অর্ধেক তার করিয়াছে নারী

শীর্ষে কম নিচে বেশি

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২৪, ০৫:০৯ এএম

সরকারি চাকরি ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ এখন সর্বত্র। সচিবালয় থেকে শুরু করে সরকারি চাকরির বিভিন্ন স্তরে নারী চাকরিজীবীর সংখ্যা বাড়ছে দিনে দিনে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সারা দেশে সরকারি চাকরিজীবী আছেন ১৩ লাখ ৯৬ হাজার ৮১৮ জন। এর মধ্যে ৯ লাখ ৮৭ হাজার ৬৭৯ জন পুরুষ। নারী চাকরিজীবী রয়েছেন ৪ লাখ ৯ হাজার ১৩৯ জন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দিনে দিনে সরকারি চাকরিতে নারীদের সংখ্যা বাড়ছে, অবস্থান মজবুত হচ্ছে। সরকারের নানামুখী উদ্যোগের ফলে মানুষের মধ্যে শিক্ষার হার বৃদ্ধি ও সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। কর্মক্ষেত্রে নারীদের নিরাপত্তা বেড়েছে ফলে অধিকসংখ্যক নারী চাকরিতে প্রবেশ করছেন। কিন্তু এখনো নারীদের শতকরা হিসেবে অংশগ্রহণ সন্তোষজনক নয়। নারীর জন্য উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থা, পুরুষদের প্রথাগত মানসিকতা পরিবর্তনে সচেতনতা, চাকরি ক্ষেত্রে হয়রানি বন্ধসহ নানা ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশের জনসংখ্যার হিসেবে নারী ও পুরুষের চেয়ে বেশি হলেও চাকরি ক্ষেত্রে নারীদের সংখ্যা পুরুষের তুলনায় অনেক কম। বিষয়টি ফুটে উঠেছে সরকারি প্রতিবেদনেও।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ সরকারি কর্মচারীদের পরিসংখ্যান (৩০ মে ২০২৩ সালে প্রকাশিত) প্রথম শ্রেণির চাকরিতে মোট কর্মরত রয়েছেন ১ লাখ ৭৯ হাজার ৫১৪ জন। এর মধ্যে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৪৯৬ জন পুরুষ আর নারীর সংখ্যা ৪০ হাজার ১৮। দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে কর্মরত রয়েছেন ১ লাখ ৯৩ হাজার ৬৬৪ জন, যেখানে ১ লাখ ২৭ হাজার ৬০৬ জন পুরুষ, ৬৬ হাজার ৫৮ জন নারী। তৃতীয় শ্রেণির চাকরিতে কর্মরত রয়েছেন ৬ লাখ ৩ হাজার ৪৩৩ জন, যেখানে পুরুষ ৩ লাখ ৫৬ হাজার ২৭১ এবং নারী ২ লাখ ৪৭ হাজার ১৬২ জন। চতুর্থ শ্রেণির চাকরিতে কর্মরত রয়েছেন ৪ লাখ ১৫ হাজার ১০৪ জন, যেখানে পুরুষের সংখ্যা ৩ লাখ ৬০ হাজার ১৭ এবং নারী ৫৫ হাজার ৮৭ জন।

সরকারি চাকরিতে নারীদের অংশগ্রহণ কতটা বেড়েছে তা বোঝা যায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত ২০১৪ সালের সরকারি কর্মচারীদের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে।

২০১৪ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রথম শ্রেণির চাকরিতে নারীর সংখ্যা ছিল ২৩ হাজার ৬৩৭, যা ২০২৩ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ১৮। অর্থাৎ এ ৯ বছরে প্রথম শ্রেণির চাকরিতে নারীর সংখ্যা বেড়েছে ১৬ হাজার ৩৮১। একইভাবে দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে ২০১৪ সালে ছিলেন ৫৩ হাজার ৪১ জন নারী, যা ২০২৩ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৬ হাজার ৫৮ জনে। এ সময়ে নারীর সংখ্যা বেড়েছে ১৩ হাজার ১৭। তৃতীয় শ্রেণির চাকরিতে নারীর সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৪৬ হাজার ৮১২, বর্তমানে তা ২ লাখ ৪৭ হাজার ১৬২। অর্থাৎ ৯ বছরে এই শ্রেণির চাকরিতে নারীর সংখ্যা বেড়েছে ৩৫০। একই সময়ে চতুর্থ শ্রেণির চাকরিতে নারী সংখ্যা ৭ হাজার ৯৯৬ বেড়ে গত বছর হয়েছে ৫৫ হাজার ৮৭।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারি চাকরিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। এটা বেশ ইতিবাচক হলেও সন্তুষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই। সরকারি চাকরিতে নারীরা সংখ্যায় বাড়লেও শতকরা হিসাবে এখনো পুরুষ থেকে অনেক পিছিয়ে আছেন। নারীদের সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়াতে হবে, তাদের প্রাপ্য সম্মান ও অধিকার দিতে হবে।’

প্রশাসন, পুলিশ ও বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে সরকারি চাকরিতে নারীদের অবস্থান সংহত হচ্ছে। নারীরা তৃণমূলে যেমন কাজ করছেন, তেমনি রয়েছেন শীর্ষ পদেও। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশে এখন ১৪৯টি উপজেলায় নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পদে কর্মরত আছেন নারী। এ বিবেচনায় ইউএনও পদে নারীরা আছেন চার ভাগের এক ভাগ। বর্তমানে জেলা প্রশাসক পদে আছেন ১০ নারী। সচিব ও সচিব পদমর্যাদার ৭৭ কর্মকর্তার মধ্যে নারী ১০ জন, ৫১১ অতিরিক্ত সচিবের মধ্যে নারী ৮৩ জন, ৬৩৬ যুগ্ম সচিবের মধ্যে ৮১ জন নারী রয়েছেন। আর ১ হাজার ৬৯৫ উপসচিবের মধ্যে ৩৪৯ জন নারী, ১ হাজার ৫৪৯ সিনিয়র সহকারী সচিবের মধ্যে ৪৫৪ জন নারী এবং ১ হাজার ৫২৮ সহকারী সচিবের মধ্যে ৪৭২ জন নারী।

গুরুত্বপূর্ণ এ পদগুলোতে এই সংখ্যাই বলে দিচ্ছে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও নীতিনির্ধারক পর্যায়ে সংখ্যা সামান্য। সরকারি চাকরিতে শীর্ষ পর্যায়ের নারীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়ানো উচিত বলে মনে করেন রংপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শাহনাজ বেগম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, একটা জেলা বা উপজেলায় জনসংখ্যার অনুপাতে নারী ও পুরুষের সংখ্যা প্রায় সমান। আমাদের দেশের প্রান্তিক অঞ্চলের নারীরা এখনো নানাভাবে বঞ্চিত। গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে নারীদের সংখ্যা বেশি থাকলে এটা নারীদের অনুপ্রাণিত করে আবার অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রেও পুরুষের তুলনায় নারীরা বেশি সোচ্চার থাকেন।

গত সোমবার বিশ্বব্যাংকের ‘নারী, ব্যবসা ও আইন-২০২৪’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, কর্মক্ষেত্রে বাংলাদেশের নারীরা পুরুষের তিন ভাগের এক ভাগ আইনি অধিকার ভোগ করেন। এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর চেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের পেছনে আছে শুধু আফগানিস্তান। বৈশ্বিক লিঙ্গবৈষম্য নিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি ফোরাম (ডব্লিউইএফ) এক গবেষণায় জানায়, বাংলাদেশে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য প্রায় ২৮ শতাংশ।

ঢাক মেডিকেল কলেজের নাক, কান গলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হুসনা কুমার ওসমানী দেশ রূপান্তরকে বলেন, চাকরি ক্ষেত্রে বেশিরভাগ পুরুষ সহকর্মীই নারীদের সম্মান করেন। তবে পুরুষদের মধ্যে একটা অংশ যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও নারীকে নিজের চেয়ে ভালো জায়গায় দেখতে চান না। এ নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভোগেন, অনেক ক্ষেত্রে নারীকে তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করেন। যদি নারীদের বৈষম্য না করে সমান সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হতো তাহলে উচ্চপর্যায়ে নারীদের উপস্থিতি আরও বাড়ত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত