাসীরা, ধর্ম তোমাদের ডাকছে তোমাদের আলজেরিয়ার স্বাধীনতা রক্ষায় সহযোগিতা করতে।’
ফাতিহি অবশ্য কিছু টুকরো ঘটনার উল্লেখ করেছেন, তার বইয়ে, সেখানে বলেছেন, অটোম্যান সময়ে এসে হালভেতি দরবেশদের সঙ্গে অর্থোডক্স মুসলমানদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। এ সময়ে দুপক্ষই নিজেদের মতপ্রকাশ ও জনমত গঠনের জন্য মিম্বরকে বেছে নেন। আর ব্রিটিশ ভারতে আবদুল আজিজ নামের একজন, দিল্লির মসজিদ থেকে ব্রিটিশ অধিভুক্ত সব জমিনকে ‘শত্রুর কবলিত জমিন’ বলে উল্লেখ করেছেন এবং এর বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য ফতোয়া দিয়েছেন। আর তাতে এই এলাকার মুসলমানরা ব্রিটিশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে একাট্টা হয়েছে, যুদ্ধও করেছে। ১৮৯০ সালে ইরানের সম্রাট নেজার উদ্দিন শাহ ইরানে ব্রিটিশ টোব্যাকোর অনুমোদন দেওয়াতে দেশটির তামাক ব্যবসায়ীরা মিম্বরের বা জুমার বয়ানের ফায়দা হাসিল করে। দুই বড় শহর ও রাজধানীর ধর্মীয় নেতারা মিম্বর থেকে এ অনুমোদনের বিপক্ষে বলেন। ফলে শাহকে এই অনুমোদন তুলে নিতে হয়। মিম্বরের বয়ান এতটাই কার্যকর ছিল যে, শাহের পরিবারও তার বিপক্ষে গিয়ে টোব্যাকো অনুমোদনের বিপক্ষে অবস্থানে নেয়।
এসব ছিল ওয়াজের বৈশ্বিক কনটেক্সট। বাংলাদেশেও ওয়াজ নানাভাবে রাজনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার হয়েছে। ফতোয়াবিরোধী আন্দোলন, মূর্তি নেমেসিস সরানোর আন্দোলন থেকে হেফাজত, সবটাই প্রায় সংগঠিত হওয়ার পেছনে ওয়াজ একটা গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ছিল। নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক নেতারা মসজিদে মসজিদে গিয়ে ‘ওয়াজ’ করেন। ওয়াজ মাহফিলের বিশেষ অতিথি দেখা যায় রাজনৈতিক নেতাকে। একই সঙ্গে ধর্মের অভ্যন্তরীণ চিন্তাগুলোও তাদের চিন্তার পসারে ওয়াজের ব্যবহার করেন শুরু থেকেই।
ধর্ম, তার কন্টেক্সটের পলিটিকস, কালচার সহযোগে মানুষের মধ্যে ক্রিয়া করে। সেই পলিটিকস, কখনো শুধু গোটা ধর্মের আইডিয়া, কখনো সাব আইডিয়ার সঙ্গে সেঁটে নানা প্রকল্পের রূপ নেয়। বাংলাদেশের সমাজেও ধর্ম নানাভাবে ক্রিয়া করেছে, প্রকল্পের রূপ নিয়েছে সেটাকে যেমন সালাফি বলা হয়, বলা হয় দেওবন্দি, কিংবা বেরেলভি।
আমার মাস্টার্সের গবেষণা অভিসন্দর্ভে বাংলাদেশের প্রভাবশালী তিনটি ধর্মীয় প্রকল্পের ওয়াজের রাজনৈতিক যোগাযোগের ডিসকোর্স দেখেছি, সেখানে দেখা গেছে, সালাফি ওয়াজে মসজিদ এবং ওয়াজ মাহফিল, যেই দুটো বয়ান নিয়েছি, সেখানে তারা মানুষের ইমান বিষয়ে যত্নশীল। অর্থাৎ তাদের বোঝাপড়ায় মানুষের ইমানে ঝামেলা আছে, ফলে সেটা ঠিক করার ব্যাপারে তাদের আগ্রহ বেশি। তাছাড়া এ অঞ্চলের সালাফিরা ওয়াজের মাঠে এখন নিজেদের ক্ষমতা সংহতির আলাপ করে, সেই আলাপটা হয় টেক্সটের শুদ্ধাশুদ্ধতার বিবেচনায়, কোন টেক্সট শুদ্ধ, কোন আমল শুদ্ধ, কোন জায়গায় অশুদ্ধতা ছেয়ে গেছে, এ আলাপ এখন তাদের ওয়াজে বেশি গুরুত্ব পায়। এই শুদ্ধাশুদ্ধের রাজনীতি আপনাকে তার দলভুক্ত করে দেবে এই মর্মে যে, অন্যদের ধর্মীয় চর্চা ধর্মানুযায়ী শুদ্ধতার সর্বোচ্চ মানদণ্ডে পড়ে না, ফলে তারা আপনার দলে আসবে।
অন্যদিকে দেওবন্দিরা যেহেতু অনেক সময় ধরেই এই অঞ্চলের ধর্মচর্চায় ও চিন্তায় প্রাধান্য বিস্তার করছে, ফলে তাদের ওয়াজগুলোতে সাধারণত ধর্মের বাইরে গিয়ে নানা আলাপ বেশি থাকে। ওয়াজে দেওবন্দিদের একটা বড় ধরনের অধিকারবোধ আছে। আলাপে বোঝাই যায়, তারাই একমাত্র সত্য, ক্ষমতাধর এবং একই সঙ্গে সংখ্যাগরিষ্ঠ। সেটা যেমন জুমার বয়ানে, একই সঙ্গে ওয়াজেও। দেওবন্দিরা বা দেওবন্দি চিন্তায় ধরেই নেওয়া হয় যে, শুধু তারাই সত্য। তাদের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই। ফলে আপনি ইসলাম পন্থায় আসবেন, মানে আপনি দেওবন্দি পন্থাতেই আসবেন। এ ব্যাপারটা সালাফি বা সুন্নিদের মধ্যে আসেনি তাদের বয়ানে দলভারী করার আকাক্সক্ষা এবং সেই মতে তারাই শুদ্ধ সেটা প্রমাণের প্রয়োজনীয়তা বিদ্যমান। আর বেরেলভি ওয়ায়েজরা চান, পীর আউলিয়ার দেশে, পীর আউলিয়ার ইসলাম কায়েম করতে। সেই ইসলাম শুধু তাদের কাছেই আছে, অন্যদের কাছে নেই।
ওয়াজ যেমন রাজনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার হয়, একই সঙ্গে বিনোদনের মাধ্যমও হয়তো অনেকটা। কখনো সেটা নিয়েও আলাপ করা যাবে।
লেখক: হিফজুল কোরআন, দাওরায়ে হাদিস-বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ; এমএসএস- গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
