এই তাহলে বিচারিক অধিকার?

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০২৪, ১০:৩৪ পিএম

২০২৪ সালের ৯ মার্চ প্রথম আলো পত্রিকার শেষ পাতার ৪ নম্বর কলামের সংবাদটি দেখে সাংবাদিক হিসাবে বড়ই বেদনাহত ও ক্ষুব্ধ হয়েছি। দৈনিক দেশ রূপান্তর পত্রিকার শেরপুর জেলার নকলা উপজেলা সংবাদদাতা সাংবাদিক শফিউজ্জামানকে মোবাইল কোর্ট বসিয়ে ৬ মাসের কারাদণ্ড দিয়ে জেলে পাঠানো হয়েছে। গত মঙ্গলবার এই কাজ করেছেন নকলা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শিহাবুল আরিফ।

৯ মার্চের দেশ রূপান্তর পত্রিকা সাংবাদিক শফিউজ্জামানের সন্তান শাহরিয়ার জামান মাহিনের বয়ানে জানাচ্ছে, তার বাবা এডিপি প্রকল্পের অধীনে কম্পিউটার ও ল্যাপটপ ক্রয় সংক্রান্ত তথ্য চেয়ে আবেদন করতে যান ইউএনও কার্যালয়ে। আবেদনটি গোপনীয় শাখার অফিস সহকারী শীলা আক্তারের কাছে জমা দেন। এ সময় শফিউজ্জামানের আবেদনটি জমা নেওয়ার পর রিসিভড কপি চান। শীলা সাংবাদিককে অপেক্ষা করতে বললে। দীর্ঘ সময় পার হয়। এরপর ফের রিসিভড কপি চান শফিউজ্জামান। তখন শীলা আক্তার বলেন, ইউএনওকে ছাড়া রিসিভড কপি দেয়া যাবে না। ইউএনও সাদিয়া উম্মুল বানিন তখন মিটিংয়ে ব্যস্ত আছেন পরে দেয়া হবে রিসিভড কপি। এমন দীর্ঘ সময় বসে থাকা নিয়ে মোবাইল ফোনে ডিসিকে জানান সাংবাদিক শফিউজ্জামান। এতে ক্ষুব্ধ হন ইউএনও সাদিয়া উম্মুল বানিন। তিনি পুলিশ ডেকে গ্রেপ্তার করান সাংবাদিক শফিউজ্জামানকে। এরপর ১৮৬০ সালে প্রবর্তিত দণ্ডবিধির ১৮৮ ও ৫০৯ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে ৬ মাসের জেল দিয়ে কারাগারে পাঠান। 

মোবাইল কোর্ট যা করলেন?

সাংবাদিকের কোনো কথায় আমলে নেয়া হয়নি, যেটা কারাগারে যাবার মধ্যে দিয়ে প্রমাণ হয়। ইউএনও বানিন ক্ষুব্ধ ছিলেন বলে সাংবাদিক পরিবারের অভিযোগ। তিনি প্রথম আলোকে জানিয়েছেন অফিস সহকারী শীলা আক্তারের ফাইল ধরে টানাটানি করেছেন,অশোভন আচরণ করেছেন শফিউজ্জামান। যেটা দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারায় অপরাধ হয়। সেটা আমলে নিয়ে মোবাইল কোর্টের বিচারক এসিল্যান্ড শিহাবুল আরিফ দণ্ড দেন। দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারায় কিন্তু বলা আছে অভিযুক্ত নারী স্বাভাবিক আদালতে বিচার চাইতে পারবেন। শীলা আক্তার কি লিখিত অভিযোগ করেছেন, সেটার প্রমাণ দেখা যায় নাই গণমাধ্যমে। তাহলে মোবাইল কোর্টের বিচারক ৫০৯ ধারার এক অংশ মিলে যাওয়ায় সাংবাদিকের বিরুদ্ধে রায় দিলেন। জেলে পাঠালেন। ওই বিচারক তিনি সরাসরি রায় না দিয়ে শুধু এই ধারাতেই স্বাভাবিকভাবে থানায় মামলা বা কোর্টে মামলার পরামর্শও দিতে পারতেন সেটা দণ্ডবিধিতে ও মোবাইল কোর্টের আইনের মধ্যেই আছে। তা না করে সরাসরি জেলে পাঠানো হল। দণ্ডবিধির ১৮৮ ধারাতেও জেল দেবার আগে বলা হয়েছে ভুক্তভোগীর স্বাস্থ্যহানী হয়েছে কিনা ,জীবন সংকটাপন্ন হয়েছে কি না সেটা বিবেচনা করতে হবে? আমরা এটাও জানিনা যে শীলা আক্তারের সাথে সাংবাদিক শফিউজ্জামানের ফাইল টানাটানির ঘটনায় কি পরিমাণ আহত হয়েছেন শীলা। আবার শীলা আখতার যদি ফাইল টানাটানিতে আহত হওয়ার দাবি করেন তাহলে সাংবাদিক শফিউজ্জামান আহত হতে পারেন না? তাহলে মোবাইল কোর্ট শুধু শীলা আক্তারের পক্ষেই বিচার করলো? সেটা ন্যায়বিচার হল? শীলা আক্তার চিকিৎসকের কাছে গিয়েছিলেন কিনা? সেটার প্রমাণও আমরা গণমাধ্যমে দেখিনি। বিচারে এসব কি মোবাইল কোর্ট আমলে নিয়েছে? আপাতদৃষ্টে মনে হচ্ছে দ্রুত যেনতেনভাবে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জেলে দেওয়ায় উদ্দেশ্য ছিল ওই বিচারের মাধ্যমে। গবেষকের গবেষণা অনুযায়ী মোবাইল কোর্টের যে জন্ম উদ্দেশ্য সেটা থেকে সাংবাদিক শফিউজ্জামানের বিচার ও দণ্ড যোজন যোজন দূরে। নিরস্ত্র সাংবাদিককে জেল খাটাতে যদি মোবাইল কোর্ট ব্যবহার করা হয় তাহলে সেটা মোবাইল কোর্টের জন্যই ক্ষতিকর। উচ্চ আদালত ও আইন মন্ত্রণালয়ের উচিত ভালভাবে বিষয়টি খতিয়ে দেখা। তাদের সে এখতিয়ার ও মেকানিজম আছে? শফিউজ্জামানের ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্টের অপপ্রয়োগ হয়েছি কি?

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক্সেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রোগ্রাম জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির সহায়তায় মোবাইল কোর্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (MCMS) তৈরি করেছে। সেই সিস্টেমের তথ্যে দেখা যাচ্ছে ১১৪ টি তফশিলভুক্ত আইনগুলোর অধীনে সংগঠিত অপরাধের অভিযোগে মোবাইল কোর্টের বিচারকরা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থদণ্ড ও কারাদণ্ড দিয়ে বিচার করতে পারবেন। সেখানে দণ্ডবিধি আইনের অধীনে বিচার করা যাবে। তবে সেটা সর্বাগ্রে প্রাধান্য পাবে বলে বলা হয়নি। তথ্য অধিকার আইনের এখতিয়ারে সাংবাদিক সেখানে তথ্য চাইতে গিয়ে অপরাধী হয়েছেন। চাঁদা,ঘুষ বা তদবিরের জন্য নয়। সুতরাং তথ্য কমিশনের উচিত বিষয়টি খতিয়ে দেখে দরকার হলে নতুন প্রটোকল তৈরি করা। তাহলে কি আমরা ভাববো যেহেতু তথ্য অধিকার আইনটি মোবাইল কোর্টের অধীনে বিচার্য নয়,তাই কূটকৌশলে দণ্ডবিধি প্রয়োগের বলি হলেন সাংবাদিক শফিউজ্জামান। 

মোবাইল কোর্ট আইনে কেন শুধু দণ্ডবিধির অধীনে বিচার হয়?

২০২১ সালের জুন মাসে বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার উম্মে কুলসুম সম্পা মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করার খতিয়ান উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় উপস্থাপন করেছেন। তাতে দেখা যায়, ১৮৬০ সনের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৮৮ ও ২৬৯ ধারা ব্যবহার করে ১৩ টি মামলার অধীনে ১৩ জনকে অর্থদণ্ড দিয়েছেন। ১৮৬৭ সালের জুয়া আইনে ৮, বালু মহাল আইনে ১, সংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধ আইনে ১ জনকে অর্থদণ্ড দিয়েছেন। একই সময়ে উক্ত উপজেলার এসিল্যান্ড মৌলি মণ্ডল ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ১৮৮ ধারার অধীনে ১৩ জনকে অর্থদণ্ড দিয়েছেন, ইট ভাটা আইনে ২ জনকে অর্থদণ্ড দিয়েছেন। এই তথ্য থেকে সহজেই অনুমেয় ১১৪ টি তফশিলভুক্ত আইনের মধ্যে কেন দণ্ডবিধি আইন বারবার বেশি পরিমাণে ব্যবহৃত হচ্ছে? এটা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে সাংবাদিক শফিউজ্জামানকে এই দণ্ডবিধির ধারা প্রয়োগ করে জেলে পাঠানোর পর। আইন মন্ত্রণালয়ের উচিত এটা খতিয়ে দেখা। আইনগুলো সুষমভাবে যেন প্রয়োগ করা হয় তার জন্য ব্যবস্থা করা।

মোবাইল কোর্টের  খড়গের নজির

২০১৭ সালের ৭ ডিসেম্বর প্রকাশিত ডয়েচে ভেলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১১ সালে সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবুল হাশেমের দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ করে দৈনিক সিলেট বাণী নামের স্থানীয় পত্রিকা। তখন মোবাইল কোর্ট বসিয়ে পত্রিকার প্রতিবেদক আকবর হোসেনকে কারাদণ্ড দেন। তখন আপিল আদালত সেই ইউএনও আবুল হাশেমকে ওএসডি করেছিল।

২০২০ সালের ১৪ মার্চের বাংলা ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে তাদের সংবাদদাতাকে মধ্যরাতে মোবাইল কোর্ট বসিয়ে মাদক মামলায় দণ্ড দিয়ে বাসায় ভাঙচুর চালিয়েছে কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসনের মোবাইল কোর্ট। পুকুর সংস্কার ও নামকরণ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে ক্ষুব্ধ ছিলেন কুড়িগ্রামের ডিসি সুলতানা পারভীন। পরে আরিফুল জামিন পান। ডিসির অপরাধ প্রমাণ হওয়ায় ঢাকায় প্রত্যাহার করা হয়।  

মোবাইল কোর্টের অন্য চিত্র

২০২২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারির দৈনিক যুগান্তরের অনলাইন ভার্সনের একটি সংবাদে বলা হচ্ছে মাগুরা জেলা প্রশাসনের মোবাইল কোর্ট সদর উপজেলার বাগবাড়িয়া আড়পাড়া এলাকার ইটভাটায় যায়। এ সময় ইটভাটার মালিকের লোকেরা মোবাইল কোর্টের কর্মকর্তা কর্মচারীদের ওপর হামলা চালায়। জেলা প্রশাসক অফিসের দুজন কর্মকর্তা কর্মচারী আহত হয়। তবে এই হামলা বা আহতের ঘটনা ঘটেনি বলে পরে যুগান্তর পত্রিকাকে জানায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকারী সহকারি কমিশনার জালাল উদ্দিন। মোবাইল কোর্টের ওপর এমন হামলার নজির গুগল করলেই মিলবে। কিন্তু ওই ভুক্তভোগীরা মারধরকারী প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে তেমন কিছুই করতে পারেননি বলেই দেখা যায়। তাহলে নরম জায়গায় কুঠার চালানোই কি মোবাইল কোর্টের কাজ। যে নিজের ওপর হামলার বিচারও চাইতে পারে না?

মোবাইল কোর্টের বৈধতা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে বিচার চলছে

প্রথম আলো পত্রিকার তথ্য বলছে ১৯৯৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট পরিবেশ সংক্রান্ত মামলার বিচারে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের মোবাইল কোর্ট পরিচালনার অনুমতি দেন। গুগলের এআই চ্যাটবট জেমিনি বলছে, ১৯৯৯ সালের ৩০ আগস্ট মোবাইল কোর্ট অধ্যাদেশ জারি করে সরকার। ইত্তেফাক পত্রিকা বলছে, ২০০৭ সালে মোবাইল কোর্ট অধ্যাদেশ বাতিল হয়  বিচারবিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ পৃথকীকরণ মামলার রায় হবার পর।  ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের ক্ষমতাকালে মোবাইল কোর্ট আইন করা হয়। যা চলছে। ২০১৭ সালের ১১ মে এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট মোবাইল কোর্ট অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন। সেই রায় স্থগিত করার পর আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায় আছে। এবারের ডিসি সম্মেলনে মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রস্তাব দেন ডিসিরা। অ্যাটর্নি জেনারেলের উপস্থিতিতে আইনমন্ত্রী জানান, মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি করতে তিনি উদ্যোগ নেবেন। 

মোবাইল কোর্ট নিয়ে গবেষণা কী বলে?

গবেষক গাজী দেলোয়ার হোসেন ও সৈয়দ রুবায়েত ফেরদৌস ২০১০ সালে বাংলাদেশের নর্দান ইউনিভার্সিটি জার্নাল অফ ল তে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেন। সেখানে গবেষকদ্বয় বলেন, ভেজাল বিরোধী অভিযান, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, অবৈধ দখলদারমুক্ত নদী, ভূমি, পরিবেশ রক্ষা, গণপরিবহনে শৃঙ্খলা রক্ষার্থে মোবাইল কোর্ট সফল হয়েছে। 

তারা আরও উল্লেখ করেন, নির্বাহী বিচারকের বদলে প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট বা সেশন জজ মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করলে উত্তম হবে। মোবাইল কোর্ট নানাভাবে প্রয়োজন ও গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। সেই সাথে সাংবাদিক হয়রানীতে প্রশাসনের কিছু মানুষ এটার অপব্যবহার করেছে। অপব্যবহারের বিষয়টি আলোচনায় থেকে আবার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। কিন্তু এখন সময় এসেছে মোবাইল কোর্টের এই ধরনের অপব্যবহার বন্ধে কঠোর হবার। আজ শফিউজ্জামান, কাল অমক পরশু তমক। এটা হতেই থাকবে। আর কোনো সাংবাদিকের প্রতি যদি কোনো অভিযোগ দিতে হয় তাহলে আইন জানা লোকেরা এটাতো মানবেন প্রেস কাউন্সিল আছে। সাংবাদিক সংগঠন আছে। যদি প্রতিনিধি হন তাহলে সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলোর কেন্দ্রীয় অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন। তাহলে সাংবাদিকদের ওপর ক্ষমতার অপব্যবহার হবে না। সাংবাদিকদের জন্য একটি নিরাপদ কর্ম পরিবেশ নিশ্চিত হোক।

লেখক: নূরনবী সরকার, সিনিয়র রিপোর্টার, যমুনা টেলিভিশন।
 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত