দেশপ্রেম লক্ষ্য উদ্দেশ্যবিহীন শিক্ষাব্যবস্থা

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২৪, ১২:৪৩ এএম

আমরা যে শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছি সেটা কি আসলে আমাদের জন্য ভালো না খারাপ? কখনো তা চিন্তা করেছি? একবারের জন্যও কি প্রশ্ন করেছি, ‘শিক্ষা কারিকুলাম’ কারা তৈরি করছে? তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী? আমাদের শেখানো হয়েছে, পড়াশোনা করলে ভালো চাকরি করতে পারব। ভালো থাকতে পারব। আসলেই কি পড়াশোনা করলে ভালো চাকরি পাওয়া সম্ভব? বর্তমান বাস্তবতায় বলতে হয় হয়তো হ্যাঁ, হয়তো না। তবে আমি ‘না’র পক্ষে। কারণ পড়াশোনা করলেই ভালো চাকরি পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব না। তাহলে আমাদের দেশে এত শিক্ষিত বেকার থাকত না। ‘শিক্ষা’ কি শুধু চাকরির জন্য? নাকি ‘শিক্ষা’ আলোকিত আত্মোপলব্ধি? কী জানলাম আমরা! তখনই এই উপলব্ধির জন্ম নেবে, যখন আমরা নতুন কিছু সৃষ্টি বা আবিষ্কারের জন্য নিজেকে তৈরি করতে পারব। কিন্তু বর্তমান কারিকুলামের মাধ্যমে আমাদের

মেসেজ দেওয়া হচ্ছে, তোমাকে ‘শিক্ষিত’ হতে হবে চাকরির জন্য। পড়াশোনা করলে ভালো চাকরি করতে পারব, ভালো থাকতে পারব।

ছোটবেলায় পড়েছিলাম, ‘পড়াশোনা করে যে গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে’। যদিও এটি একটি মোটিভেশনাল বাক্য ছিল। মনে হয় বাক্যটি হওয়া উচিত ছিল, পড়াশোনা করে যে গাড়ি-প্লেন বানায় সে। যে গাড়ি এবং প্লেন তৈরি করতে পারে সে এমনিতেই এগুলো চড়তে পারে। অথচ আমাদের পড়াশোনা হয়ে গেছে চাকরি-কেন্দ্রিক। ফলে এর পেছনে একটা শক্তি কাজ করে। যারা চায় আমরা সব সময় তাদের গোলাম থাকি। তারা চায় সব সময় আমাদের শাসন-শোষণ করতে। তারা কারিকুলামের মাধ্যমে আমাদের প্রজন্মকে এমন ভাবে শিক্ষিত করছেন, যার মাধ্যমে আমরা তাদের প্রতি আনুগত্যশীল, আত্মসমর্পণকারী ও তাদের শক্তির কাছে সারা জীবন মাথানত করে থাকি। আমাদের উচিত, শিক্ষা কারিকুলাম যারা প্রণয়ন করেন তাদের পরিকল্পনা বোঝা।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখতে পাব, দিন দিন আমরা বিদেশিদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি। সেটা হোক শিক্ষা খাত, চিকিৎসা খাত বা অর্থনৈতিক খাত। শিক্ষার্থীদের দিকে তাকালে দেখতে পাই, সামর্থ্যবান এবং মেধাবী অনেকেই উচ্চ শিক্ষার জন্য দেশ ছেড়ে বিদেশ পারি দিচ্ছে। তাদের কাছে বিদেশ যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে তারা দাবি করেন দেশে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার তেমন সুযোগ নেই। উন্নত জীবনযাত্রার ব্যবস্থা নেই। আসলেই কি আমাদের দেশে সুযোগ নেই নাকি পরিকল্পিতভাবে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে, আমরা কেন বিদেশিদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে গেছি তা জানতে হবে। জানতে হবে, তাদেরও অনুগত চিন্তাধারায় বেড়ে ওঠার কারণ।

অনেকে ‘থমাস ম্যালথাসের’ নাম শুনেছি। যিনি জন্মনিয়ন্ত্রণ তত্ত্বের উদ্ভাবক, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও প্রভাবশালী দার্শনিক। এছাড়া ধ্রুপদী অর্থনীতির প্রবর্তক রিকার্ডো, জেমস মিল, স্যার জন স্টুয়ার্টের মতো দার্শনিকদের নামও শুনেছি। যারা ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অংশীদার ও ভারতবর্ষের প্রধান প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যাপক। ফলে আমাদের আইনব্যবস্থা, প্রশাসনিক কাঠামো, শিক্ষাব্যবস্থার সর্বক্ষেত্রেই ব্রিটিশ আমলের লাল ফিতার দৌরাত্ম্য রয়ে গেছে। আর তা সম্ভব হয়েছে এরকম বড় বড় চিন্তক ও দার্শনিকদের কারণেই। শিক্ষা খাত থেকে শুরু করে সামগ্রিক রাষ্ট্র কাঠামোতে আজও সেই শোষণ চিন্তা ও দর্শন রয়ে গেছে।

যেকোনো সমস্যা সমাধানে কেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের উচ্চ নেতৃবৃন্দ ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রিটিশ-মার্কিন রাষ্ট্রদূতদের কাছে ছুটে যান? কারা আমাদের বাজেট পেশ করেন? কারা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিকল্পনা নির্ধারণ করেন? কারা শিক্ষা কারিকুলাম নির্ধারণ করেন? কারা দেশের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সাজিয়ে দেন এবং নিয়ন্ত্রণ করেন? লক্ষ করলে দেখতে পাব, সবাই ওই পাশ্চাত্যের চিন্তায় চেতনায় বেড়ে ওঠা চিন্তক বা বুদ্ধিজীবী। যুগ আর সময় পাল্টালেও শোষণ আর শাসন রয়ে গেছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতোই। কারণ আমরা তাদের শিক্ষাতেই শিক্ষিত হচ্ছি। দিন শেষে আমরা পাশ্চাত্য চিন্তা কাঠামোর বাইরে চিন্তা করতে পারছি না, স্বাধীনতার এত বছর পরেও। এই শিক্ষাব্যবস্থার কারণে আমরা দেশের মেধাবীদের মূল্যায়ন করতে পারছি না। এখন পড়াশোনার মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেকোনো ভাবে ভালো একটা জীবিকার ব্যবস্থা করা। আর এই সুযোগ লুফে নিয়ে আমাদের তরুণ মেধাসম্পদ ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে পশ্চিমা দেশগুলো। তাদের লোভ দেখানো হচ্ছে, উন্নত জীবনযাপন ও নানাবিধ সুযোগ-সুবিধার। আর আমাদের দেশের তরুণ মেধাবীরা সেই দেশে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই পশ্চিমাদের অনুবর্তী ও তোষণকারী হয়ে ওঠে। আমাদের দেশের এই মেধাবীদের তৈরি করে নেওয়া হয় তাদের চিন্তাধারায়। ফলে এসব দেশ থেকে যারা পড়াশোনা করে আসে তারা তাদের ধাঁচের বুদ্ধিজীবী হিসেবে গড়ে ওঠে। মেনে নেয় পাশ্চাত্যের দাসত্ব।

তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে চিন্তা-চেতনায় আমাদের বুদ্ধিজীবীদের যে দূরত্ব, তার মূল কারণ  কোনোভাবেই তারা নিজেরা নন। প্রকৃত অর্থে এর জন্য দায়ী আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। আমরা যে শিক্ষাব্যবস্থা ও পরিবেশে বড় হচ্ছি, তারই প্রতিফলনে আমাদের আত্মশক্তি বা আলোকিত চিন্তা-চেতনার প্রসার ঘটাতে পারছি না আমরা। একটা জাতিকে আত্মসমর্পণকারী বা দাস করে রাখার জন্য লোহার শেকলের প্রয়োজন পড়ে না। জাতির শিক্ষা ও ইচ্ছাশক্তিকে প্যারালাইজড করতে পারলেই ওই জাতি সারা জীবনের জন্য  অনুগত থাকতে বাধ্য হবে। গভীরভাবে অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখলে দেখা যাবে বর্তমান শিক্ষা কারিকুলাম ও সিলেবাস আমাদের তরুণ প্রজন্মের মেধা বা চিন্তাশক্তিকে যেন প্যারালাইজড করে দিচ্ছে। তারা হয়ে যাচ্ছে বোধহীন। এই শিক্ষায় সমষ্টিগত কোনো লক্ষ্য নেই, উদ্দেশ্য নেই, দেশপ্রেম নেই। এখানে সমাজ এবং দেশ কেবলই নিজস্ব ভোগ উৎপাদনের প্রাথমিক কারখানা। 

লেখক : কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত