চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলায় প্রায় অর্ধশত প্রজাতির সামুদ্রিক মাছের শুঁটকি উৎপাদিত হয়। কিন্তু গত কয়েক দশকে উৎপাদন ও পরিধি বাড়লেও আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি এ শিল্পে। শুঁটকি উৎপাদনের জন্য স্থায়ী জায়গা না থাকাসহ বিনিয়োগের অভাবকেই প্রধান কারণ মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে অস্থায়ী ঘর আর মাচা করে বানানো হয়েছে শুঁটকি মহাল। সেখানে কেউ মাছ কেনা শেষে ধোয়ার কাজ করছেন। কেউ বড় মাছ কাটছেন, কেউ বা পরিষ্কার মাছে লবণ মিশিয়ে মাচায় শুকাতে দিচ্ছেন। আবার কেউ কেউ শুকনো শুঁটকি বস্তায় ভরছেন। বস্তায় ভরা এসব শুঁটকি যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও যুক্ত আছেন এই কাজে। কোনো কোনো জায়গায় শিশুদেরও কাজ করতে দেখা গেছে।
শীতের শুরু থেকেই সরগরম হয়ে উঠে কর্ণফুলী পাড়ের শুঁটকি পল্লী। এখানে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় অর্ধশত প্রজাতির সামুদ্রিক মাছের শুঁটকি। দেশের সর্ববৃহৎ শুঁটকি বাজার চট্টগ্রাম নগরীর আছদগঞ্জের পাশাপাশি রপ্তানি হচ্ছে বিদেশেও। তবে গত কয়েক দশকে এর প্রসার ঘটলেও আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি এ শিল্পে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, উপজেলার চরপাথরঘাটা, ইছানগর, জুলধা, ডাঙারচর ও শিকলবাহা এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে ১৫টি শুঁটকি মহাল রয়েছে। এসব মহালে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি করা হয় বিষমুক্ত শুঁটকি। প্রতিমাসে একেকটি শুঁটকি পল্লী থেকে ১০-২০ টন শুঁটকি উৎপাদিত হয়। এতে নারী ও পুরুষসহ দুই হাজারের অধিক শ্রমিক কাজ করেন। এসব শ্রমিক পরিবারের ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষের খেয়ে পরে বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন এই শুঁটকি শিল্প।
শুঁটকি ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে কর্ণফুলী, আনোয়ারা, বাঁশখালী ও পতেঙ্গায় বিচ্ছিন্নভাবে অন্তত ৪০টি মহালে শুঁটকি উৎপাদিত হয়। এসব মহালে প্রচলিত পদ্ধতিতে কাঁচামাছ রোদে শুকিয়ে শুঁটকি বানানো হয়। তবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) উদ্ভাবিত ‘ফিস ড্রায়ার’ ব্যবহার করে উৎপাদিত শুঁটকি স্বাস্থ্যসম্মত। তাই কর্ণফুলী নদীর পাড়ে সরকারিভাবে একটি আধুনিক শুঁটকি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল গড়ে তোলা সময়ের দাবি।
প্রযুক্তিগতভাবে বিএফআরআই ফিস ড্রায়ারের মাধ্যমে যেকোনো প্রজাতির মাছ শুঁটকি করা যায়। মশা-মাছি ও কীট-পতঙ্গ নিরোধক ডায়িং হাউজে প্রাকৃতিক সূর্যের আলো ও তাপ নিয়ন্ত্রণ করে মাছ আদ্রতামুক্ত করা হয়। শেষে সাত থেকে আট দিন ন্যাচারাল সানড্রাইয়ে শুকানোর পর সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াজাত হয়ে গেলে মাইনাস ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ফ্রিজারে সংরক্ষণ করা হয়।
ব্যবসায়ীদের দাবি, কক্সবাজারের খুরুস্কুলে নির্মিত শুঁটকি প্রক্রিয়াকরণ শিল্প স্থাপন প্রকল্পের মতো কর্ণফুলীতেও একটি প্রকল্প নেওয়া হোক। প্রকল্পের আওতায় মৎস্য অবতরণ ব্যবস্থা, প্রযুক্তিগত শুঁটকি মাছ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করা। এতে গুণগত মানসম্পন্ন শুটকি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির পাশাপাশি ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বিশ বছর ধরে শুঁটকি তৈরির কাজ করছে আলাউদ্দিন ফিস ট্রেডার্স। এটির মালিক আলাউদ্দিন জানান, আগে অনেক প্রকারের শুঁটকি তৈরি করা হতো কিন্তু সামুদ্রিক মাছ সংকটের কারণে এখন ১০-১২ প্রকারের শুঁটকি তৈরি করা হয়। তাদের মাচান ঘর থেকে মাসে ১০টন শুঁটকি উৎপাদন হয়।
এসকে ফিস ট্রেডার্সের মালিক কালা মিয়া বলেন, ‘শুঁটকি শিল্পের স্থায়ী কোনো জায়গা নেই। সরকারের কাছে আমাদের আবেদন স্থায়ী জায়গা হিসেবে আধুনিক একটি শুঁটকি পল্লী নির্মাণের পাশাপাশি যেন আর্থিক সহায়তার উদ্যোগ নেয়।’
শুঁটকি শ্রমিক আব্দুস সালাম জানান, তিনি ৫ বছর ধরে শুঁটকি তৈরির কাজ করছেন। এখানে নতুনদের ৪০০-৫০০ টাকা এবং অভিজ্ঞদের ৬০০-৭০০ টাকা দৈনিক মজুরি দেওয়া হয়।
কর্ণফুলী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) স্বপন চন্দ্র দে বলেন, ‘বিষমুক্ত শুঁটকি তৈরিতে ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন পরামর্শের মাধ্যমে তাদের বিষমুক্ত শুঁটকি উৎপাদনের বিষয়ে সচেতন করা হচ্ছে। তবে কর্ণফুলীতে এখনো আধুনিক মানের শুঁটকি প্রক্রিয়াকরণ শিল্প স্থাপন প্রকল্প আসেনি। এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এলাকার হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং শুঁটকি জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।’
