অর্ধেক তার করিয়াছে নারী

পূর্ণতা পাচ্ছে পুলিশি সেবা

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২৪, ০৫:১০ এএম

রাজধানীর নতুন বাজারে ফুটওভার ব্রিজের নিচে এক নারী প্রসব বেদনায় কাতরাচ্ছিলেন। একপর্যায়ে তিনি যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। কিন্তু তাকে সাহয্য করার মতো কেউ ছিল না সেখানে। খবর পেয়ে ছুটে যান দুই নারী পুলিশ। তারা পাশের বাস কাউন্টার থেকে কয়েকটি ছাতা নিয়ে আসেন। ছাতা দিয়ে চারপাশ আড়াল করে ওই নারীকে সন্তান প্রসবে সহযোগিতা করেন। ওই নারীর জন্ম দেন ফুটফুটে এক শিশু। এরপর মা ও নবজাতককে নেওয়া হয় হাসপাতালে। এ গল্প গত বছর মার্চের। যাদের কৃতিত্বে গল্পটি পূর্ণতা পেয়েছে, তারা হলেন  ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের সার্জেন্ট মোর্শেদা ও কনস্টেবল তানিয়া।

পুলিশ বাহিনীতে গর্ব করে বলার মতো এমন অসংখ্য গল্পের জন্ম দিচ্ছেন নারী সদস্যরা।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, নারীরা পিছিয়ে আছেন, তাদের দমিয়ে রাখা হয়েছে এমন কথা শোনা যায়। কিন্তু নারীর অগ্রগতি দেখে বলাই যায়, তারা আর দমে নেই। ঘরের বাইরে সামাজিক,সাংস্কৃতিক কর্মযজ্ঞে তারাও কাঁধে নিয়েছে নিরাপত্তার দায়িত্ব। পুলিশের মতো বাহিনীতে যোগ দিয়ে সেবায় পূর্ণতা এনেছে নারীরা। নিজের নিরাপত্তার প্রশ্ন পাশে ঠেলে দিয়ে সাফল্যের নজির রাখছে প্রতিটি ধাপে। এমন অনেক ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে একজন সেবাপ্রার্থীকে নারী পুলিশ সদস্য ছাড়া সেবা দিলে পুলিশের কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এসব ক্ষেত্রে দায়িত্ব চমৎকারভাবে পালন করে আস্থা অর্জন করেছেন নারী পুলিশের সদস্যরা।

পুলিশের সেবার প্রাণকেন্দ্র পুলিশ স্টেশন বা থানায় রয়েছে নারীদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। দেশের বিভিন্ন থানায় যে নারী ও শিশু হেল্পডেস্ক স্থাপন করা হয়েছে সেখানেও নারী পুলিশ সদস্যরা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এ ছাড়া মামলার তদন্ত, টহল ডিউটি ও সংঘর্ষের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে তাদের সাহসিকতা পুলিশের সেবার মান বৃদ্ধি করেছে। এ ছাড়া জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন, পুলিশের বিভিন্ন তদন্ত সংস্থা, ট্রাফিক বিভাগসহ পুলিশের অন্যান্য ইউনিটে নারী সদস্যরা এগিয়ে থাকছেন। এমনকি বিমানও চালাচ্ছেন।

ঝুঁকিপূর্ণ কাজে সক্রিয় নারী পুলিশ : সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পুলিশে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। সেবা প্রার্থীকে নারী পুলিশ সদস্য ছাড়া সেবা দিলে পুলিশের কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ হয় এমন কাজের বিবেচনায় নারী সদস্যদের প্রয়োজন মনে করা হতো। বর্তমানে এমন ধারণা পাল্টেছে। তারা নিজেদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। সময়ের সঙ্গে পুলিশের কনস্টেবল থেকে শুরু করে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার চেয়ারে জায়গা পেয়েছেন নারী সদস্যরা। এতে করে সেবার মানে এগিয়ে থাকছে পুলিশ। অন্যদিকে নিজেদের প্রমাণ করতে ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব কাঁধে নিচ্ছেন কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে নিয়োজিত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন পুলিশের নারী সদস্য। অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক রৌশন আরা বেগম ২০১৯ সালে আফ্রিকার দেশ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে শান্তিরক্ষা মিশন পরিদর্শনে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ছিলেন ওই সময়ে উচ্চপর্যায়ের নারী পুলিশ কর্মকর্তা। তার মতো অসংখ্য নারী পুলিশের সদস্য দায়িত্ব পালনে গিয়ে নানা প্রতিবন্ধকতা ও হতাহতের শিকার হলেও তাদের সাহসী যাত্রা থেমে যায়নি।

পুলিশ নারীর সংখ্যা : বর্তমানে বাংলাদেশের পুলিশের সদস্য সংখ্যা ১ লাখ ৯৪ হাজার ১৬৯। এর মধ্যে নারী পুলিশ আছেন ১৬ হাজার ৮৫৮ জন। উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) পদে আছেন ৫, অ্যাডিশনাল ডিআইজি ৩৯, পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কর্মকর্তা ৭৪, অ্যাডিশনাল পুলিশ সুপার ১১৩, সহকারী পুলিশ সুপার ৭০, পরিদর্শক বা ইন্সপেক্টর ১২৭, উপপরিদর্শক (এসআই) ৯৩৩, সার্জেন্ট ৯৪, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) ১ হাজার ১৭৮, এটিএসআই ৩, এএসআই (সশস্ত্র) ৫৬, নায়েক ৪১৬ ও কনস্টেবল ১৩ হাজার ৭৫০ জন। অতীতে অতিরিক্ত মহাপরিদর্শকের পদেও নারী ছিলেন।

প্রথম যোগদান : কনস্টেবল ও এসআই পদে মাত্র ১৪ জন নিয়োগ পাওয়ার মধ্য দিয়ে ১৯৭৪ সালে পুলিশে নারীর যাত্রা শুরু। ২০২৪ সালের ৭ মার্চ পর্যন্ত সেই সংখ্যা এখন ১৬ হাজারের বেশি। নারী পুলিশ সদস্যরা এখন দায়িত্ব পালন করছেন উচ্চপর্যায়েও। ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে (বিসিএস) প্রথম সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদে যোগদান করেন ফাতেমা বেগম। এরপর ১৯৮৮ সালে সপ্তম বিসিএসের মাধ্যমে যোগদান করেন ৪ নারী। ১৯৮৯ সালে ঊর্ধ্বতন পদে নারী পুলিশ কর্মকর্তা নিয়োগ বন্ধ ছিল। অষ্টম বিসিএস থেকে ১৭তম বিসিএস পর্যন্ত কোনো নারী বিসিএস পুলিশ ক্যাডারে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ১৯৯৯ সালে ১৮তম বিসিএসের মাধ্যমে ৮ নারী এএসপি পদে যোগদানের মাধ্যমে আবার পুলিশ ক্যাডারে নারীদের নিয়োগ শুরু হয়।

নারীর এ অগ্রযাত্রার পথ একেবারে সহজ ছিল না। মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও পারিবারিক নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে তাদের। এখন সেই বাধা কাটিয়ে নারীরা পুলিশে আসছে। ঊর্ধ্বতন পদে থাকা নারীরা ঢাকার বাইরেও দায়িত্ব পালন করছেন।

মিশনেও অভাবনীয় সাফল্য : গত কয়েক বছর ধরে জাতিসংঘ মিশনে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন নারী পুলিশ। বর্তমানে কঙ্গো, মালি, দক্ষিণ সুদান ও লিবিয়ায় ১২০ জন নারী পুলিশ কর্মরত আছেন। বিভিন্ন সময়ে ১ হাজার ৮০৬ জন মিশন শেষ করে দেশে ফিরেছেন।

প্রথম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা : থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পদেও দায়িত্ব পালন করেছেন নারী পুলিশ। ২০০৯ ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ক্যান্টনমেন্ট থানায় ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন পরিদর্শক হোসনে আরা বেগম। ২০১১ সালের ২১ জুন নারীদের নিয়ে গঠিত হয় আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের একটি আলাদা ইউনিট। ২০১৫ সালে সর্বপ্রথম নারী পুলিশ সার্জেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০১৬ সালে পুলিশ সপ্তাহে তখনকার চাঁদপুর জেলার পুলিশ সুপার শামসুন্নাহার কুচকাওয়াজে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। নারী সদস্যদের ‘পুলিশ উইমেন অ্যাওয়ার্ড’ নামে একটি পুরস্কারও দেওয়া হয়। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তারা এ পুরস্কার পান।

রহস্য উদঘাটনে নারী পুলিশ : বর্তমানে গোপালগঞ্জের পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আল-বেলী আফিফা। আর পার্বত্য খাগড়াছড়ি জেলায় একই পদে আছেন মুক্তা ধর।

আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান পরিচালনা থেকে শুরু করে চাঞ্চল্যকর মামলার রহস্য উদঘাটন করছেন তারা। জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণ, জলদস্যু দমন ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযানে অংশ নিচ্ছেন তারা। দায়িত্ব পালনকালে জীবনও বিলিয়ে দিয়েছেন কেউ কেউ। কাজ করছেন নারী নির্যাতন, পাচার ও বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, একতরফা তালাকের ক্ষেত্রে দেনমোহর ও খোরপোশ আদায় এবং যৌতুকসহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার বিরুদ্ধে। জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এর কলা সেবা সেন্টারের ৮০ ভাগ সদস্যই কাজ করছেন নারী পুলিশ। সারা দেশের ৯টি ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার এবং ৫৫৯টি থানার বেশিরভাগ নারী ও শিশু ডেস্ক পরিচালনা করছেন তারা। এপিবিএন-১১-তে কর্মরত পুলিশের সব সদস্যই নারী।

পুলিশের একাধিক নারী সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, নারীদের জন্য কর্মপরিবেশ আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে। কিছু সমস্যাও আছে। বিশেষ করে টয়লেটের সমস্যাই সবচেয়ে বেশি। তবে কর্তৃপক্ষ বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত। তারা সমাধান করার চেষ্টা করছেন। থানায় বা অন্য কোনো ইউনিটিতে কর্মরত পুরুষ সদস্যরাও নানাভাবে সহায়তা করেন।

ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নারীদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো পুরুষের সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং নারীর সংখ্যায় কম হওয়া। কাজের সময় আমি কখনো নিজেকে নারী মনে করি না। সবসময় পুরুষ সহকর্মীর সঙ্গে কাজ করেছি। এখনো করছি।’ তিনি বলেন, দিনে দিনে পুলিশে নারীরা এগিয়ে আসছে। কনস্টেবল থেকে শুরু করে বিসিএসেও নারী পুলিশের সংখ্যা বাড়ছে।

নারী দিবসে শুভেচ্ছা ও শুভকামনা জানিয়েছেন পুলিশ সদর দপ্তরের হেলথ, ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড পেনশন শাখায় কর্মরত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফরিদা পারভীন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশে এমন কোনো শাখা নেই যেখানে নারীরা কাজ করছেন না। ট্রাফিক থেকে শুরু করে ডিবি (গোয়েন্দা শাখা), কাউন্টার টেররিজম, ডগ স্কোয়াড, ড্রাইভিং সব ক্ষেত্রেই নারীদের পদচারণা আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ডিএনএ প্রোফাইলিং থেকে শুরু করে আকাশে বিমান চালানোর মতো গুরুতর দায়িত্বে নিয়োজিত বাংলাদেশ পুলিশের নারী কর্মকর্তারা। মিশনেও অসামান্য অবদান রাখছেন নারী অফিসার ও সদস্যরা। পাশাপাশি খুবই আনন্দ নিয়ে বা গর্ব নিয়ে বলার বিষয় হলো নারী অফিসাররা নিজের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ধারণের কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন, সাহিত্যকর্ম, চিত্রকর্ম, আবৃত্তি সবকিছুতেই পারদর্শিতা দেখাচ্ছেন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত