রাজধানীর বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজে ভয়াবহ আগ্নিকাণ্ডে ৪৬ জনের প্রাণহানির পর নগরীর বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ (রাজউক) এবং সিটি করপোরেশনসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন ভবনে অনুমতিহীন রেস্তোরাঁ ও দুর্বল অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ অপরিকল্পিতভাবে সিলিন্ডার ব্যবহারের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৩ থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ১ হাজার ১৩২টি অভিযান চালিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এসব অভিযানে ৮৭২ জনকে গ্রেপ্তার এবং ২০টি মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮৮৭টি ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। গতকাল বুধবার ডিএমপির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
অভিযানের চতুর্থ দিন গতকাল বুধবার রাজধানীর খিলগাঁও এবং গুলশানের বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় অভিযান চালিয়ে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় ছয়টি রেস্তোরাঁ ও একটি ভবনের মালিককে ৮ লাখ ৯০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এর মধ্যে খিলগাঁওয়ের কেএফসি, ডোমিনোজ পিৎজা, সিক্রেট রেসিপিকে ২ লাখ টাকা করে ও চায়না রেস্তোরাঁকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া গুলশানের কাচ্চি ভাই রেস্তোরাঁকে ১ লাখ, ধানসিঁড়ি রেস্তোরাঁকে ৪০ হাজার ও সেভা হাউজ নামে একটি ভবনের মালিককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। গতকাল সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত রাজউক ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এসব অভিযান পরিচালনা করে।
এ ছাড়া দুপুরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বাধীন ভ্রাম্যমাণ আদালত হানা দেয় নিউমার্কেট এলাকায়। এ সময় মার্কেটের অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও ঝুঁকি সরাসরি পর্যবেক্ষণ করে বিভিন্ন অসংগতি সমাধানের নির্দেশনা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিধিমালা ভঙ্গ করে সিঁড়িতে ভাসমান দোকান করার কারণে ১৩টি দোকানকে ৫ হাজার টাকা করে ৬৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া অপসারণ করা হয়েছে এসব দোকানপাট। ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘এই মার্কেটের সিঁড়িগুলো হচ্ছে জরুরি বহির্গমন অর্থাৎ আগুন লাগলে মানুষজন নেমে যাওয়ার জন্য। কিন্তু আমরা এখানে এসে দেখেছি সবগুলো সিঁড়ি দখল করে দোকান বসানো হয়েছে। যেকোনো অগ্নিদুর্ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস সেই স্থানে পৌঁছাতে কিংবা মানুষ নেমে যেতে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করবে।’
অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকায় গুলশান-২ নম্বরের কাচ্চি ভাই রেস্তোরাঁকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। ডিএনসিসির অঞ্চল-৩-এর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জুলকার নায়ন এই আদালত পরিচালনা করেন। তার সঙ্গে ছিলেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুল হাসান। অভিযানে একই অভিযোগে ধানসিঁড়ি নামে আরেকটি রেস্তোরাঁকে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া সিঁড়ির সামনে মালামাল রাখায় সেভা হাউজ নামে একটি ভবনকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এই অভিযানের খবর পেয়ে বাথরুমে সিলিন্ডার লুকিয়ে রাখা হয় গুলশান-২-এর কাচ্চি ভাই রেস্তোরাঁয়। এর আগে ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া আর অন্যকোনো কাগজপত্র না থাকায় এই রেস্তোরাঁটিকে লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
অভিযানে ধানসিঁড়ি রেস্টুরেন্টে মেয়াদোত্তীর্ণ ফায়ার এক্সটিংগুইশার পাওয়া যায়। ফায়ার সার্ভিসের নিয়ম অনুযায়ী একটি ফায়ার এক্সটিংগুইশারের মেয়াদ থাকে সর্বোচ্চ দুই বছর। কিন্তু ধানসিঁড়ি রেস্টুরেন্টে থাকা ফায়ার এক্সটিংগুইশারে মেয়াদ ১০ বছর করে লেখা রয়েছে। যা সম্পূর্ণ ভুয়া বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
দুটি ভবনে অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ ব্যানার টানানো সম্পর্কে জানতে চাইলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জুলকার নায়ন বলেন, ‘৩৩ নম্বর হোল্ডিংয়ের বাণিজ্যিক ভবনটিতে অনেকগুলো রেস্তোরাঁ রয়েছে। কিন্তু তার কোনোটিতেই অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই। এ ছাড়া অগ্নিকান্ড ঘটলে বের হওয়ার সুযোগ কম। দুপাশে দুটি সিঁড়ি থাকলেও তা সরু।’
গত ২৯ ফেব্রুয়ারি রাতে বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজে ভয়াবহ আগুনে ৪৬ জন নিহত হয়। ফায়ার সার্ভিসের ১৩টি ইউনিটের কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এ ঘটনায় এখনো ছয়জন শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন। বেশ কয়েকজন চিকিৎসা শেষে বাসায় ফিরেছেন। ওই ঘটনার পর রাজধানীর বিভিন্ন ভবনে, বিশেষ করে যেগুলোতে রেস্তোরাঁ রয়েছে সেগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে অভিযান শুরু করেছে বিভিন্ন সংস্থা।
