কমতে পারে জ্বালানি তেলের দাম

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৪, ০৮:৩৩ এএম

দেশে প্রথমবারের মতো প্রতি মাসে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণ করবে সরকার। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম কমলে দেশে কমবে আবার বাড়লে দেশের বাজারেও বাড়বে। চলতি সপ্তাহ থেকেই নতুন এই পদ্ধতি শুরু হতে পারে। সে ক্ষেত্রে এ মাসে জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা কমার আভাস পাওয়া গেছে। তবে ডিজেলের দাম না-ও কমতে পারে।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে মিল রেখে প্রতি মাসে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন। অনেকটা এই প্রক্রিয়ায় জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ হলে ভোক্তা এবং সরকার উভয়ই সুবিধা পাবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে মূল্য নির্ধারণে বিপিসির আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় এসব পণ্যের ওপর অতিরিক্ত যে শুল্ক, কর রয়েছে তা কমানো উচিত। সেই গণপরিবহনে ব্যবহৃত জ্বালানি ডিজেলের দামের সঙ্গে যেন যাত্রী ভাড়ার নিয়মিত সমন্বয় হয়, সে বিষয়টিও নিশ্চিত করা দরকার। যদিও স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে ডিজেলের দাম কমলে বা বাড়লে পরিবহন ভাড়া কী হবে তা নিয়ে এখনো সরকারের কোনো নির্দেশনা পায়নি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ।

ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের স্বয়ংক্রিয় দাম নির্ধারণের নির্দেশনা দিয়ে ২৯ ফেব্রুয়ারি রাতে সরকারের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে প্রাথমিকভাবে প্রতি মাসে জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি মার্চ থেকে কার্যকর হবে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্ত হিসেবে গত বছর থেকে নতুন এই মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি কার্যকরের উদ্যোগ নেওয়া হলেও দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে ভেবে তখন তা বাস্তবায়ন হয়নি।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক এবং জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারের এই উদ্যোগ ভালো। কিন্তু যে ফর্মুলা করা হয়েছে তা প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় ব্যয় থাকলে তা বাদ দিতে হবে।

বিশ্ববাজারে এখনকার জ্বালানি তেলের দাম বিবেচনায় নিলে দেশে দাম কমার কথা। যদি না কমে তাহলে ফর্মুলা নিয়ে সমস্যা আছে।

তিনি বলেন, ‘জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে যেহেতু একটা ফর্মুলা তৈরি হয়ে গেছে, এখন প্রতি মাসে দাম নির্ধারণের দায়িত্ব এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে দেওয়া উচিত। না হলে সেটিও গ্রহণযোগ্য নয়।’

বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয়ের কথা বলে ২০২২ সালের আগস্টে জ্বালানি তেলের দাম সর্বোচ্চ ৪২ শতাংশ বাড়ানো হয়। তখন ডিজেল ও কেরোসিনের দাম ৮০ থেকে বাড়িয়ে ১১৪ টাকা, অকটেনের দাম ৮৯ থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা আর পেট্রোলের দাম ৮৬ থেকে বাড়িয়ে ১৩০ টাকা করা হয়। ব্যাপক সমালোচনার মুখে পরে মাত্র ৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ (প্রতি লিটারে ৫ টাকা) কমিয়ে প্রতি লিটার ডিজেল ও কেরোসিন ১০৯, পেট্রোল ১২৫ ও অকটেন ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়, যা এখনো কার্যকর রয়েছে।

মূল্যবৃদ্ধির সময় বলা হয়েছিল, বিশ্ববাজারে দাম কমলে দেশেও কমবে। কিন্তু পরে দফায় দফায় তেলের দাম কমলেও দেশের বাজারে আর কমানো হয়নি।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮০ মার্কিন ডলার। আর পরিশোধিত ডিজেলের দাম ১০৬ মার্কিন ডলার। গেল সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে ৩ শতাংশ কমেছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। পরিশোধিত তেলের দামও কমেছে। এ সপ্তাহের শুরুতে গতকাল আইসিই ফিউচারস ইউরোপে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার আদর্শ ব্রেন্টের দাম ২ ডলার ৫ সেন্ট কমেছে। প্রতি ব্যারেলের দাম স্থির হয়েছে ৮১ ডলার ৬২ সেন্টে। অন্যদিকে নিউ ইয়র্ক মার্কেন্টাইল এক্সচেঞ্জে (নিমেক্স) ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম ২ ডলার ১২ সেন্ট বা ২ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। প্রতি ব্যারেলের দাম স্থির হয়েছে ৭৬ ডলার ৪৯ সেন্টে।

পূর্বাভাস অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম সামনে আরও কমবে। এ বছর জ্বালানি তেলের দাম ৭০ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে থাকবে বলে ধারণা করছে যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক বিনিয়োগ সংস্থা গোল্ডম্যান স্যাকস।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অধ্যাপক ড. ম তামিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে পেট্রোলের দাম সমন্বয় করা যেতে পারে। ডিজেলের ক্ষেত্রে যাত্রী ও পণ্যবাহী পরিবহনের ভাড়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওঠানামার ফর্মুলা প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে দাম সমন্বয় করে লাভ নেই। কারণ ডিজেলের দাম কমলে যদি ভাড়া না কমে, তাহলে বাড়তি টাকাটা ব্যবসায়ীদের পকেটে যাবে। ব্যবসায়ীদের পকেটে না গিয়ে বরং এই টাকা সরকারের কাছে থাকুক। তাতেও এই টাকা অন্য খাতে ব্যবহার করতে পারবে সরকার। এতে জনগণ কোনো না কোনোভাবে এর সুবিধা পাবেন।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্যমতে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় খরচ এবং কর পরিশোধের পর বিপিসি নিট মুনাফা করেছে ৪ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা। সরকারকে লভ্যাংশ দিয়েছে ২০০ কোটি টাকা। এ সময় সরকারি কোষাগারে আমদানি শুল্ক, ভ্যাট, লভ্যাংশ, আয়করসহ বিভিন্ন খাতে মোট ১৫ হাজার ৪৯২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা জমা দিয়েছে বিপিসি। পাশাপাশি উদ্বৃত্ত অর্থ হিসেবে বিপিসির কাছ থেকে ৫০০ কোটি টাকা নিয়েছে সরকার। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেও (জুলাই-ডিসেম্বর) ৪০০ কোটি টাকার বেশি মুনাফা করেছে বিপিসি।

এর আগে ২০১৪-১৫ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত কর-পরবর্তী বিপিসির নিট মুনাফা হয়েছে ৪৬ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা। ওই সময়ে সরকারকে লাভ দিয়েছে ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া বিপিসির উদ্বৃত্ত তহবিল থেকে দুই দফায় ১০ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে সরকার।

শুধু ২০২১-২২ অর্থবছর ছাড়া আট বছরের বেশি সময় মুনাফা করেছে বিপিসি। কিন্তু সে তুলনায় ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি তেলের দাম কমানো হয়নি। যে বছর লোকসান হয়েছে ওই সময় অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেল (১৫৮ দশমিক ৯৯ লিটার) ১৪০ ডলার আর ডিজেলের দাম ১৭০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। এরপর ধাপে ধাপে কমে গত বছর দাম ৭০ ডলারের নিচে নেমে আসে। অবশ্য পরে কিছুটা বেড়েছে।

বিপিসির একজন কর্মকর্তা জানান, স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণে কাজ করছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। তারা এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেবে। বিষয়টি নতুন হওয়ায় মূল্য ঘোষণার আগে দাম কমবে, না বাড়বে, সেটি বলার কোনো সুযোগ নেই। তা ছাড়া আগে থেকেই দাম কমা বা বাড়ার বিষয়টি জানাজানি হলে সেটি বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণে গোপনীয়তা রক্ষা করেই নতুন দর বাস্তবায়ন করা হবে। তবে কিছু জ্বালানির দাম কমার সম্ভাবনা রয়েছে।

যেভাবে মূল্য নির্ধারণ হবে : সাধারণত বিশ্ববাজারের দামের সঙ্গে পরিবহন ভাড়া এবং বিভিন্ন ধরনের শুল্ক ও কর যুক্ত হয় ৩২ শতাংশ। এ ছাড়া ৬ শতাংশ মুনাফা ধরে বিপিসি। এই দামের সঙ্গে পরিবেশকদের কমিশন যুক্ত করে বর্তমানে জ্বালানি তেল বিক্রি হয়।

স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে ডলারের বিপরীতে টাকার মান এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বিবেচনায় নেওয়া হবে। যেমন আমদানি করা পরিশোধিত ডিজেলের ক্ষেত্রে বিভিন্ন খাতের ব্যয় ধরে মূল্য নির্ধারণ হবে। অপরিশোধিত ডিজেলের ক্ষেত্রে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধনের খরচ যোগ হবে। উভয় ক্ষেত্রে পণ্যের প্রকৃত মূল্যের সঙ্গে আমদানি শুল্ক, অগ্রিম আয়কর ও আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট, অপারেশনাল (পরিচালন) ব্যয়, আর্থিক, প্রশাসনিক ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, বিপিসির মুনাফা, ভ্যাট এবং বিক্রয় ও বিতরণ ব্যয় যোগ হবে।

অকটেন ও পেট্রোলের ক্ষেত্রে ওপরের সব ব্যয় বিবেচনায় নেওয়ার পাশাপাশি এর সঙ্গে ‘আলফা ফ্যাক্টর’ যোগ করে বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হবে। নতুন পদ্ধতিতে অকটেনের দাম নির্ধারণকালে ডিজেলের সঙ্গে প্রতি লিটারে দামের পার্থক্য যেন ন্যূনতম ১০ টাকা হয়, সে জন্য ‘আলফা ফ্যাক্টর’ বিবেচনায় নেওয়া হবে।

দেশে ডিজেল গণপরিবহন ও সেচে ব্যবহার করা হয়। কেরোসিনও ব্যবহার করা হয় বিভিন্ন প্রয়োজনে।

অন্যদিকে অকটেন ও পেট্রোল ব্যক্তিগত যানবাহনে বেশি ব্যবহৃত হওয়ার কারণে সব সময় ডিজেলের চেয়ে এই দুই জ্বালানির মূল্য বেশি রাখা হয়। এদিকে ভারতে জ্বালানি তেলের চোরাচালান বন্ধে বাংলাদেশে তেলের দাম সে দেশের বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্ধারণ করা হবে বলেও সূত্র জানিয়েছে।

দেশে প্রতি বছর জ্বালানি তেলের চাহিদা ৭০ থেকে ৭২ লাখ টন। ব্যবহৃত মোট জ্বালানি তেলের ৭৩ দশমিক ১১ শতাংশ ডিজেল, পেট্রোল ৫ দশমিক ৮৬ এবং অকটেন ৪ দশমিক ৭৮ শতাংশ। বছর জুড়ে ডিজেলের চাহিদা ৪৮ থেকে ৪৯ লাখ টন, যার ৮০ শতাংশ আমদানি করে সরকার।

দেশে শতভাগ বিদ্যুতায়নের ফলে কেরোসিনের চাহিদা উল্লেখযোগ্য অনেক কমে যাওয়ায় বর্তমানে কেরোসিন আমদানি করা হয় না। পেট্রোল ও কেরোসিনের চাহিদার প্রায় সবটুকু দেশে উৎপাদিত হয়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত