কিশোর গ্যাংরা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। তারা এখন মাদক, চাঁদাবাজিসহ হত্যার মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাং তৈরি করে ছিনতাই, ইভটিজিং, হুমকি দেওয়া, স্কুল-কলেজের ছাত্রীদের ভয় দেখানোসহ নানা অপকর্মে চালিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় রাজনৈতিক বড় ভাই ও কাউন্সিলরদের ছত্রছায়ায় এরা বিভিন্ন নামে প্রভাব বিস্তার করে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে জনমনে আতঙ্ক বিস্তারও করে। এই গ্যাংয়ের সঙ্গে বড়লোকের সন্তানরা জড়িয়ে পড়ছে। এভাবে তারা বিভিন্ন সময়ে উত্তেজনা পরিস্থিত সৃষ্টি করে। গত দুবছরে কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় ৩৪ জন কিশোর নিহত হয়েছে। এ রকমই ৭৫ জন কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
গত দুদিনে রাজধানীর তেজগাঁও, গুলশান, উত্তরা ও মতিঝিল এলাকায় যৌথ অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতদের জামিনের বিষয়ে কেউ সুপারিশ নিয়ে এলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গতকাল বুধবার রাজধানীর মিন্টো রোডে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ এসব কথা জানান।
ডিবিপ্রধান জানান, সম্প্রতি কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যের কারণে সমাজের শান্তিশৃঙ্খলা নষ্ট হচ্ছে। কিশোর গ্যাং সদস্যরা ছিনতাই, ইভটিজিং, হুমকি দেওয়া, স্কুল-কলেজের ছাত্রীদের ভয় দেখানো ও বিভিন্ন সময়ে উত্তেজনা পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। এ কাজগুলো তারা দলবদ্ধ হয়ে করে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নানা নামে প্রভাব বিস্তার করে আসছে তারা। এরই জের ধরে মঙ্গল ও বুধবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৭৫ জনকে কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এলাকায় এদের দৌরাত্ম্য বন্ধে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও পরিবারের সদস্যদের এগিয়ে আসতে হবে।
তিনি জানান, চক্রগুলো রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নানা নামে প্রভাব বিস্তার করে আসছে। উত্তরায় প্রভাব বিস্তার করেছে ইয়োং স্টার, বিগবস, ডিস্কো বয়েজ, বন্ধু মহল, শীল বিষু গ্যাং, পারভেজ গ্রুপ, রুস্তম গ্রুপ, ইয়োং স্টার গ্রুপ, নাইনএমএম গ্রুপ, নাইন স্টার গ্রুপ, রামপুরায় উজ্জল গ্রুপ। কিশোর গ্যাং গ্রুপগুলো মাদক, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধ করে আসছে। কিছু বড় ভাইয়ের ছত্রছায়ায় তারা এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করে আসছে। এসব কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় গত দুই বছরে ৩৪ জন কিশোর নিহত হয়েছে।
হারুন অর রশীদ আরও বলেন, ‘আমরা একসময় মনে করতাম, ভাসমান ও নিম্ন আয়ের পরিবারের সন্তানরা কিশোর গ্যাং চক্রে জড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, উচ্চমধ্যবিত্ত, ধনীদের সন্তানরাও কিশোর গ্যাং চক্রে জড়িয়ে যাচ্ছে। তাদের পোশাক, চুলে কাটিং, চলাফেরা সবই ভীতিকর। এসব ধনীর সন্তানরা প্রথমে মাদক সেবন, পরে মাদক বিক্রিতেও জড়িয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া তারা এলাকায় স্থানীয় রাজনৈতিক বড় ভাই আবার কখনো কাউন্সিলরদের নিয়ন্ত্রণে থেকে হত্যার মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে। বর্তমান ও সাবেক কাউন্সিলরদের ছত্রছায়ার অভিযোগ রয়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে দুদিনে ৭৫ জন কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। গ্রেপ্তার সবাই কিশোর গ্যাং চক্রে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে।’
কিশোর গ্যাং সামাজিক অবক্ষয়ের কারণ উল্লেখ করে ডিবিপ্রধান বলেন, ‘এখন যে সামাজিক অবক্ষয় ঘটছে। এসব কিশোর স্কুলে পড়ালেখা বাদ দিয়ে মাদক সেবনের মতো উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন করছে। গোয়েন্দা পুলিশ কাজ করছে। তবে আমি মনে করি, অভিভাকদের উচিত তার সন্তান কোথায় যায়, কার সঙ্গে মিশে তার খোঁজ রাখা। পাশাপাশি মা-বাবার উচিত সন্তানদের সময় দেওয়া। গ্রেপ্তার করে কিশোর গ্যাং দমন করা যাবে না। সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সন্তানদের ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে।’
কিশোর গ্যাংয়ের আশ্রয় দেওয়া বড় ভাইদের পরিচয় প্রকাশ করা হবে কি না জানতে চাইলে ডিবিপ্রধান জানান, ‘বর্তমানে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের গ্রেপ্তার করেছি। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে অনেক বড় ভাইয়ের নাম পেয়েছি। এসব নাম তদন্ত করে দেখব কারা কারা কিশোর গ্যাং সদস্যদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে। তবে আমি মনে করি, এসব কিশোর গ্যাংয়ের নানা অপরাধ করার তথ্য তো কাউন্সিলররা জানেন।’
তিনি জানান, কিশোর গ্যাং গ্রুপের সদস্যরা কিন্তু বড় বা রাজনৈতিক নেতাদের পরিচয় দিয়ে এলাকায় চাঁদাবাজি করে। মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধ করে। কিশোর গ্যাংয়ের এমন দৌরাত্ম্যের কারণে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পায় না। পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও পরিবারের সদস্যদের কিশোর গ্যাং দমনে এগিয়ে আসতে হবে। কিশোর গ্যাংবিরোধী ধারাবাহিক অভিযান চলবে। এ বিষয়ে কেউ সুপারিশ নিয়ে এলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
