অর্ধেক তার করিয়াছে নারী

অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ কমেছে

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২৪, ০৫:১১ এএম

নারী জাগরণের দীপশিখা বেগম রোকেয়া বাঙালি নারীর পিছিয়ে থাকা নিয়ে লিখেছেন, স্বামী যখন পৃথিবী থেকে সূর্য ও নক্ষত্রের দূরত্ব মাপেন, স্ত্রী তখন একটি বালিশের ওয়াড়ের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ মাপেন (সেলাই করার জন্য)। প্রায় শত বছর আগে বেগম রোকেয়ার কলমে ওঠে আসা নারীর এই চিত্র এখন আর হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। কারণ গত ৩৪ বছর দেশের শাসনক্ষমতা নারীদের হাতে। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, স্পিকার থেকে শুরু করে সর্বশেষ প্রথমবারের মতো অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন একজন নারী।

নারীর এত এত ক্ষমতায়নের সাম্প্রতিক ইতিহাসের পরও ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে নারী পিছিয়ে আছে। বৃহত্তর অর্থে নারীর ক্ষমতায়ন হলো সম্পূর্ণভাবে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাজে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

ক্ষমতায়নের অন্যতম সূচক অর্থনৈতিক কাজে বা কর্মসংস্থানের দিক থেকে দেশে নারী অংশগ্রহণ সরকারি হিসাবে গত এক বছরে উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। যদিও এবারের নারী দিবসের সেøাগান ‘নারীর জন্য বিনিয়োগ বাড়াও’।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক ইতিহাসে বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে পুরুষের সঙ্গে সমান পাল্লা দিয়ে এগিয়েছেন নারীরা। কিন্তু গত এক বছরে এর উল্টো চিত্র পাওয়া গেছে। অথচ জনশুমারির তথ্য বলছে, দেশে পুরুষের তুলনায় নারী বেশি। সংখ্যায় বেশি হয়েও হঠাৎ করেই দেশের অর্থনীতিতে তাদের অংশগ্রহণ কমেছে। ২০২৩ সালে দেশের শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণ কমেছে ৫ লাখেরও বেশি।

শ্রমশক্তি, কর্মসংস্থান, কর্মে নিয়োজিত জনগোষ্ঠী সব ক্ষেত্রেই নারীর অংশগ্রহণ কমেছে। এসব ক্ষেত্রে পুরুষদের বেকারত্ব কমলেও নারীদের বেকারত্ব বেড়েছে। শ্রমশক্তির বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীর মধ্যে নারীরাই বেশি। এমনকি বিশ^বিদ্যালয়পড়–য়া উচ্চশিক্ষিত নারীও শিক্ষিত পুরুষের দ্বিগুণ বেকার। এক কথায় গত এক বছরে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার ক্ষেত্রে নারীরা ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেছে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, এখনো কিছু মৌলিক সমস্যা থাকার কারণে নারীদের ক্ষমতায়ন কমছে। বিশেষ করে বাল্যবিয়ে বেড়ে যাওয়া, সামাজিক ক্ষেত্রে বা কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি সহিংসতা এবং ২০১৬ থেকে ২০২২ পর্যন্ত সময়ে শহরাঞ্চলে নারীদের আশঙ্কাজনক হারে কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের হার কমে যাওয়াই এর মূল কারণ। এ ছাড়া করোনা মহামারীর প্রভাব নারীদের ওপরই বেশি পড়েছে। ফলে নারী ক্ষমতায়ন আশঙ্কাজনক হারে কমেছে।

নারী ক্ষমতায়ন কমার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা বলেন, ‘নারী ক্ষমতায়ন ব্যাপক একটা বিষয়। এখানে একটি বিষয় শিক্ষা, আরেকটি শ্রমবাজার। শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ কমেনি। উচ্চশিক্ষায় নারীদের আশানুরূপ অগ্রগতি আমরা লক্ষ্য করছি না। কিছু হয়তো বেড়েছে। এটি যদি না হয়, তাহলে নীতিনির্ধারণী কাজে নারীদের অংশগ্রহণ আমরা পাব না।’

ড. সায়মা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০১৬ থেকে ২০২২ সালের শ্রমশক্তিতে নারীদের একটি বৃদ্ধি লক্ষ করেছিলাম। তবে সেখানে শহরাঞ্চলে নারীদের শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণ কমেছিল। গ্রামাঞ্চলে অনেক নারী পারিবারিক শ্রম দিচ্ছেন বিনা পয়সায়। অর্থাৎ কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ ওই সময়ে কিছুটা বেড়েছে।’

জরিপের তথ্য বলছে, গত এক বছরে দেশে শ্রমশক্তিতে নাগরিকদের অংশগ্রহণ বেড়ে হয়েছে ৭ কোটি ৩৪ লাখ ৬০ হাজার। আগের বছরের চেয়ে ১ লাখ ১০ হাজার বেশি। নারী-পুরুষের হিসাবে, শ্রমশক্তিতে পুরুষদের অংশগ্রহণ বেড়েছে ৬ লাখ ২০ হাজার। কিন্তু উল্টোপথে নারীরা। ২০২২ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণ কমেছে ৫ লাখ ১০ হাজার। শ্রমশক্তি বলতে ১৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী কর্মে নিয়োজিত ও বেকার জনগোষ্ঠীর সমষ্টিকে বোঝায়।

২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশে কর্মে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ১১ লাখ ১০ হাজার। নারী-পুরুষের অংশগ্রহণ তুলনা করলে এখানেও নারীরা বহু পিছিয়ে আছে। গত এক বছরে পুরুষের অংশগ্রহণ ৭ লাখ বেড়ে হয়েছে ৪ কোটি ৬৪ লাখ ৪০ হাজার। অথচ একই সময়ে দেশের নারীদের অংশগ্রহণ ৬ লাখ ৬০ হাজার কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৪৬ লাখ ৭০ হাজারে। যেটি ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ছিল ২ কোটি ৫৩ লাখ।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী, যারা গত সাত দিনে কমপক্ষে এক ঘণ্টা বেতন, মজুরি বা মুনাফার বিনিময়ে অথবা পরিবারের নিজস্ব ভোগের জন্য পণ্য উৎপাদনমূলক কাজ করেছে, তাদের কর্মে নিয়োজিত জনগোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বলছে, কেউ যদি একটি মুরগিও পালন করে থাকেন, তিনিও কর্মে নিয়োজিত বা বেকার নন।

অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা বলেন, ‘দেশে প্রচলিত কর্মসংস্থানে নারীদের অংশগ্রহণ মাত্র ৩ দশমিক ৪ শতাংশ, যেখানে অপ্রচলিত কর্মসংস্থান বেড়েছে। ব্যবস্থাপনার জায়গাগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণ আমরা খুব একটা লক্ষ করছি না। শুধু কয়েকটি ইতিবাচক সংখ্যা ছাড়া কাজের গুণগত মানেও নারীরা পিছিয়ে।’

পিছিয়ে থাকার কারণ ব্যাখ্যা করে এই অর্থনীতিবিদ উল্লেখ করেন, শ্রমবাজারে নারীর গুণগত অংশগ্রহণ বাড়াতে চাইলে কিছু মৌলিক সমস্যা দূর করতে হবে। সেগুলো হলো বাল্যবিয়ে, নারীর প্রতি সহিংসতা, কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা ও সামাজিক সহিংসতা। এগুলো খুবই চ্যালেঞ্জিং জায়গা। এ চ্যালেঞ্জগুলো দূর করতে হবে। কারণ একটি মেয়ের যদি ১৬ বছরে বিয়ে হয়ে যায়, তখন শিক্ষা কিংবা কর্মসংস্থান কোনো জায়গাতেই তার অবস্থান দেখা যায় না।

জরিপের তথ্য বলছে, বছরের ব্যবধানে দেশে বেকারের সংখ্যা বেড়েছে ৪০ হাজার। গত ডিসেম্বর শেষে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৩ লাখ ৫০ হাজার, যেটি আগের ডিসেম্বরে ছিল ২৩ লাখ ১০ হাজার। এ ক্ষেত্রে পুরুষের সংখ্যা কমলেও বেড়েছে নারীর সংখ্যা। এ সময়ে দেশে পুরুষ বেকার কমেছে ৭০ হাজার। বিপরীতে নারীদের বেকার হওয়ার সংখ্যা বেড়েছে ১ লাখ ২০ হাজার।

পুরুষদের বেকারত্বের হার যেখানে কমে ৩ দশমিক ২৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, সেখানে নারীদের বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। নারীদের এ হার এর আগের বছর ছিল ২ দশমিক ৫৪ শতাংশ।

কর্মসংস্থানে নারীদের অংশগ্রহণ কমার প্রবণতাটি ধারাবাহিক বলে মনে করেন জাতীয় জাসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শিরিন আখতার। এই অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নারীদের অংশগ্রহণ কমার প্রবণতাটি লাগাতার। তারা ঘরের কাজ যেমন করেন, বাইরের কাজও করেন। বাইরের কাজের জন্য যে সহায়ক পরিবেশ, সেটি এখনো তৈরি হয়নি। কাজের ক্ষেত্রে তাদের অনেক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়। যাতায়াত ব্যবস্থা থেকে শুরু করে অফিস-আদালত, কল-কারখানায় তাদের নিরাপত্তা বোধের অভাব রয়েছে। একই সঙ্গে তাদের সুযোগের সদ্ব্যবহার করার জন্য তাদের যে তথ্য প্রয়োজন, তাদের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছানোরও ব্যবস্থা অপ্রতুল।’

তিনি বলেন, কিছু কিছু জায়গায় কাজ করার মতো চিন্তা বা চেতনা এখনো পর্যন্ত নারীদের মধ্যে হয়নি যে তারা সব কাজই পারবে। এটাও একটি সংকট আছে। আরেকটি বড় কারণ হলো, বিভিন্ন জায়গায় তাদের কাজ করার ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিধিনিষেধ আছে। এসব বাধা অতিক্রম করে কাজে যাওয়ার ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষের চেয়ে পিছিয়ে আছে।

তবে আশার দিকও আছে বলে মনে করেন শিরিন আখতার। তিনি বলেন, গার্মেন্টস বা কৃষি খাতের দিকে তাকালে নারীদের অংশগ্রহণের যে চিত্র তা আশাব্যঞ্জক। সংবিধানের আলোকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ১৯৯৭ সালে যে নারী নীতি তৈরি করেছিলেন, সে নীতির আলোকেই নানা জায়গায় নানা সুযোগ তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। এবার নারী দিবসের যে প্রতিপাদ্য ‘নারীর জন্য বিনিয়োগ বাড়াও’ এটি তার শিক্ষার বিষয়ে, যাতায়াতের বিষয়ে এবং তার সন্তান প্রতিপালনের বিষয়ে। নারীর মেধা বিকাশে যে বিনিয়োগ প্রয়োজন তা আরও সমাধান হবে।

শ্রমশক্তি জরিপ-২০২২-এর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, শিক্ষিত পুরুষের তুলনায় শিক্ষিত নারী বেকারত্বের প্রবণতা বেশি। পরিসংখ্যান বলছে, অশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। যেখানে পুরুষের হার শূন্য দশমিক ৮৭ শতাংশ, সেখানে নারীর হার ১ দশমিক ৪৯ শতাংশ। কমপক্ষে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেছেন, এমন শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্ব ১ দশমিক ৬৯ শতাংশ। যেখানে পুরুষ ১ দশমিক ৭৩, নারী ১ দশমিক ৬৩ শতাংশ।

মাধ্যমিক স্তর শেষ করাদের মধ্যে বেকারত্ব ২ দশমিক ৮২ শতাংশ, যেখানে পুরুষ ৩ দশমিক ২৬ শতাংশ, নারী ২ দশমিক ২২ শতাংশ। উচ্চমাধ্যমিক স্তর শেষ করাদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৮ দশমিক ৭৮ শতাংশ। উচ্চমাধ্যমিক স্তর শেষ করাদের মধ্যে পুরুষ বেকারত্বের হার ৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ, যেখানে নারীর হার ৯ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ।

এ ক্ষেত্রে দেখা যায়, যেসব নারীর শিক্ষিত হওয়ার প্রবণতা যত বেশি, তাদের বেকারত্বের প্রবণতাও বেশি। বিশেষ করে, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করাদের মধ্যে গড় বেকারত্ব ১২ শতাংশ। কিন্তু পুরুষ ও নারীর মধ্যে তুলনা করলে নারীরা এ ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে। বিশ^বিদ্যালয়ের গ-ি পেরোনো পুরুষদের বেকারত্বের হার ৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ, যেখানে নারীদের হার ১৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত